গর্ভাবস্থায় বারবার প্রস্রাব আসলে নামাজ পড়ার নিয়ম কি? এবং ওয়াসওয়াস নিয়ে প্রশ্ন
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আমি ওযু করে আসলে প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে আবার পানি বের হয়ে যায়,আবার পুনরায় ওযু করে আসার পর ও সালাতের মধ্যে পানি বের হয়ে যায়।বার বার প্রস্রাব আসে সারাদিনে।সালাতে কাশির সাথে প্রস্রাব চলে আসে।এমতাবস্থায় আমার কি করনীয়।দাঁড়িয়ে নামায পড়তে ও কষ্ট হয়।এখন আমার ১ম প্রশ্ন হচ্ছে:
ওযু করে আসার পর পানি বের হলে আমি কি পুনরায় ওযু করবো?
২য় প্রশ্ন:সালাতের মধ্যে কাশির সাথে প্রস্রাব বের হয়ে গেলে সে সালাত কি পুনরায় পড়বো?
৩ য় প্রশ্ন:সালাত কি বসে পড়তে পারবো?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
উত্তর
আপনি গর্ভাবস্থায় (৮ মাস) বারবার প্রস্রাব বের হওয়ার সমস্যায় ভুগছেন। এটি একটি স্বাভাবিক শারীরিক অবস্থা। ইসলামী ফিকহে এ ধরনের সমস্যাকে ‘উজর’ (excuse) হিসেবে গণ্য করা হয়। আপনি যদি সারা দিনে এমনভাবে বারবার প্রস্রাব বের হতে থাকেন যে, কোনো একটি ফরজ ওয়াক্তের পুরো সময়ে একটানা পবিত্র থাকা আপনার পক্ষে সম্ভব না হয়, তবে আপনি মা‘যূর (excused person) গণ্য হবেন।
নিম্নে আপনার তিনটি প্রশ্নের উত্তর হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে দেওয়া হলো।
১ম প্রশ্ন : ওযু করে আসার পর পানি বের হলে কি পুনরায় ওযু করতে হবে?
- আপনি যদি মা‘যূর হন, তাহলে প্রত্যেক ফরজ ওয়াক্তের জন্য একবার ওযু করাই যথেষ্ট। অর্থাৎ জোহরের ওযু করলে, সেই ওযু দিয়ে জোহরের ফরজ এবং তার আগে-পরের সুন্নত-নফল আদায় করতে পারবেন, যদিও ওযুর পর বারবার প্রস্রাব বের হয়।
- শুধু তখনই পুনরায় ওযু করতে হবে, যখন ওই ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাবে এবং পরবর্তী ওয়াক্তের সময় প্রবেশ করবে।
- মা‘যূর হওয়ার শর্ত : এক ওয়াক্তের পুরো সময়ে (যেমন যোহরের সময় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত) যদি আপনার শরীর থেকে বিরতি ছাড়া (অথবা অল্প বিরতি দিয়ে) ক্রমাগত নাপাকি বের হয়, তাহলে আপনি মা‘যূর।
- সতর্কতা : ওযুর আগে প্রস্রাবের স্থান ভালোভাবে ধুয়ে নিন এবং নাপাকি ছড়ানো রোধে প্যাড বা কাপড় ব্যবহার করুন।
প্রমাণ :
- রদ্দুল মুহতার (১/৩০৫) : “মা‘যূর ব্যক্তি প্রতি ওয়াক্তে একবার ওযু করবে; তার ওযু ওয়াক্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভাঙবে না, যদিও তার উজর চলতে থাকে।”
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৫০) : “যে ব্যক্তির সারা দিন প্রস্রাব ঝরতে থাকে, সে মা‘যূর।”
উপসংহার : আপনার ক্ষেত্রে এক ওয়াক্তের মধ্যে বারবার ওযু ভাঙলেও পুনরায় ওযু করার প্রয়োজন নেই; বরং ওই ওয়াক্তের জন্য একবার করাই যথেষ্ট।
২য় প্রশ্ন : সালাতের মধ্যে কাশির সাথে প্রস্রাব বের হলে কি সালাত পুনরায় পড়তে হবে?
