গোনাহ করলে ঈমান চলে যায় কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 1971
Questioner: Shawon
Question Asked: 24 Jun 2026, 01:27 PM
Reviewed & Published: 24 Jun 2026, 01:33 PM
Views: 57
Tokens: 4,033
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ক।গোনাহ করার সময় বা নিয়ত করার সময় গোনাহ করার ইচ্ছা থাকলে মনে বা ভিতরে ইসলামিক কিছু করার কথা মনে বা ভিতরে আসলে ইসলামিক কিছু না করে গোনাহ করলে,গোনাহের নিয়ত করলে বা গোনাহ চলমান থাকলে ইমান চলে যাবে কি?

★ উপরের ক আকারে প্রশ্ন একটা প্রশ্ন ভেঙ্গে উত্তর দেওয়ার দরকার নাই

Answer

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين

প্রশ্নের সারাংশ:
গোনাহ করার সময় বা গোনাহের নিয়ত করার সময় যদি অন্তরে ইসলামিক কিছু করার কথা আসে, কিন্তু তা না করে শুধু গোনাহই করা হয়, তাহলে কি ঈমান চলে যায়? অথবা শুধু গোনাহের নিয়ত করলেই কি ঈমান নষ্ট হয়ে যায়? অথবা গোনাহ চলমান থাকা অবস্থায় কি ঈমান চলে যায়?

উত্তর:
মনে রাখা জরুরি, গোনাহ করা ঈমান নষ্ট করে না—যতক্ষণ না তা কুফরি বা শিরকের পর্যায়ে পৌঁছে। অর্থাৎ কোনো ইসলামিক কাজের কথা মনে আসার পরেও যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে গোনাহ করে, তাহলে সে গুনাহগার হবে, কিন্তু ঈমান থেকে খারিজ হবে না। নিম্নে বিষয়টি কয়েকটি দিক থেকে বিশ্লেষণ করা হলো:


১. ঈমানের সংজ্ঞা ও গোনাহের সম্পর্ক

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতানুসারে ঈমান হলো অন্তরের বিশ্বাস ও জবানের স্বীকৃতি। আমল (কাজ) ঈমানের অঙ্গ নয়, বরং ঈমানের পরিপূর্ণতা ও শক্তির পরিচায়ক। তাই গোনাহ করলে ঈমান থাকে, তবে দুর্বল হয় এবং মরণ পর্যন্ত তওবা না করলে শাস্তির যোগ্য হয়। কিন্তু গোনাহের কারণে কেউ মুসলিম থাকা অবস্থায় কাফির হয় না।

হানাফি ফিকহের মূলনীতি:

"الذنب لا يخرج من الإيمان" – “গোনাহ ঈমান থেকে বের করে না।”
(ইবনে আবেদীন, রদ্দুল মুহতার, ৪/২২৩; ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/২৬৩)


২. গোনাহের নিয়ত বা ইচ্ছা

শুধু গোনাহ করার নিয়ত করলেই ঈমান চলে যায় না, যতক্ষণ না তা কুফরি আকিদা বা শিরকের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا، مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ"
“আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মতের অন্তরে উদিত খেয়ালকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তা কাজে বা কথায় পরিণত হয়।” (বুখারি, মুসলিম)

অতএব, গোনাহের নিয়ত করলেও তা শুধু অন্তরের কথা; যতক্ষণ না বাস্তবায়ন হচ্ছে, ততক্ষণ ঈমান অক্ষত থাকে।


৩. গোনাহ চলমান থাকা অবস্থায় ঈমান

গোনাহ চলমান থাকা অর্থাৎ কোনো গুনাহের কাজে লিপ্ত থাকার অর্থ এই নয় যে ঈমান চলে গেছে। বরং সেটি একটি পাপ কাজ, যার জন্য তওবা ও ইস্তিগফার জরুরি। তবে যদি গোনাহ করতে করতে এমন কিছু মুখে বলে ফেলে যা কুফরি (যেমন আল্লাহ বা রাসূলকে গালি দেওয়া, কুরআনকে মিথ্যা বলা ইত্যাদি), তাহলে ঈমান নষ্ট হবে। কিন্তু সাধারণ গোনাহ (যেমন মিথ্যা, চুরি, জিনা ইত্যাদি) ঈমান নষ্ট করে না।


৪. বিশেষ পরিস্থিতি: ইসলামিক কিছু করার কথা মনে আসার পর গোনাহ করা

প্রশ্নে উল্লেখিত অবস্থা—গোনাহের সময় বা নিয়তের সময় অন্তরে কোন ইসলামিক কাজের কথা আসল, কিন্তু তা না করে গোনাহ করল—এটিও ঈমান নষ্টের কারণ নয়। বরং এটি একটি মানসিক অবস্থা। ভালো কাজের কথা মনে আসা রহমত, কিন্তু তা পালন না করা গুনাহ। তবে ঈমান বিনষ্ট হওয়ার জন্য তা যথেষ্ট নয়।

তবে সতর্ক থাকা উচিত: দীর্ঘ সময় ধরে গোনাহ করতে থাকলে ঈমানের দুর্বলতা বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত কুফরি আকিদা জাগ্রত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই তওবা করা জরুরি।


৫. হানাফি কিতাব থেকে দলিল

  • ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:

    "لا يكفر بفعل المعصية إلا إذا اعتقد حلها أو استحلها"
    “গোনাহ করার কারণে কেউ কাফির হয় না, যদি না সে গোনাহকে হালাল বিশ্বাস করে।” (রদ্দুল মুহতার, ৪/২২৩)

  • ফাতাওয়া আলমগীরী তে এসেছে:

    "الذنوب لا تزيل الإيمان، وإنما تزيل كماله"
    “গোনাহ ঈমানকে নষ্ট করে না, বরং এর পরিপূর্ণতা নষ্ট করে।” (ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/২৬৪)

  • ইমাম তাহাবী (রহ.) তার আকিদা গ্রন্থে লিখেছেন:

    "ولا نكفر أحداً من أهل القبلة بذنب، ما لم يستحله"
    “আমরা কিবলাবাসী কাউকে গোনাহের কারণে কাফির বলি না, যতক্ষণ না সে গোনাহকে হালাল মনে করে।” (আল-আকিদাহ আত-তাহাবিয়্যা)


৬. সারসংক্ষেপ

  • গোনাহ করা বা গোনাহের নিয়ত করা ঈমান নষ্ট করে না, যতক্ষণ না তা কুফরি বা শিরক হয়।
  • ইসলামিক চিন্তা মনে আসার পরও গোনাহ করলে সেই গোনাহের জন্য লজ্জিত হতে হবে এবং তওবা করতে হবে, কিন্তু ঈমান বাকি থাকবে।
  • গোনাহ চলমান থাকা অবস্থায় ঈমান চলে যাওয়ার কোনো ভয় নেই, তবে গোনাহ থেকে বিরত থাকা এবং তওবা করাই কর্তব্য।
  • সতর্কতা: যদি কখনো মনে হয় গোনাহ হালাল, অথবা গোনাহর সময় আল্লাহর সাথে বিদ্রূপাত্মক কিছু মনে আসে বা মুখে বের হয়, তাহলে তা কুফরি হতে পারে এবং ঈমান পুনরায় ঘোষণা করতে হবে।

উপদেশ: গোনাহ করলেই ঈমান চলে যায়—এ ধারণা ভুল এবং ভীতিপ্রদর্শনজনক। বরং আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা রেখে তওবা করতে থাকুন। তবে গোনাহকে ছোট মনে না করে বড় জেনে তওবা করাই ঈমানের দাবি।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.