আকিকার দাওয়াতে হাদিয়া (উপহার) আদান প্রদান কি জায়েজ?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 1922
Questioner: Farhana Binte Fakir Ahmed
Question Asked: 22 Jun 2026, 11:11 PM
Reviewed & Published: 22 Jun 2026, 11:17 PM
Views: 102
Tokens: 6,418
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আকিকার দাওয়াতে হাদিয়া নিয়ে যাওয়া কি নিষেধ? যারা আকিকা দিবে তারা কি হাদিয়া গ্রহণ করতে পারবে?
আর নিষেধ হলেও তা কেন? উপকারী কেন এটা আমাদের জন্য একটু বিস্তারিত জানতে চাচ্ছি ইংশা আল্লাহ।

Answer

উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين

প্রশ্ন: আকিকার দাওয়াতে হাদিয়া (উপহার) নিয়ে যাওয়া কি নিষেধ? আর যারা আকিকা দিবে তারা কি হাদিয়া গ্রহণ করতে পারবে? নিষেধ হলে তার কারণ কী? দয়া করে বিস্তারিত জানান।

উত্তর:
আকিকার দাওয়াতে হাদিয়া নিয়ে যাওয়া মূলত নিষেধ নয় বরং জায়েয (পারিবেন)। আকিকা প্রদানকারী ব্যক্তিও এই হাদিয়া গ্রহণ করতে পারেন। তবে কিছু শর্ত ও আদবের প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরি। নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:


১. আকিকা কী?

আকিকা হলো নবজাতকের পক্ষ থেকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের জন্য পশু কুরবানি করা। এটি সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। আকিকার গোশত নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজন ও গরিব-মিসকিনকে খাওয়ানো এবং তাদের দাওয়াত করা মুস্তাহাব। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৮; ফাতাওয়া শামী, ৬/৩২৮)

আকিকার দাওয়াত অন্যান্য দাওয়াতের মতোই। এতে সাধারণত নবজাতকের জন্য দোয়া ও আনন্দ প্রকাশ করা হয়।


২. আকিকার দাওয়াতে হাদিয়া নিয়ে যাওয়ার বিধান

হানাফি ফিকাহর কিতাবে আকিকার দাওয়াতে হাদিয়া নিয়ে যাওয়া নিষেধ বলে কোনো স্পষ্ট দলিল নেই। বরং সাধারণভাবে হাদিয়া দেওয়া উত্তম কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«تهادوا تحابوا»
"তোমরা পরস্পর হাদিয়া দান করো, তাহলে ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।" (মুআত্তা মালিক, হাদিস: ১৪১৪; শুআবুল ঈমান, ৫/৩৩২)

অতএব, আকিকার দাওয়াতে নবজাতক বা তার পরিবারকে হাদিয়া দেওয়া জায়েয। তবে কিছু ক্ষেত্রে তা নিষেধ বা মাকরুহ হতে পারে:

  • শর্তাধীন নিষেধাজ্ঞা:
    • যদি দাওয়াতদাতা শুধু হাদিয়া সংগ্রহের উদ্দেশ্যে দাওয়াত দেন, তাহলে সেখানে হাদিয়া দেওয়া মাকরুহ। কারণ এটি ইখলাসের পরিপন্থী এবং দাওয়াতের আসল উদ্দেশ্য (খুশি ভাগাভাগি ও খানা খাওয়ানো) থেকে বিচ্যুতি।
    • যদি হাদিয়া দেওয়ার ফলে মেজবানের (আকিকাদাতার) মনে কোনো প্রকার বোঝা বা লজ্জার সৃষ্টি হয়, তাহলে সেটিও মাকরুহ।
    • যদি হাদিয়া দেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে গুনাহের কাজে সহায়তা করে (যেমন: হারাম জিনিস উপহার দেওয়া), তাহলে তা নিষেধ।

কিন্তু সাধারণ নিয়মে—যেখানে দাওয়াত খাঁটি, এবং হাদিয়া দেওয়া ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা প্রকাশের জন্য—সেটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং উৎসাহিত।


৩. আকিকাদাতাদের হাদিয়া গ্রহণের বিধান

আকিকাদাতাদের জন্য হাদিয়া গ্রহণ করা জায়েয। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও মানুষের উপহার গ্রহণ করতেন এবং সাহাবাগণও করতেন। তবে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে:

