তোমার যা ইচ্ছে করো", "বাপের বাড়ি চলে যাও" ইত্যাদি দ্বারা তালাক পতিত হবে কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার স্বামীর সাথে আমার ঝগড়ার সময় কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে আমার স্বামী বলে,
"তোমার যা ইচ্ছে করো।"
"বাপের বাড়ি চলে যাও।"
"তোমার সাথে থাকা সম্ভব নয়।"
"দরকার হলে কাগজে সাইন করে দিব।"
এর আগেও আমার অতিরিক্ত তর্কের কারণে উনি অনেকবার বলেছেন যে,তোমার যা ইচ্ছে করো।কিন্তু এগুলো সব উনি রাগের মাথায় বলতেন। পরবর্তীতে আমি তালাকে কিনায়া সম্পর্কে জানার পর উনাকে উনার নিয়ত সম্পর্কে জানতে চাইলে,
উনাকে এই কথা জিজ্ঞেস করলে উনি বলে এগুলো দ্বারা কি বোঝাতে চাও,আমি বললাম আপনি শুধু একবার বলেন যে আপনি এগুলো বলার সময় নিয়ত ছিল কি না?
উনি প্রথমে কয়েকবার না বলে। কিন্তু আমি আরো ভালোভাবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বললে
উনি বলে,ধরো ছিল।এটি কয়েকবার বলেছেন।
পরে আমি বললাম কি বলেন এসব?
উনি বলে,তো এখন কি করার?
আমি বলি, তাহলে তো আমাদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ(আল্লাহ না করুক) হয়ে গেছে।
পরে উনাকে তালাকে কিনায়া বোঝানোর পর উনি বলে আল্লাহর কসম আমি তালাকের নিয়তে এগুলো বলি নি। শুধু তোমার কথার পিঠে বলেছি আর রাগে।
এখন এক্ষেত্রে কি আমাদের বিবাহে কোনো সমস্যা হবে কিংবা করণীয়?
হুজুর,দয়া করে একটু বুঝিয়ে বিস্তারিত এবং নিশ্চিত করে বলবেন!
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
উত্তর
প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতি ও স্বামীর বক্তব্যের ভিত্তিতে আমরা নিচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও ফতোয়া পেশ করছি।
প্রথমত: তালাকের কিনায়া কী?
তালাকের কিনায়া হলো সেই সব শব্দ যা স্পষ্ট তালাকের জন্য ব্যবহৃত হয় না, কিন্তু প্রসঙ্গ ও নিয়তের ভিত্তিতে তালাক পতিত হতে পারে। যেমন: “তুমি বাপের বাড়ি চলে যাও”, “তোমার সাথে থাকা সম্ভব নয়”, “তোমার যা ইচ্ছে করো” ইত্যাদি।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
- কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার জন্য স্বামীর তালাকের নিয়ত অপরিহার্য।
- যদি স্বামী তালাকের নিয়ত না করে, তবে তালাক পতিত হবে না।
- তবে যদি স্বামী আদালতে বা স্ত্রীর সামনে স্বীকার করে যে, “আমি তালাকের নিয়তেই বলেছিলাম”, তাহলে তালাক পতিত হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৫২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭১)
দ্বিতীয়ত: আপনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ
আপনার স্বামী বলেছেন:
- “তোমার যা ইচ্ছে করো।”
- “বাপের বাড়ি চলে যাও।”
- “তোমার সাথে থাকা সম্ভব নয়।”
- “দরকার হলে কাগজে সাইন করে দিব।”
এগুলো সবই কিনায়া শব্দ। তবে তালাক পতিত হওয়ার জন্য স্বামীর নিয়ত জরুরি।
আপনার বিবরণ অনুযায়ী:
- স্বামী প্রথমে “না” বললেও পরে “ধরো, ছিল” বলেছেন।
- কিন্তু পরে তিনি স্পষ্টভাবে এবং আল্লাহর কসম দিয়ে বলেছেন যে, তিনি তালাকের নিয়তে বলেননি, বরং রাগ ও কথার পিঠে বলেছেন।
হানাফি ফিকহের আলোকে সিদ্ধান্ত:
- যেহেতু স্বামী পরে স্পষ্টভাবে তালাকের নিয়ত অস্বীকার করেছেন এবং কসম খেয়েছেন, তাই কোনো তালাক পতিত হয়নি।
- “ধরো ছিল” বলা একটি অস্পষ্ট বক্তব্য। এটি তালাকের পক্ষে স্পষ্ট স্বীকারোক্তি নয়। আর নিয়তের ব্যাপারে স্বামীর কথাই গ্রহণযোগ্য, বিশেষ করে যখন তিনি কসম খাচ্ছেন।
(ফাতাওয়া উসমানি, ১/৪৫২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩৪০)
তৃতীয়ত: করণীয়
- তালাক পতিত হয়নি, তাই আপনাদের বিবাহ বহাল আছে।
- কোনো ধরনের বিচ্ছেদ বা ইদ্দত পালনের প্রয়োজন নেই।
- স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত রাগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং ভবিষ্যতে এমন বাক্য ব্যবহার থেকে বিরত থাকা।
- যদি এখনও কোনো সন্দেহ থাকে, তবে নিজের এলাকার একজন বিশ্বস্ত আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।
চূড়ান্ত ফতোয়া
উল্লিখিত বাক্যগুলোর মাধ্যমে আপনার বিবাহে কোনো সমস্যা হয়নি। আপনার স্বামী যেহেতু তালাকের নিয়ত অস্বীকার করেছেন এবং কসম খেয়েছেন, তাই তালাক পতিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের দাম্পত্য জীবনে শান্তি দান করুন। আমিন।
সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ফাতাওয়া উসমানি, ইমদাদুল ফাতাওয়া, আল-হিদায়া
والله أعلم بالصواب