ইসলামিক নামের আইডি ব্যবহার করে অবৈধ সম্পর্ক বা যিনা কি আল্লাহর গজব ডেকে আনে? নেক আমল থাকলে কি রহমত পাওয়া সম্ভব?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
খ)নেক আমলও করে, ইসলামিক নামের আইডি নিয়ে অবৈধ সম্পর্ক বা যিনাও করে —উভয়ই আল্লাহর গজব ডেকে আনবেই নাকি আনবেনা রহমত পাবেনা।
Answer
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين
আপনার প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত। আমরা নিম্নে কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর প্রদান করছি।
ক) ইসলামিক নামের আইডি নিয়ে অবৈধ সম্পর্ক বা যিনা—উভয়ই আল্লাহর গজব ডেকে আনবেই নাকি আল্লাহ পাক চাইলে রহম করবেন?
উত্তর:
যিনা (অবৈধ যৌনসম্পর্ক) কুরআন-হাদিসে স্পষ্টভাবে হারাম ও কবিরা গুনাহ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“আর তোমরা যিনার কাছেও যেও না; নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৩২)
অন্য আয়াতে বলেন:
وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ ۚ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَٰلِكَ يَلْقَ أَثَامًا * يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا * إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ ۗ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا
“এবং যারা আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডাকে না, আল্লাহ যাকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন যথাযোগ্য কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করে না, এবং যিনা করে না। যে ব্যক্তি এগুলো করে সে শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামতের দিন তার শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সে সেখানে লাঞ্ছিত হয়ে চিরকাল থাকবে। তবে যারা তওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের পাপকর্মগুলো পুণ্যে পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা ফুরকান, ২৫:৬৮-৭০)
সুতরাং, যিনা একটি ঘৃণ্য অপরাধ। তবে ইসলাম দরজা বন্ধ করে দেয় না—যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে তওবা করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু তওবা ছাড়া গুনাহের ওপর অটল থাকা আল্লাহর গজব ডেকে আনে। আল্লাহর রহমত অপরিসীম—তিনি ইচ্ছা করলে অপরাধী বান্দাকেও ক্ষমা করতে পারেন, তবে শর্ত হলো বান্দা তওবা করবে। আর যদি তওবা না করে মৃত্যুবরণ করে, তবে সে আল্লাহর ইচ্ছার অধীন—ইচ্ছা করলে শাস্তি দেবেন, ইচ্ছা করলে ক্ষমা করবেন। তবে হাদিসে এসেছে, যিনা কবিরা গুনাহ এবং এর জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তি নির্ধারিত।
আর ইসলামিক নামের আইডি ব্যবহার করে যিনা বা অবৈধ সম্পর্ক করা দ্বিগুণ অপরাধ। কারণ একদিকে এটি ধোঁকা ও প্রতারণা, অন্যদিকে ইসলামের নামকে কলুষিত করা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
“মুসলিম সেই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।” (বুখারি, মুসলিম)
এমন ব্যক্তি যে নিজেকে ইসলামিক নামে পরিচয় দিয়ে অন্যায় করে, সে মুনাফিকের মতো আচরণ করে। শায়খ ইবনে আবেদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’-এ বলেছেন, কবিরা গুনাহ করলে তওবা ওয়াজিব, না করলে আখিরাতে শাস্তি অনিবার্য। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৫)
সারসংক্ষেপ: যিনা ও অবৈধ সম্পর্ক আল্লাহর গজব ডেকে আনে, তবে যদি ব্যক্তি তওবা করে, আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন। তওবা না করলে গজব আসা অনিবার্য নয় বরং তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন; কিন্তু সাধারণত গুনাহের শাস্তি অবশ্যম্ভাবী যদি না তওবা বা বিশেষ রহমত থাকে।
খ) নেক আমলও করে, ইসলামিক নামের আইডি নিয়ে অবৈধ সম্পর্ক বা যিনাও করে—উভয়ই আল্লাহর গজব ডেকে আনবেই নাকি আনবেনা, রহমত পাবেনা?
উত্তর:
একজন ব্যক্তি যদি নেক আমল করে (যেমন নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদি) কিন্তু একই সঙ্গে যিনা বা অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত থাকে, তাহলে তার অবস্থা কী হবে?