  • নিয়তের বিশুদ্ধতা: হাদিয়া গ্রহণের সময় নিয়ত হতে হবে শুধু সদ্ব্যবহার ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, লোভ বা ধন-সম্পদ সংগ্রহের নয়।
  • কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: হাদিয়া পেলে "জাযাকাল্লাহু খাইরান" বা "বারাকাল্লাহু ফিক" বলে শুকরিয়া আদায় করা সুন্নাহ।
  • হাদিয়া ফেরত দেওয়া: যদি কেউ মনে করে যে হাদিয়া তার জন্য বোঝার কারণ হবে, তাহলে তা ফেরত দেওয়া বা বিনিময়ে কিছু দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে ফেরত দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

একটি নীতিগত কথা: হাদিয়া এমন হওয়া উচিত যাতে পারস্পরিক মমতা বাড়ে এবং কোনো ধরনের প্রতিদানের শর্ত না থাকে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪৩৯; ফাতাওয়া শামী, ৫/২৪৭)


৪. নিষেধাজ্ঞার কারণ কী?

যদি কোনো ক্ষেত্রে আকিকার দাওয়াতে হাদিয়া নিষেধ বলা হয়, তবে তার কারণ হতে পারে:

(ক) কিরা সম্পর্কিত হাদিসের অপব্যাখ্যা:
প্রাচীন আরবে 'কিরা' নামে একটি প্রথা ছিল—যেখানে দাওয়াতে গেলে লোকেরা নিজেরা খাবার নিয়ে যেত। রাসূলুল্লাহ (সা.) এটিকে নিষেধ করেছেন কারণ এটি আত্মপ্রকাশ ও অপচয়ের কারণ ছিল। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৪১০১)
কিন্তু আকিকার দাওয়াতে হাদিয়া নেওয়া 'কিরা'-এর মতো নয়, বরং এটি নবজাতকের জন্য পৃথক উপহার। তাই এই নিষেধাজ্ঞা প্রাসঙ্গিক নয়।

(খ) লোভ-লালসার আশঙ্কা:
যদি দাওয়াতদাতা উপহার সংগ্রহের আশায় দাওয়াত দেন, তাহলে তা নিন্দনীয়। হাদিসে এসেছে:
«شر الطعام طعام الوليمة يدعى إليها الأغنياء ويحرم الفقراء»
"সবচেয়ে নিকৃষ্ট খানা হলো ওলিমার খানা—যেখানে ধনীদের ডাকা হয় আর গরিবদের বঞ্চিত করা হয়।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৩২)
এটি সেই স্থানে প্রযোজ্য যেখানে দাওয়াত উদ্দেশ্যবিহীন হয়।

(গ) রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা):
কেউ যদি লোক দেখানোর জন্য বড় উপহার দেয়, তাহলে তা রিয়া ও গুনাহ হবে। কিন্তু এটি হাদিয়া দেওয়ার বিধান নয়, বরং নিয়তের কলুষতার কারণে।


৫. হানাফি ফিকাহর কিতাব থেকে দলিল

  • ফাতাওয়া শামী (রদ্দুল মুহতার): এতে আকিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আছে। আকিকার দাওয়াত বৈধ এবং তাতে হাদিয়া নেওয়া নিষেধ নয়। বরং 'হাদিয়া' মুবাহ বা মুস্তাহাব। (৬/৩২৮-৩৩০)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): তিনি বলেন—আকিকার দাওয়াতে উপহার দেওয়া জায়েয, তবে বিনিময়ের উদ্দেশ্যে নয়। (৪/২১৮)
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী): এক প্রশ্নের জবাবে তিনি লেখেন—আকিকার দাওয়াতে হাদিয়া নেওয়া ও দেওয়া শরিয়তে নিষেধ নয়; বরং এটি সদাচার ও ইখলাসের সঙ্গে করা উত্তম। (৯/৪৫৩)

৬. উপসংহার

  • আকিকার দাওয়াতে হাদিয়া নিয়ে যাওয়া জায়েয—কোনো সার্বিক নিষেধাজ্ঞা নেই।
  • আকিকাদাতারা হাদিয়া গ্রহণ করতে পারেন—তবে তা বিনয় ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে নেবেন।
  • যদি কোনো নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে নিষেধ থাকে (যেমন: দাওয়াতের অসৎ উদ্দেশ্য, রিয়া, বা প্রতিদানের শর্ত), তাহলে সেটি সীমিত পরিমাণেই প্রযোজ্য।

মূলনীতি হলো: যে কোনো কাজ নিয়ত ও পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। তাই খাঁটি নিয়তে ও আদবের সঙ্গে হাদিয়া দেওয়া-নেয়া আকিকার উৎসবের সৌন্দর্য বাড়ায়, মোটেও নিষেধ নয়।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.