- আপনি যদি মা‘যূর হন, তাহলে সালাতের ভেতর প্রস্রাব বের হলেও আপনার সালাত নষ্ট হবে না। আপনাকে পুনরায় পড়তে হবে না।
- মা‘যূর না হলে (অর্থাৎ মাঝে মাঝে বের হয়, কিন্তু পুরো ওয়াক্ত জুড়ে না), তাহলে সালাত ভেঙে যাবে এবং পুনরায় পড়তে হবে।
- যেহেতু আপনার ক্ষেত্রে সারা দিনেই বারবার প্রস্রাব আসছে, তাই আপনি মা‘যূর বলে গণ্য হবেন। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য টানা তিন দিন পর্যবেক্ষণ করুন : কোনো একটি ফরজ ওয়াক্তে যদি পুরো সময় জুড়ে প্রস্রাব বের হয় বা এমন পরিমাণে বের হয় যে অল্পক্ষণও পবিত্র থাকা কঠিন, তাহলে মা‘যূর হিসেবে গণ্য হবেন।
প্রমাণ :
- রদ্দুল মুহতার (১/৩০৫) : “মা‘যূর ব্যক্তির সালাত আদায়কালে উজর চলতে থাকলে সালাত ভাঙে না।”
- ফাতাওয়া উসমানী (২/২২৮) : “সালাতে কাশি বা হাঁচির সাথে অল্প পানি বের হলে তা মা‘যূরের জন্য ক্ষতিকর নয়।”
উপসংহার : আপনার সালাত পুনরায় পড়তে হবে না। তবে সালাত শেষে স্থানটি পবিত্র করে নেওয়া উত্তম।
৩য় প্রশ্ন : সালাত কি বসে পড়তে পারবো?
হ্যাঁ, আপনি বসে সালাত পড়তে পারবেন। কারণ দাঁড়িয়ে সালাত পড়তে আপনার কষ্ট হয় (গর্ভাবস্থার কারণে) এবং আপনি ৮ মাসের গর্ভবতী, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে অক্ষমতা বা কষ্টের কারণ।
- হানাফী ফিকহ অনুসারে, ফরজ সালাতে দাঁড়ানো ফরজ (ওয়াজিব); কিন্তু যদি দাঁড়াতে অক্ষম হন বা দাঁড়ালে ব্যথা হয়, তাহলে বসে পড়া জায়েয।
- বসে সালাত পড়ার নিয়ম : যে কোনোভাবে বসে পড়বেন—চেয়ারে বসে বা মাটিতে (পা মুড়ে বা সিজদার সময় যথাসম্ভব মাটিতে মাথা রেখে)। যদি সিজদা করতে কষ্ট হয়, তাহলে ইশারায় (মাথা নিচু করে) সিজদা আদায় করবেন।
- উত্তম : যতটুকু সম্ভব দাঁড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করুন; যদি অতিরিক্ত কষ্ট হয় বা গর্ভপাতের আশঙ্কা থাকে, তাহলে বসে পড়বেন।
প্রমাণ :
- কুরআন (২:২৮৬) : “আল্লাহ কোনো প্রাণীকে তার সামর্থ্যের বেশি দায়িত্ব দেন না।”
- হাদীস : ইমরান ইবনু হুসাইন (রা.)-এর হাদীসে এসেছে, “দাঁড়িয়ে সালাত পড়; যদি না পারো, বসে; যদি না পারো, কাত হয়ে (শুয়ে) পড়।” (সহীহ বুখারী, ১১১৭)
- রদ্দুল মুহতার (২/৯৮) : “যে ব্যক্তি দাঁড়াতে অক্ষম বা কষ্ট হয়, সে বসে পড়বে।”
উপসংহার : আপনার জন্য বসে সালাত পড়া জায়েয। ইচ্ছাকৃতভাবে দাঁড়ানো ছেড়ে না দিয়ে, কষ্টের মাত্রা বিবেচনা করে বসে পড়ুন।
সতর্কতা ও পরামর্শ
- পবিত্রতা : ওযুর সময় প্রস্রাবের স্থান ভালোভাবে ধুয়ে নিন। প্রস্রাব থামানোর জন্য প্যাড বা ন্যাপকিন ব্যবহার করতে পারেন।
- সালাতের সময় : যে ওয়াক্তের ওযু করবেন, পুরো ওয়াক্তের শুরুতে করে নিন; যাতে সারাদিনে বারবার ওযু করতে না হয়।
- ডাক্তারি পরামর্শ : শারীরিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের কাছে যান। ইনশাআল্লাহ, সন্তান প্রসবের পর অবস্থার উন্নতি হবে।
আল্লাহ আপনার জন্য সহজ করুন।