কুরআন স্পষ্ট বলে: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ
“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না; আর তা ছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা নিসা, ৪:৪৮)
যিনা শিরকের পরবর্তী পর্যায়ের বড় গুনাহ, তবে তা শিরকের মতো নয়। তাই যিনা করলেও ভালো কাজ সম্পূর্ণ নষ্ট হয় না, তবে গুনাহর কারণে সওয়াব হ্রাস পেতে পারে এবং গুনাহের শাস্তি থেকে বাঁচতে তওবা জরুরি।
হাদিসে এসেছে:
নবীজি (ﷺ) বলেছেন: الْعَبْدُ يَزْنِي وَيَزْنِي فَإِذَا تَابَ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ
“বান্দা বারবার যিনা করে, কিন্তু যখন তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।” (বুখারি, মুসলিম)
তবে কোনো ব্যক্তি যদি নেক আমলও করে অথচ যিনার ওপর অটল থাকে এবং তওবা না করে, তবে তার ভালো কাজগুলো কি তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করবে? না, সাধারণভাবে কবিরা গুনাহ তওবা ছাড়া ক্ষমা হয় না। কিন্তু তার ভালো কাজগুলো আল্লাহর কাছে জমা থাকে এবং তা তার শাস্তি লাঘব করতে পারে (সুন্নি মতানুযায়ী)। যেমন হাদিসে বর্ণিত, ব্যভিচারিণী এক নারীকে আল্লাহ একটি কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে ক্ষমা করেছিলেন। (বুখারি, মুসলিম) তাই নেক কাজের বিনিময়ে আল্লাহ অনুগ্রহ করতে পারেন।
হানাফি ফিকহের আলোকে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কবিরা গুনাহ করলে ঈমান যায় না, তবে ব্যক্তি ফাসিক হয়। তার ভালো আমলগুলো কবিরা গুনাহের কারণে বাতিল হয় না, বরং তা পৃথকভাবে মূল্যায়িত হবে। তবে গুনাহের জন্য তওবা ওয়াজিব, অন্যথায় আখিরাতে শাস্তি ভোগ করতে হবে। (আল-হিদায়া, ৪/২৯২; ফাতাওয়া আলমগিরি, ২/২৭২)
সারসংক্ষেপ: নেক আমল থাকা সত্ত্বেও যিনা করলে ব্যক্তি আল্লাহর গজব থেকে নিরাপদ নয়; বরং তাকে তওবা করতে হবে। যদি তওবা না করে মরে, তবে সে আল্লাহর ইচ্ছাধীন—ইচ্ছা করলে শাস্তি দেবেন, ইচ্ছা করলে তার ভালো কাজের কারণে দয়া করতে পারেন। কিন্তু আশা করা উচিত নয় যে নেক আমল স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাকে যিনার শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে দেবে। ইসলামে তওবাই পথ।
মোটকথা: যিনা যে কোনো অবস্থায় গুরুতর পাপ; নেক আমল তা মুছে দেয় না। আল্লাহর রহমতের আশা রেখে দ্রুত তওবা করা আবশ্যক।
প্রাসঙ্গিক হানাফি কিতাবের উদ্ধৃতি
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): “কবিরা গুনাহ তওবা ছাড়া ক্ষমা হয় না; তবে আল্লাহ চাইলে বিনা তওবায়ও ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু তা তাঁর ইচ্ছাধীন। গুনাহের ওপর অটল থাকা অবশ্যই গজবের কারণ।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/২৮৬, ৩৯৫)
- ফাতাওয়া আলমগিরি: “যিনা করা কবিরা গুনাহ; ইহার দুনিয়াবি শাস্তি (হদ্দ) এবং আখিরাতে শাস্তি রয়েছে। তওবা না করলে মুক্তি নাই।” (ফাতাওয়া আলমগিরি, ২/১৮৫)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): “নেক আমল করলেও যিনার মত কবিরা গুনাহ তওবা ছাড়া মাফ হয় না; তবে তওবা করলে আল্লাহ মাফ করেন।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৮১)
- তাফসির মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি): সূরা ফুরকানের ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, যিনা, হত্যা, শিরক—এগুলো কবিরা গুনাহ, তবে তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন এবং গুনাহকে নেকিতে রূপান্তরিত করেন। (মাআরিফুল কুরআন, ৬/৪৫০-৪৫২)
উপসংহার
- প্রথম অংশ: যিনা অবশ্যই আল্লাহর গজব ডেকে আনে, তবে তওবা করলে আল্লাহ রহম করতে পারেন। তওবা না করলে গজব আসার আশঙ্কা প্রবল।
- দ্বিতীয় অংশ: নেক আমল থাকা সত্ত্বেও যিনা করলে গজব আসবে কি না তা নিশ্চিত নয়; তবে গুনাহের শাস্তি থেকে বাঁচতে তওবা ওয়াজিব। নেক আমল গুনাহ মিটায় না, তবে আল্লাহর ইচ্ছায় তা শাস্তি লাঘব করতে পারে।
সর্বোত্তম পথ: অবিলম্বে তওবা ও ইস্তিগফার করা এবং ভবিষ্যতে এই পাপ থেকে দূরে থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন: قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
“বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ সকল গুনাহ ক্ষমা করেন।” (সূরা যুমার, ৩৯:৫৩)
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তওবা করার তাওফিক দিন এবং কবিরা গুনাহ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।