রুকইয়াহ করার সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্পর্কে
Faith and Belief · Hanafi
Question
, আমি হাত, চোখ, মুখ শক্ত করে চেপে ধরে হাত হাঁটুর সাথে আটকে রাখি। আমার প্রশ্ন হলো—এভাবে জোর করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আউট অব কন্ট্রোল হওয়া থেকে আটকানো কি ঠিক হচ্ছে?
Answer
রুকাইয়ার সময় নিজেকে জোর করে নিয়ন্ত্রণে রাখা: ইসলামী দৃষ্টিকোণ
সরাসরি উত্তর: আপনার প্রশ্নের উত্তর হলো—রুকাইয়ার সময় নিজেকে জোর করে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অস্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া (যেমন: হাত কাঁপা) আটকানোর জন্য চেষ্টা করা মোটেও ঠিক নয়। বরং এটি আপনার রুকাইয়ার কার্যকারিতা হ্রাস করতে পারে এবং আপনি যে জিন বা যাদুর প্রভাবে আক্রান্ত, তার থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
কেন এটি ঠিক নয়?
১. রুকাইয়ার উদ্দেশ্যই হলো জিন/যাদুর প্রভাব বের করা:
- রুকাইয়া শোনার সময় যদি আপনার শরীরে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় (যেমন: হাত কাঁপা, চিৎকার করা, অজ্ঞান হওয়া), এটি সাধারণত জিন বা যাদুর প্রভাবের বহিঃপ্রকাশ। এটাকে "দখল" বা "আক্রান্ত অবস্থা" বলা হয়।
- এই প্রতিক্রিয়াকে জোর করে চাপা দেওয়ার অর্থ হলো জিনকে দমিয়ে রাখা, যা তাকে পুরোপুরি বের হতে বাধা দেয়। রুকাইয়ার মাধ্যমে জিনকে বের করে দেওয়ার জন্যই এই প্রতিক্রিয়াগুলো স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পেতে দেওয়া উচিত।
২. হাদিস ও ফিকহের আলোকে নির্দেশনা:
- প্রিয়নবী (সা.)-এর যুগে জিনে আক্রান্ত ব্যক্তিকে রুকাইয়া দেওয়ার সময় তার প্রতিক্রিয়াকে বাধা দেওয়া হতো না। বরং কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা হতো এবং জিনের উপস্থিতি ও তার প্রভাব প্রকাশ পেতে দেওয়া হতো। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৮৬)
- ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে: "রুকাইয়ার সময় আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে যে অস্বাভাবিক নড়াচড়া বা কাঁপুনি দেখা দেয়, তা জিনের প্রভাবের লক্ষণ। এগুলোকে জোর করে দমন করলে জিন বের হবে না, বরং তা ভেতরেই থেকে যাবে। তাই প্রতিক্রিয়াগুলো স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পেতে দেওয়া উচিত।" (ফাতাওয়া উসমানি, ১/৫৪২)
৩. নিজেকে জোর করে নিয়ন্ত্রণ করলে কী ক্ষতি হতে পারে?
- জিন পুরোপুরি বের না হয়ে শরীরের ভেতরেই থেকে যেতে পারে।
- রুকাইয়ার পরেও আপনি আবার আগের মতো উপসর্গে ভুগতে পারেন।
- দীর্ঘমেয়াদে জিনের প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে বেশি সময় লাগতে পারে।
তাহলে কী করবেন? (সঠিক পদ্ধতি)
১. রুকাইয়া চলাকালীন স্বাভাবিক থাকুন:
- হাত কাঁপলে, শরীর নড়াচড়া করলে বা অন্য কোনো প্রতিক্রিয়া হলে তা জোর করে আটকানোর চেষ্টা করবেন না।
- বরং আল্লাহর ওপর নির্ভর করে স্থির থাকুন এবং মনে মনে "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" পড়তে থাকুন।
- রুকাইয়া প্রদানকারী ব্যক্তি (মুরাক্কি) যদি অভিজ্ঞ হন, তিনি সঠিক পদ্ধতিতে রুকাইয়া পরিচালনা করবেন।
২. নির্ভরযোগ্য ও অভিজ্ঞ রুকাইয়া প্রদানকারী বেছে নিন:
- যিনি কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী রুকাইয়া করেন, কোনো কুসংস্কার বা বিদআতী পদ্ধতি অবলম্বন করেন না।
- তিনি যেন জিনের প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারেন এবং সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেন।
৩. রুকাইয়ার পরবর্তী সময়ে করণীয়:
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত পড়া।
- সকাল-সন্ধ্যার দুয়া ও জিকির নিয়মিত করা (যেমন: আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস)।
- কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং তাওবা করা।
- অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া।
সতর্কতা:
- কখনোই নিজে নিজে রুকাইয়া করার চেষ্টা করবেন না যদি না আপনি প্রশিক্ষিত হন। জিনের চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
- রুকাইয়ার সময় কোনো প্রতিক্রিয়াকে ভয় পাবেন না। এটি জিনের বিদ্যমান থাকার প্রমাণ এবং রুকাইয়ার কার্যকারিতার লক্ষণ।
- জোর করে বা কষ্ট দিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া আটকানোর চেষ্টা মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। সম্পূর্ণভাবে সতর্ক থাকুন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
না, এভাবে জোর করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া আটকানো ঠিক নয়। বরং স্বাভাবিকভাবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পেতে দিন, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন এবং অভিজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে রুকাইয়া চালিয়ে যান। প্রয়োজনে একজন পূর্ণ যোগ্যতাসম্পন্ন রুকাইয়া বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন।
আল্লাহ আপনাকে জিন ও যাদুর ক্ষতি থেকে হেফাজত করুন। আমিন।