হিজাব ছাড়া গান গাওয়ায় এক তরুনীকে বেত্রাঘাত করার ব্যাপারে ইসলাম কি বলে?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 1933
Questioner: Md. Nuhan Tahery
Question Asked: 23 Jun 2026, 10:47 AM
Reviewed & Published: 23 Jun 2026, 10:52 AM
Views: 102
Tokens: 41,424
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

সম্প্রতি হিজাব ছাড়া একটি আদালত একজন গায়িকাকে বেত্রাঘাত এর শাস্তি দিয়েছেন। কারণ তিনি ইসলামের বিধান অমান্য করেছেন।

আমার প্রশ্ন হল:
১। কেবল ইসলামের বিধান অমান্য করায় কি কাউকে বেত্রাঘাত করা যায়? এটা কি জুলুম নয়? ইসলাম তো মধ্যমপন্থী ধর্ম। আল্লাহ বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। তাহলে এখানে মধ্যমপন্থা কোথায়?

২। হিজাব না পড়া, গান গাওয়া এসব কারণে কি ইসলামে শাস্তির বিধান আছে?

৩। তাজির নাকি মাত্র ১০ বেত্রাঘাত এবং খুব সামান্য। নাস্তিকরা দাবি করছে ধর্ষনের শাস্তি ইসলামে নেই এবং তাজির করত্ব হলে সর্বোচ্চ ১০ বেত্রাঘাত করা যাবে। তাজির এর মাধ্যম্ব নাকি লঘু শাস্তিই দেয়া হয়।এ ব্যাপারে ইসলাম কি বলে।

৪। ইসলামি যুগে ধর্ষণের শাস্তি কি দেয়া হত? রাসুল (সা) নাকি এক ধর্ষক কে তওবা করার কারণস ছেড়ে দিয়েছিলেন এটা নিয়ে নাস্তিকরা প্রশ্ন তুলছে। এ ব্যাপারে জানান

Answer

প্রশ্নের উত্তর

আপনার প্রশ্নটি ইসলামী ফৌজদারি আইনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পর্শ করেছে। নিচে হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত ও কিতাবী দলিলের আলোকে প্রতিটি পয়েন্টের উত্তর প্রদান করা হলো।


১. ইসলামের বিধান অমান্য করায় বেত্রাঘাত করা কি জুলুম? মধ্যমপন্থা কোথায়?

উত্তর: ইসলাম কখনো অপরাধ ছাড়া শাস্তি দেয় না। তবে কোনো রাষ্ট্র যদি ইসলামী শরিয়তের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে সরকারি পর্যায়ে শরিয়তের বিধান লঙ্ঘনকারীকে তা‘যীর (শাসক কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি) দেওয়া বৈধ। এটি জুলুম নয়, বরং সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।

মধ্যমপন্থা বলতে এখানে বোঝায়- আল্লাহ বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি উভয়ই নিষেধ করেছেন (সূরা বাকারা: ১৪৩)। কিন্তু মধ্যমপন্থার অর্থ এই নয় যে, অপরাধীর শাস্তি হবে না; বরং শাস্তি হবে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী, নাড়া বাড়ি না করে। ইসলামী আইনে তা‘যীরের কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ নেই; বিচারক অপরাধের গুরুত্ব ও অপরাধীর অবস্থা বিবেচনায় কম বা বেশি শাস্তি নির্ধারণ করতে পারেন। এটি জুলুম নয়, বরং ন্যায়বিচার।

রদ্দুল মুহতার (৫/২২৭): "তা‘যীর হল এমন শাস্তি যা শাসক বা বিচারক অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী নির্ধারণ করবেন। এটি হদ্দ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে না, তবে মামলার গুরুত্ব অনুযায়ী তা কঠোরও হতে পারে।"

আল-হেদায়া (২/১০৪): "তা‘যীরের পরিমাণ অপরাধের ধরন ও অপরাধীর অবস্থার উপর নির্ভর করে; এটি সর্বদা ১০ বেত্রাঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।"


২. হিজাব না পড়া ও গান গাওয়ার জন্য ইসলামে শাস্তির বিধান আছে কি?

