সালাত ছেড়ে দেওয়া এবং সফরে সালাত বিষয়ক
Salah-Prayer · Hanbali
Question
২. অনিচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করলে তার বিধান কী?
৩. সফরে সালাত পরিত্যাগের বিধান কী?
৪. কোন সালাত সফরে ফরজ হলে তা বাড়ি ফিরে আসায় করলে কসর করতে হবে নাকি পূর্ণাঙ্গ আদায় করতে হবে?
৫. সফরে সালাত কাজা করার বিধান কী?
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে কুরআন, সহিহ হাদিস এবং হাম্বলি ফিকহের ভিত্তিতে—বিশেষ করে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, ইমাম ইবনুল কাইয়িম, শাইখ ইবন বাজ, শাইখ আলবানী, শাইখ ইবন উসাইমীন ও শাইখ সালিহ আল-ফাওজানের মতামত অনুযায়ী—জবাব দেওয়া হলো।
১. ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত পরিত্যাগকারী কি কাফের?
হ্যাঁ, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ও কোনো ওজর ছাড়া একটি ফরজ সালাতও সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করে, তবে সে সালাতের ফরজিয়ত অস্বীকার না করলেও—সাহাবী ও ইমামগণের একটি শক্তিশালী মত অনুযায়ী—সে কাফের হয়ে যায়।
প্রমাণ:
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “السَّلَامُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلَاةِ”
“মানুষ ও শিরক ও কুফরের মধ্যে ব্যবধান হলো সালাত ত্যাগ করা।” (সহিহ মুসলিম, হা. ৮২) - অপর হাদিসে: “مَنْ تَرَكَ الصَّلَاةَ مُتَعَمِّدًا فَقَدْ كَفَرَ”
“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত ছেড়ে দিল, সে কুফরি করল।” (মুসনাদ আহমাদ, হা. ২৩৪০৫; শাইখ আলবানী সহিহ বলেছেন)
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
“ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত ত্যাগকারী কাফের—এটাই চার ইমামের মধ্যে অগ্রগণ্য মত। তবে হানাফি ও শাফিয়ি মাজহাবে অমুসলিম নয়, কিন্তু কবিরা গুনাহগার।” (মাজমুআ ফাতাওয়া, ২২/৪০)
শাইখ ইবন বাজ (রহ.) বলেন:
“ইচ্ছাকৃতভাবে এক ওয়াক্ত সালাতও ত্যাগ করলে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়, যদি না তওবা করে।” (মাজমু ফাতাওয়া ইবন বাজ, ১০/১৩৮)
শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) এর মতও একই:
“সঠিক কথা হলো, ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত ত্যাগ করা কুফর। তবে যদি অলসতার কারণে ত্যাগ করে কিন্তু ফরজিয়ত মানে, তবে সেই ব্যক্তি ফাসেক, কাফের নয়—এটি ‘নিকৃষ্ট’ মত। কিন্তু দলিলের ভিত্তিতে ‘কুফর’ বলাই বিশুদ্ধ।” (শারহুল মুমতি’, ২/২৬)
সতর্কতা: কারো উপর কুফরের ফতোয়া দেওয়া বড় দায়িত্ব। সালাত ত্যাগকারীকে দাওয়াত ও সতর্ক করা আবশ্যক।
২. অনিচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করলে বিধান কী?
অনিচ্ছাকৃতভাবে, যেমন—ঘুম, ভুলে যাওয়া, বা জ্ঞানহীনতা ইত্যাদির কারণে সালাত ছুটে গেলে, সে কাফের হয় না। তবে অবশ্যই স্মরণ হওয়া মাত্র বা সুস্থ হওয়া মাত্র কাজা (কাযা) আদায় করতে হবে।
প্রমাণ:
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “مَنْ نَسِيَ صَلَاةً فَلْيُصَلِّهَا إِذَا ذَكَرَهَا، لَا كَفَّارَةَ لَهَا إِلَّا ذَلِكَ”
“যে ব্যক্তি সালাত ভুলে যায়, সে যখন স্মরণ করবে তখনই তা পড়ে নেবে; এর কোনো কাফফারা নেই (ঘুম বা ভুলে যাওয়া ছাড়া)।” (সহিহ বুখারি, হা. ৫৯৭; সহিহ মুসলিম, হা. ৬৮৪)
শাইখ সালিহ আল-ফাওজান বলেন:
“অনিচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগকারী গুনাহগার নয়, তবে কাজা করা ওয়াজিব। যদি একাধিক সালাত ছুটে যায়, তাহলে ধারাবাহিকভাবে কাযা পড়বে।” (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওজান, ১/১২৩)
৩. সফরে সালাত পরিত্যাগের বিধান কী?
