নামাজ ফাসিদ হওয়া সংক্রান্ত কিছু বিষয় নিয়ে জানতে চাই?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 1945
Questioner: TᕼIᕼᗩᑎ
Question Asked: 23 Jun 2026, 05:47 PM
Reviewed & Published: 23 Jun 2026, 05:51 PM
Views: 76
Tokens: 5,715
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

(১) নামাজে দাড়ালে বিভিন্ন চিন্তা আসে, যা হাসির উদ্রেগ করে।
(২) কোন হাস্যকর কিছু না ঘটলেও, মাথায় ওইটা নিয়ে বিভিন্ন চিন্তা আসে, যা হাসির উদ্রেগ করে।
(৩) হাস্যকর কিছু ঘটলে, হাসি চলে আসে।
(৪) জামাতে নামাজ পড়ার সময় মাঝে মাঝে মনে হয়, যে নিজে থেকে তাসবিহ বা নামাজের দুয়া পড়লে গেলেই মুখ দিয়ে কথা বের হয়ে যাবে।
(৫) মাঝে মাঝে মনে হয়, কোন আয়াত তেলাওয়াত শেষ হলেই কথা বের হবে, সেইটা নিয়ন্ত্রনে নিতে মুখ দিয়ে শব্দ করা হয়, যাতে শব্দ না বের হয়।
(৬) আবার তাশাহহুদ বা দুরুদ বা দোয়া পড়ার পড়ে, এর একটা অংশ ভুলে রিপিট হয়ে যায়।
(৭) হাসি কন্ট্রোল করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু তা করতে গেলেও শব্দ হয়।
এ অবস্থায় করণীয় কী?

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

প্রশ্নের উত্তর

আপনার উল্লেখিত সমস্যাগুলো মূলত ওয়াসওয়াসা (শয়তানের প্ররোচনা) এবং মানসিক চাপ জনিত। নামাজের মধ্যে হাসির উদ্রেক হয় এমন চিন্তা আসা, কথা বের হয়ে যাওয়ার ভয়, হাসি নিয়ন্ত্রণে গিয়ে শব্দ হওয়া ইত্যাদি সবই শয়তানের পক্ষ থেকে নামাজ নষ্ট করার বা মনোযোগ নষ্ট করার কৌশল। হানাফি ফিকহের আলোকে এর সমাধান নিচে দেওয়া হলো।

(১) হাসির উদ্রেক করে এমন চিন্তা আসা:

নামাজে দাঁড়ালে বা যেকোনো সময় মনে হাস্যকর চিন্তা আসা শয়তানের কাজ। এটি ওয়াসওয়াসা। যতক্ষণ না আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে হাসেন (দাঁতের ফাঁক দিয়ে শব্দ বের হয়) বা কথা বলেন, ততক্ষণ নামাজ ভঙ্গ হবে না। আপনি শুধু এ চিন্তাগুলোকে গুরুত্ব দেবেন না এবং নামাজে মনোযোগ দেবেন।

হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের কারো নামাজে এসে তাকে ওয়াসওয়াসা দেয়, এমনকি সে জানতে পারে না যে, সে কত রাকাত পড়েছে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬০৮)।

(২) হাস্যকর কিছু না ঘটলেও চিন্তা আসা:

এটিও ওয়াসওয়াসা। শয়তান নামাজে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে বিভিন্ন চিন্তা আসে। এজন্য আপনাকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে এবং নামাজের শুরুতে আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম বলার গুরুত্ব পালন করতে হবে। মনে রাখবেন, এসব চিন্তার কারণে নামাজ নষ্ট হয় না, যদি আপনি তা বাস্তবে রূপ না দেন।

(৩) হাস্যকর কিছু ঘটলে হাসি চলে আসা:

নামাজের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে হাসি (যা দাঁতের ফাঁক দিয়ে শব্দ বের হয়) আসা নামাজ ভঙ্গের কারণ। কিন্তু যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলে হাসি বের হয়, তাহলে নামাজ ভঙ্গ হবে না, তবে ইচ্ছাকৃত হলে নামাজ ভঙ্গ হবে এবং পুনরায় পড়তে হবে।

রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): "إذا ضحك في الصلاة فسدت" (إذا كان عن عمد وسمع نفسه) (রদ্দুল মুহতার ২/২৬) - অর্থাৎ, নামাজে ইচ্ছাকৃত হাসলে নামাজ ভঙ্গ হয়, শর্ত হলো সে নিজের হাসি শুনতে পায়।

(৪) মুখ দিয়ে কথা বের হয়ে যাওয়ার ভয়:

নামাজে নিজ থেকে তাসবিহ বা দুয়া পড়ার কারণে কথা বের হয়ে যাবে—এমন চিন্তা ওয়াসওয়াসা। নামাজের মধ্যে কেবল নামাজ সংক্রান্ত দুয়া ও তাসবিহ পড়া জায়েয। আপনি নামাজের মধ্যে কুরআন, তাসবিহ, দুরুদ, দুয়া পড়বেন, এতে কোনো সমস্যা নেই। বরং শয়তান আপনাকে এ ওয়াসওয়াসা দিয়ে নামাজের মধ্যে অন্য চিন্তায় ফেলতে চায়। আপনি স্বাভাবিকভাবে নামাজ পড়বেন

(৫) আয়াত শেষে কথা বের হওয়া নিয়ন্ত্রণে শব্দ করা:

নামাজের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ দিয়ে শব্দ করা (যেমন 'হুম' বা 'উহ' করা) যদি দুই হরফ স্পষ্ট হয়, তাহলে নামাজ ভঙ্গ হবে। তবে যদি আপনি অনিচ্ছাকৃতভাবে এটি করেন, তাহলে নামাজ ভঙ্গ হবে না। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ দিয়ে কোনো শব্দ করবেন না। ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।

ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): নামাজের মধ্যে ওয়াসওয়াসার জন্য কোনো ক্ষতি নেই, যতক্ষণ না তা ইচ্ছাকৃত কাজে পরিণত হয়।

(৬) তাশাহহুদ, দুরুদ বা দুয়া ভুলে রিপিট হওয়া:

নামাজের মধ্যে কোনো অংশ ভুলে পুনরাবৃত্তি হয়ে গেলে, যদি তা অনিচ্ছাকৃত হয়, তাহলে নামাজ ভঙ্গ হবে না। তবে ইচ্ছাকৃত ভাবে পুনরাবৃত্তি করলে ওয়াজিব নিকট (মাকরুহ তাহরিমি) হতে পারে। ভুলে গেলে সিজদা সাহু ওয়াজিব হয়? না, যদি কোনো ফরজ বা ওয়াজিব বাদ না যায়। তবে যদি মনে হয় যে ওয়াজিব তরক হয়েছে, তাহলে সিজদা সাহু দিয়ে নামাজ শুদ্ধ করে নিন। আপনি যদি নিশ্চিত না হন, তাহলে সিজদা সাহু দিলেই উত্তম।

(৭) হাসি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে শব্দ হওয়া:

হাসি চাপতে গিয়ে 'হুম' বা অন্য শব্দ বের হলে, যদি তা ইচ্ছাকৃত হয় এবং দুই হরফের কম হয়, তাহলে নামাজ ভঙ্গ হবে না। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে শব্দ করলে এবং তা যদি স্পষ্ট হয় (যেমন 'আহ' বা 'উহ'), তাহলে নামাজ ভঙ্গ হবে। এজন্য নামাজের সময় সম্পূর্ণ নীরব থাকবেন এবং হাসি এলে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে মুখে কোনো শব্দ আনবেন না।


করণীয়:

  1. ওয়াসওয়াসা গুরুত্ব দেবেন না: শয়তানের এসব প্ররোচনাকে পাত্তা না দেওয়াই সবচেয়ে বড় সমাধান। মনে রাখবেন, নামাজ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আপনার এসব চিন্তার জন্য আপনি দায়ী নন।

  2. নামাজের শুরুতে আউজুবিল্লাহ পড়ুন: সূরা ফাতিহার আগে আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম বলুন এবং নামাজ জুড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।

  3. নামাজে ধীরস্থিরতা ও খুশু: নামাজের অর্থ বোঝার চেষ্টা করুন। ধীরে ধীরে পড়ুন, যাতে শয়তানের ওয়াসওয়াসা প্রবেশ করতে না পারে।

  4. ওয়াসওয়াসার দোয়া: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো দোয়া পড়ুন: "أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ" এবং "بِسْمِ اللَّهِ" বলে ডান পাশে থুথু ফেলুন (যদি নামাজে না থাকেন)।

  5. হাসি এলে: যদি হাসি আসে, তবে নিজেকে সংযত করুন এবং মনে মনে বলুন যে, এটি শয়তানের কাজ। কোনো শব্দ করবেন না। যদি হাসি বের হয়েই যায়, তাহলে যে রুকনে হাসি হয়েছে, তা থেকে পুনরায় শুরু করুন বা নামাজ শেষে সিজদা সাহু দিন? না, ইচ্ছাকৃত হাসি নামাজ ভঙ্গ করে, তাই পুনরায় নামাজ পড়তে হবে। কিন্তু অনিচ্ছাকৃত হলে নামাজ ভঙ্গ হবে না।

  6. চিকিৎসা নিন: যদি এ সমস্যা খুব বেশি হয়, তাহলে একজন আলেম বা মনোবিজ্ঞানী এর পরামর্শ নিন। কারণ এটি অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিজঅর্ডার (OCD)-এর লক্ষণ হতে পারে।


ফতোয়ার সারসংক্ষেপ:

  • নামাজে হাসির উদ্রেককারী চিন্তা আসা ওয়াসওয়াসা। এটি নামাজ নষ্ট করে না।
  • ইচ্ছাকৃত হাসি (দাঁতের ফাঁক দিয়ে শব্দ) নামাজ ভঙ্গ করে।
  • অনিচ্ছাকৃত হাসি বা কথা নামাজ ভঙ্গ করে না।
  • নামাজে নিজ থেকে তাসবিহ বা দুয়া পড়ার সময় কথা বের হওয়ার ভয় ওয়াসওয়াসা
  • ওয়াসওয়াসা নিয়ন্ত্রণে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন এবং নামাজ চালিয়ে যান।

আল্লাহ তাআলা আপনার নামাজ কবুল করুন এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

রেফারেন্স:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) - ২/২৬ (হাসি প্রসঙ্গ)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) - ১/২৪৩ (ওয়াসওয়াসা প্রসঙ্গ)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া - ১/১০৯ (হাসি ও কথা প্রসঙ্গ)
  • বাহিশ্তী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) - নামাজের খুশু ও ওয়াসওয়াসা অধ্যায়
  • সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬০৮ (শয়তানের ওয়াসওয়াসা)
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী) - ২/১৪২

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.