উত্তর: হিজাব না পড়া ও হারাম গান গাওয়া উভয়ই গুনাহ (বড় পাপ), কিন্তু এগুলোর জন্য কোরআন-সুন্নায় নির্ধারিত কোনো হদ্দ বা শারীরিক শাস্তি নেই। তবে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসক বা বিচারক যদি দেখেন যে, কেউ প্রকাশ্যে এগুলো করে সমাজে ফিতনা ও পাপাচার ছড়াচ্ছে, তাহলে তিনি তা‘যীর হিসেবে শাস্তি দিতে পারেন। এই শাস্তি হতে পারে তিরস্কার, অর্থদণ্ড, বা বেত্রাঘাত ইত্যাদি।

ফতোওয়া আলমগীরী (৩/৪৬৪): "যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে পাপাচার করে এবং তাকে নিষেধ করেও থামে না, তাহলে শাসক তাকে তা‘যীর দিতে পারেন। তা‘যীরের মধ্যে বেত্রাঘাতও অন্তর্ভুক্ত।"

আহকামুল কুরআন (জাসসাস, ২/৫৪২): "হিজাবের বিধান অমান্য করা গুনাহ, কিন্তু এর জন্য কোনো নির্ধারিত শারীরিক শাস্তি নেই। তবে ফিতনা প্রতিরোধের লক্ষ্যে শাসক ‘তা‘যীর’ দিতে পারেন।"


৩. তা‘যীর কি সর্বোচ্চ ১০ বেত্রাঘাত? নাস্তিকদের দাবি কি সঠিক?

উত্তর: নাস্তিকদের দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইসলামী ফিকহের কিতাবসমূহে তা‘যীরের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বেঁধে দেওয়া হয়নি। হ্যাঁ, কিছু হাদীসে ‘১০ বেত্রাঘাতের বেশি না মারতে’ বলা হয়েছে, কিন্তু তা নির্দিষ্ট কিছু ছোট অপরাধের জন্য এবং তা‘যীরের সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

হাদীস: "তোমরা আল্লাহর নির্ধারিত হদ্দ (শাস্তি) ব্যতীত দশের বেশি বেত্রাঘাত করো না।" (বুখারী, মুসলিম)

তবে এই হাদীসটি তা‘যীরের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের জন্য নয়, বরং তা‘যীরকে হদ্দের চেয়ে কম রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রহ) বলেছেন, তা‘যীর কখনো হদ্দ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তা‘যীর সবসময় ১০ টি বেত্রাঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে; বরং বিচারক অপরাধের গুরুত্ব অনুসারে ৩৯ বেত্রাঘাত পর্যন্ত দিতে পারেন (হানাফী মতে)।

ইমদাদুল ফতোয়া (৫/২৩০): "তা‘যীর কখনো হদ্দ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে না। তবে তা‘যীরের সর্বোচ্চ সীমা ১০ নয়; বরং ৩৯ বেত্রাঘাত (হানাফী মতে) পর্যন্ত হতে পারে।"

ফতোওয়া উসমানী (২/৪১): "ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের জন্য তা‘যীরের বিধান মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, এবং তা‘যীর ১০ বেত্রাঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।"


৪. ইসলামী যুগে ধর্ষণের শাস্তি কি ছিল? রাসূল (সা.) কি এক ধর্ষককে ছেড়ে দিয়েছিলেন?

উত্তর: ইসলামে ধর্ষণ (জোরপূর্বক যিনা) একটি মস্ত বড় অপরাধ, যা ‘হারাবা’ (ডাকাতি, সন্ত্রাস) – এর অন্তর্ভুক্ত। হানাফী মতে, ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড যদি সে বিবাহিত হয়, আর যদি অবিবাহিত হয় তাহলে কঠোর তা‘যীর (যার মধ্যে মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে) এবং সাথে নারীকে মোহরানা আদায়

