টয়লেট ভেঙে রুম বা রান্নাঘর বড় করলে জ্বীনের উৎপাত শুরু বা বেড়ে যায় কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
টয়লেট ভেঙ্গে যদি রুম/কিচেন বড় করা হয় সেক্ষেত্রে কি ঘরে জ্বীনের উৎপাত শুরু হতে পারে? বা বেড়ে যেতে পারে?
করণিয় কী?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
প্রশ্নে উল্লেখিত বিষয়টি সরাসরি কোনো কুরআন-হাদীস বা হানাফী ফিকহের কিতাবে এভাবে বর্ণিত নেই যে, টয়লেট ভেঙে ঘর বা রান্নাঘর বড় করলে জ্বীনের উৎপাত শুরু হয় বা বাড়ে। তবে ইসলামী আকীদা অনুযায়ী জ্বীন একটি সৃষ্টিজগত, তারা মানুষের মতোই বিভিন্ন স্থানে বসবাস করে। কিছু হাদীসে এসেছে, জ্বীনরা পরিচ্ছন্ন ও অপরিচ্ছন্ন উভয় প্রকার স্থানেই থাকতে পারে, তবে বিশেষ করে অপরিচ্ছন্ন স্থান (যেমন পায়খানা, আবর্জনার স্তূপ, ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘর) তাদের বেশি পছন্দ।
নিম্নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উল্লেখ করা হলো:
১. জ্বীনের অবস্থান সম্পর্কে হাদীস
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«إِذَا دَخَلْتُمُ الْغَائِطَ فَلَا تَسْتَقْبِلُوا الْقِبْلَةَ وَلَا تَسْتَدْبِرُوهَا، وَلَكِنْ شَرِّقُوا أَوْ غَرِّبُوا»
অর্থ: “যখন তোমরা পায়খানায় প্রবেশ কর, তখন কিবলার দিকে মুখ করো না, পিঠও দিও না, বরং পূর্ব বা পশ্চিম দিকে ফিরে বসো।” (বুখারী, মুসলিম)
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, পায়খানা এমন একটি স্থান যেখানে জ্বীনের উপস্থিতি বেশি হতে পারে, তাই সেখানে কিবলামুখী হওয়া নিষেধ করা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, টয়লেট ভেঙে ঘর করলে সেখানে জ্বীনের উৎপাত বাড়বে।
২. নির্মাণ ও সংস্কারকালীন সময়ে জ্বীন প্রসঙ্গ
ফাতাওয়ায়ে উসমানী (১/৩৭৫) এবং ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৫০) তে এসেছে— জ্বীনরা সাধারণত নির্জন, অন্ধকার ও পুরনো জায়গায় বেশি থাকে। কোনো স্থানে নতুন নির্মাণ বা সংস্কার করলে সে স্থানের জ্বীনরা হয়তো অন্যত্র চলে যায় অথবা নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়। নির্দিষ্টভাবে এ থেকে কোনো ক্ষতি হওয়ার প্রমাণ শরীয়তে নেই।
৩. করণীয় কী?
উৎপাত বাড়ার ভয় না করে বরং নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মেনে চলা উচিত:
-
প্রতিটি কর্মে আল্লাহর নাম নেওয়া: ঘর নির্মাণের সময়, রান্নাঘর বা টয়লেট ব্যবহারের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ পড়া।
-
আয়াতুল কুরসি ও সূরা বাকারা তিলাওয়াত: ঘরে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করলে জ্বীনের উৎপাত থেকে নিরাপদ থাকা যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ»
অর্থ: “তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না। নিশ্চয় শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায় যেখানে সূরা বাকারা পড়া হয়।” (মুসলিম) -
টয়লেট ব্যবহারের আদব: টয়লেটে প্রবেশের সময় বাম পা দিয়ে প্রবেশ করে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খাবাইস’ পড়া এবং বের হওয়ার সময় ডান পা দিয়ে বের হয়ে ‘গুফরানাক’ বলা। (আবু দাউদ, তিরমিযী)
-
ঘরের কোনো অংশ যদি আগে টয়লেট ছিল এবং তা এখন রান্নাঘর বা বসার ঘরে পরিণত করা হয়, তাহলে সেখানে পবিত্রতা বজায় রাখা এবং নিয়মিত নামাজ, জিকির, কুরআন তিলাওয়াত করা।
৪. ভিত্তিহীন ধারণা পরিহার
অনেক এলাকায় কুসংস্কার প্রচলিত আছে যে, টয়লেট ভেঙে ঘর করলে জ্বীনের উপদ্রব হয়। ইসলামী দৃষ্টিতে এ ধরনের বিশ্বাস ঠিক নয়। বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে শরীয়তের বিধান মেনে চললে কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
৫. যদি ইতিমধ্যে সমস্যা দেখা দেয়
যদি কেউ মনে করে তার ঘরে জ্বীনের উৎপাত বেড়েছে, তাহলে করণীয়:
- পূর্ণ বিশ্বাস ও একাগ্রতার সাথে সূরা বাকারা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক ও নাস, এবং সূরা ইখলাস বেশি বেশি পড়া।
- ঘর থেকে বাজে ছবি, মূর্তি, ও বাজে কথা-বার্তা দূর করা।
- কোনো জাদু বা অশুভ আশঙ্কা থাকলে বিদ্বান আলেমের শরণাপন্ন হওয়া।
মোটকথা: টয়লেট ভেঙে রুম বা রান্নাঘর বড় করলে জ্বীনের উৎপাত শুরু বা বেড়ে যাওয়ার কোনো প্রমাণ শরীয়তে নেই। এটি একটি কুসংস্কার মাত্র। কিন্তু যদি আগে থেকেই সেখানে জ্বীনের বসবাস ছিল, তাহলে সংস্কারের সময় তারা চলে যেতে পারে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে ইসলামী আদব ও জিকির-আযকারের মাধ্যমে নিজের ঘরকে নিরাপদ রাখুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
সূত্র:
- কুরআনুল কারীম (সূরা বাকারা, আয়াত ২৫৫)
- সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৯৪
- সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৪
- ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৭৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৫০
- রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১০৮
- বেহেশতি জেওর, প্রথম ভাগ, পৃষ্ঠা ১৬২