স্বামী ভাবির সাথে অবাধ মেলামেশা করলে করণীয়?

Family Life · Hanafi

Question No: 1960
Questioner: Umme Mohsina
Question Asked: 23 Jun 2026, 11:28 PM
Reviewed & Published: 23 Jun 2026, 11:32 PM
Views: 84
Tokens: 5,624
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম
আমার বিয়ের তিন বছর। আমার একটি ছেলে সন্তান আছে। আমার হাসবেন্ড মাহরাম বাসায় মেইনটেইন করে না তার দুই ভাবির সাথে। এই ব্যাপারে আমি কিছু বললে তখন তিনি বলেন ভাইয়া দের কারণে মেইনটেইন করতে পারে,না হয় হেসে আমার কথা উড়িয়ে দেয় বা বলে আপনার বলার অধিকার আছে বলছেন আমি শুনছি,উনার মতো কথা না হয়লে ঝগড়া করে আমার সাথে। আর বলে ইসলাম আমাকে ওই অধিকার দেই নাই যে আমার কথা উনি শুনতে বাধ্য।আমার হাসব্যান্ড নামাজ পরেন সবসময় আল্লাহ বিধি বিধান মেনে চলার চেষ্টা করেন কিন্তু মাহরাম মেইনটেইন করেন না অনেক কথা বলে অযথা ভাবিদের সাথে যেটা আমার একদমই পছন্দ না।আবার অন্য দিকে আমার পর্দার ব্যাপারে কঠোর থাকেন সবসময় আলহামদুলিল্লাহ। এখন আমি এই বিষয় নিয়ে কিভাবে মোকাবেলা করব

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমেই আপনাকে জানিয়ে রাখি, ইসলামে পর্দা ও মাহরামের বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার স্বামী পর্দার ব্যাপারে কঠোর থাকলেও নিজে মাহরাম না মানা ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী। নিম্নে বিষয়টি কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. মাহরাম ও পর্দার সংজ্ঞা

মাহরাম হলেন সেই ব্যক্তি যার সাথে বিবাহ চিরতরে হারাম, যেমন পিতা, ভাই, চাচা, শ্বশুর ইত্যাদি। ভাবি (দেবর/শ্যালকের স্ত্রী) স্বামীর জন্য গায়রে মাহরাম। তাই তাদের সাথে অবাধ মেলামেশা, হাসি-ঠাট্টা, প্রাইভেট কথোপকথন, স্পর্শ ইত্যাদি হারাম
(সূরা আন-নূর: ৩১, সূরা আল-আহযাব: ৫৫; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৯; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২৫)

২. স্বামীর অজুহাতের শরয়ী বিশ্লেষণ

  • "ভাবিদের সাথে মেইনটেইন করতে বাধ্য" - এটি সম্পূর্ণ ভুল। ইসলামে "ভাইয়ের কারণে" মাহরাম ভঙ্গ করা জায়েজ নয়। বরং ভাবিদের সাথে পর্দা ও দূরত্ব বজায় রাখা ফরজ।
  • "স্ত্রীর কথা শোনার অধিকার নেই" - ইসলামে স্ত্রীর শরয়ী দাবি শোনা স্বামীর উপর ওয়াজিব। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম যে নিজ পরিবারের কাছে উত্তম" (তিরমিজি, ৩৮৯৫)। স্ত্রীর শরয়ী পরামর্শ অগ্রাহ্য করা অহংকারের শামিল।
  • "আপনার বলার অধিকার নেই" - এটি সঠিক নয়। বরং স্ত্রীকে সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার অধিকার ইসলাম দিয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন: "মুমিন পুরুষ ও নারী একে অপরের বন্ধু; তারা ভালো কাজের আদেশ দেয় ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে" (সূরা আত-তাওবা: ৭১)।

৩. হানাফি ফিকহের দলিল

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন: "গায়রে মাহরাম নারীর সাথে অবাধ মেলামেশা করা কবিরা গুনাহ।" (আল-হিদায়া, ৪/৪৫৬)
  • ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন: "স্বামী যদি স্ত্রীকে পর্দার আদেশ দেয় কিন্তু নিজে মাহরাম না মানে, তবে তা মুনাফিকীর লক্ষণ।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭২)
  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ফতোয়ায় উল্লেখ করেন: "ভাবি-দেবরের মধ্যে মাহরামের সীমা লঙ্ঘন হারাম। এতে পরিবারে অশান্তি ও বরকত নষ্ট হয়।" (মা'আরিফুল কুরআন, ৬/৭৮৯)

৪. ব্যবহারিক সমাধান

(ক) নরমভাবে শরয়ী দলিল উপস্থাপন করুন

স্বামীকে কুরআন-হাদিসের বাণী শোনান। যেমন:

  • "মুমিনদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি নিচু করুক এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করুক।" (সূরা আন-নূর: ৩০)
  • "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন কোনো গায়রে মাহরাম নারীর সাথে একান্তে না বসে।" (মুসনাদে আহমদ, ২/৪০০)

(খ) দ্বীনি আলেমের সাহায্য নিন

স্থানীয় কোনো বিজ্ঞ আলেম বা দ্বীনদার ব্যক্তির মাধ্যমে স্বামীকে বুঝানোর চেষ্টা করুন। অনেক সময় নিজের কথা শুনতে না চাইলেও আলেমের কথা শোনেন।

(গ) দোয়া ও ধৈর্য ধারণ করুন

আল্লাহর কাছে স্বামীর হেদায়েতের জন্য দোয়া করুন। যেমন দোয়া: "رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ" (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪) – "হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মাধ্যমে আমাদের চোখ শীতল করুন।"

(ঘ) নিজের পর্দা অটুট রাখুন

স্বামী যেহেতু আপনার পর্দার ব্যাপারে কঠোর, তাই এই ভালো দিকটি ধরে রাখুন। এটি আপনার ঈমানের দৃঢ়তার প্রমাণ।

৫. সতর্কতা

  • স্বামীর সাথে ঝগড়া বা তর্ক করবেন না। বরং এমন আচরণ করুন যেন তিনি আপনার ইসলামী জ্ঞান ও ধৈর্য দেখে লজ্জিত হন।
  • যদি তিনি আপনার শরয়ী দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান, তবে এটি নিফাক (মুনাফিকি) এর লক্ষণ হতে পারে। তবে আশা করা যায়, তিনি নামাজি ব্যক্তি, তাই একদিন হেদায়েত পাবেন।

৬. চূড়ান্ত পরামর্শ

ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক মৈত্রী ও সহযোগিতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। আপনার স্বামীকে বুঝিয়ে বলুন যে মাহরাম না মানা আল্লাহর আদেশের বিপরীত এবং এটি পরিবারের বরকত ও শান্তি নষ্ট করে। যদি তিনি তা না মানেন, তবে আপনি নিজের পূর্ণ পর্দা বজায় রেখে তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করুন। প্রয়োজনে মাহরামের মাধ্যমে কথা বলার চেষ্টা করুন।

আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও প্রজ্ঞা দান করুন। আমিন।

উল্লেখিত কিতাবসমূহ:

  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভি)
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
  • বাহিশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভি)
  • মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
  • আল-হিদায়া (মারগিনানী)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.