সফরে সালাত পরিত্যাগ করার কোনো অনুমতি নেই। বরং সফর অবস্থায়ও ফরজ সালাত যথাসময়ে আদায় করতে হবে। তবে সফরের জন্য শরিয়ত চার ওয়াক্তের দুই ওয়াক্তের সালাত (যোহর ও আসর, মাগরিব ও ইশা) একত্রে (‘জমা) পড়ার এবং চার রাকাত ফরজকে দুই রাকাত করে কসর (সংক্ষিপ্ত) করার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি নেই।
প্রমাণ:
- আল্লাহ বলেন: “فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلَاةِ إِنْ خِفْتُمْ أَنْ يَفْتِنَكُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا”
“যখন তোমরা ভ্রমণ করো, তখন সালাত কসর করাতে কোনো দোষ নেই, যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, কাফিররা তোমাদের ফিতনায় ফেলবে।” (সূরা আন-নিসা, ৪:১০১)
ইবন আব্বাস (রা.) বলেন: “এ আয়াত কসরের জন্য সাধারণত প্রযোজ্য, শুধু ভয়ের সময়ের জন্য নির্দিষ্ট নয়।” (সহিহ বুখারি, হা. ১০৮৮)
শাইখ ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন:
“সফর অবস্থায় সালাত আদায় করা ফরজ। কেউ যদি কোনো ওজর ছাড়াই সফরে সালাত ছেড়ে দেয়, তবে সে ইচ্ছাকৃত ত্যাগকারীর মতোই গুনাহগার।” (মাজমুআ ফাতাওয়া, ২৪/১০৩)
৪. সফরে ফরজ সালাত (কসর করার পর) বাড়ি ফিরে আসার পর কাজা করার সময় কসর নাকি পূর্ণ আদায়?
যদি কোনো ব্যক্তি সফর অবস্থায় একটি ফরজ সালাত (যেমন যোহর) কসর করে (২ রাকাত) না পড়ে—কারণ তখন অবস্থা এমন ছিল যে পড়তে পারেনি—এবং বাড়ি ফিরে এসে সেই সালাত কাজা করে, তাহলে সে তা কসর করবে (২ রাকাতই পড়বে), পূর্ণাঙ্গ (৪ রাকাত) নয়।
কারণ: কাজা করার সময় মূল আদায়ের সময়কার অবস্থা বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ যেই অবস্থায় সালাত ফরজ হয়েছিল (সফর), সেই অবস্থা অনুসারেই কাজা আদায় করতে হবে।
প্রমাণ:
- ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ ও ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) এই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন: “সফর অবস্থায় ফরজ হওয়া সালাত বাড়িতে এসে কসর করেই পড়তে হবে, পূর্ণ পড়া জায়েজ নয়।” (জাদুল মাআদ, ১/৪৭৮)
- শাইখ ইবন উসাইমীন বলেন: “যদি কোনো ব্যক্তি সফরে থাকাকালে একটি সালাত কাজা করে, কিন্তু বাড়ি ফিরে এসে তা আদায় করে, তাহলে সে কসর করবে। কারণ কাজা আদায়ের সময় মুকিম হলেও মূল আদায়ের (ফরজ হওয়ার) অবস্থা ছিল মুসাফির।” (আশ-শারহুল মুমতি’, ৪/৩৫০)
বিপরীত মত: ইমাম আহমাদ (রহ.) থেকে বর্ণিত আরেক রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে, মুকিম অবস্থায় কাজা করলে পূর্ণ পড়বে। তবে অধিকাংশ হাম্বলি বিশেষজ্ঞ ও শাইখ বিন বাজ, শাইখ আলবানীসহ প্রথম মতটিকেই শক্তিশালী বলেছেন। (মাজমু ফাতাওয়া ইবন বাজ, ১২/২৯৩)
৫. সফরে সালাত কাজা করার বিধান কী?
সফরে সালাত কাজা করার বিধান মুকিম অবস্থায় কাজার মতোই। যদি সফর অবস্থায় কোনো ওজরবশত (যেমন—ঘুম, ভুলে যাওয়া, বা জ্ঞান হারানো) সালাত ছুটে যায়, তাহলে স্মরণ হওয়া মাত্রই সেই সালাত সফর অবস্থায়ই কসর করে কাজা করতে হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য:
- যদি সফরে ছুটে যাওয়া সালাত ওই দিনের অন্য ওয়াক্তের ভেতরে মনে পড়ে, তাহলে সেটা জমা (একত্রে) করেও পড়তে পারবেন।
- যদি সফর শেষে বাড়ি ফিরে এসে মনে পড়ে, তাহলে উপরের নিয়মে (প্রশ্ন ৪ অনুযায়ী) কসর করেই কাজা করবেন।
শাইখ আলবানী (রহ.) বলেন:
“মুসাফিরের জন্য কসর ও জমা উভয়ই বৈধ। কাজার ক্ষেত্রেও একই হুকুম প্রযোজ্য—কসর করবে, পূর্ণ নয়।” (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, ক্যাসেট নং ৪৫)
সারসংক্ষেপ:
| প্রশ্ন | বিধান |
|--------|-------|
| ইচ্ছাকৃত ত্যাগ | কুফর (সাহাবী-ইমামগণের বিশিষ্ট মত) |
| অনিচ্ছাকৃত ত্যাগ | গুনাহ নয়, কাজা ওয়াজিব |
| সফরে ত্যাগ | বৈধ নয়; কসর/জমা করতে পারে |
| কসরের পর বাড়িতে কাজা | কসর করেই কাজা করবে (২ রাকাত) |
| সফরে কাজা | স্মরণ মাত্রই কসর করে পড়বে |
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সালাতের ব্যাপারে যত্নশীল করুন।