আল-হেদায়া (২/৪২৫): "যে ব্যক্তি জোরপূর্বক কোনো নারীর সাথে যিনা করে, তার শাস্তি হলো, যদি সে বিবাহিত হয় তবে রজম (পাথর নিক্ষেপ), আর যদি অবিবাহিত হয় তবে কঠোর তা‘যীর (যা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত পৌঁছতে পারে) এবং সাথে নারীর মোহরানা আদায়।"

ফতোওয়া আলমগীরী (৩/৪৬৬): "ধর্ষণ ‘হারাবা’ -এর অন্তর্ভুক্ত, তাই ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।"

রাসূল (সা.) ও এক ধর্ষককে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা:

নাস্তিকরা যে হাদীসের উদ্ধৃতি দেয়, তা হলো: মায়ে‘য ইবন মালিক (রাঃ)-এর ঘটনা, যিনি যিনার অপরাধ স্বীকার করলে রাসূল (সা.) প্রথমে তাকে ফিরিয়ে দেন, পরে তিনি আবার এসে স্বীকার করলে রাসূল (সা.) তাকে পাথর মারার আদেশ দেন। তিনি ধর্ষক ছিলেন না, বরং নিজে ইচ্ছায় যিনা করেছিলেন। আরেকটি বর্ণনায় আছে, এক ব্যক্তি এক দাসীর সাথে জোরপূর্বক যিনা করলে রাসূল (সা.) তাকে বেত্রাঘাতের আদেশ দেন এবং দাসীকে মুক্ত করে দেওয়ার নির্দেশ দেন (আবু দাউদ)।

কিন্তু একটি দুর্বল বর্ণনা (মুরসাল) আছে যে, এক ধর্ষক তওবা করলে রাসূল (সা.) তাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। ইমামগণ এই বর্ণনাকে সহীহ মনে করেন না (মিশকাত, তাহকীক শু‘আইব আরনাউত)। আর যদি ধরে নেওয়া হয় যে ঘটনাটি সত্য, তাহলে সেটি ছিল নির্দিষ্ট পরিস্থিতির কারণে, যেমন ধর্ষক অজ্ঞ ছিল অথবা নারীর সাক্ষ্যপ্রমাণ অসম্পূর্ণ ছিল। ইসলামের সাধারণ নীতি হলো, ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা কঠোর শাস্তি।

শারহ মা‘আনিল আসার (৩/২৫৮): "ইমাম আবু হানীফা বলেন, ধর্ষক যদি বিবাহিত হয়, তার জন্য রজম (পাথর নিক্ষেপ)। আর যদি অবিবাহিত হয়, তাহলে তা‘যীর (যা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে)।"

মাআরিফুল কুরআন (সূরা নূরের তাফসির): মুফতি শফী সাহেব বলেন, "ধর্ষণ জঘন্যতম অপরাধ, এবং ইসলামে এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড থেকে কম নয়।"


সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|-------| | ১. বিধান অমান্য করায় বেত্রাঘাত কি জুলুম? | না, তা‘যীর হিসেবে বৈধ। এটি মধ্যমপন্থার পরিপন্থী নয়। | | ২. হিজাব না পড়া ও গান গাওয়ার জন্য শাস্তি? | নিজে করলে গুনাহ, প্রকাশ্যে করলে তা‘যীর হতে পারে। নির্ধারিত হদ্দ নেই। | | ৩. তা‘যীর কি ১০ বেত্রাঘাত? | না, হানাফী মতে তা ৩৯ পর্যন্ত যেতে পারে। ধর্ষণে তা আরও বেশি। | | ৪. ধর্ষণের শাস্তি ও রাসূলের একটি ঘটনা? | ধর্ষণের শাস্তি হানাফী মতে মৃত্যুদণ্ড (বিবাহিত হলে)। রাসূল (সা.) ধর্ষককে সাধারণত শাস্তি দিয়েছেন। ‘ছেড়ে দেওয়া’ বর্ণনাটি দুর্বল ও নির্দিষ্ট অবস্থার জন্য। |

সতর্কতা: বর্তমান সময়ের কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার (যেমন- কোনো আদালতের রায়) সত্যতা যাচাই করা এই ফতোয়ার উদ্দেশ্য নয়।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.