ভালো মানুষ কি ভালো জীবনসঙ্গী পায় না?, বিয়ের জন্য পাত্রপাত্রী খোঁজার সঠিক নিয়ম কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রথমেই বুঝে নেওয়া জরুরি যে, আপনার বড় বোনের বক্তব্য পুরোপুরি সঠিক নয়। কুরআনের আয়াত ও হাদিসের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কার করে বলা যাচ্ছে।
১. কুরআনের আয়াত ও তার সঠিক তাফসির
আপনার বোন যে আয়াতের কথা বলেছেন, তা সম্ভবত সূরা নূর (২৪:২৬) :
"الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ ۖ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ"
অর্থ: “নোংরা নারী নোংরা পুরুষের জন্য, আর নোংরা পুরুষ নোংরা নারীর জন্য; আর পবিত্র নারী পবিত্র পুরুষের জন্য, আর পবিত্র পুরুষ পবিত্র নারীর জন্য।”
তাফসির:
এই আয়াতের মূল বক্তব্য হলো—চারিত্রিক ও ঈমানী দিক থেকে নোংরা (খারাপ) মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা খারাপ মানুষের দিকে, আর পবিত্র ও ভালো মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা ভালো মানুষের দিকে হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, একজন ভালো মানুষ কখনো খারাপ জীবনসঙ্গী পেতে পারে না; বরং কেউ যদি নেককার হয়, তবে আল্লাহ তাকে নেককার জীবনসঙ্গী দান করেন—অথবা বিপরীত পরিস্থিতি এসে যদি তাকে পরীক্ষা করেন, সেটিও সম্ভব।
মুফাসসিরদের ব্যাখ্যা:
- ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন: “এই আয়াতটি মূলত মিথ্যা অপবাদ থেকে নবীজী (সা.) ও আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা প্রমাণের জন্য নাযিল হয়।” (তাফসিরে কুরতুবী)
- ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন: “ভালো মানুষ সাধারণত ভালো মানুষের সঙ্গ পছন্দ করে, আর মন্দ মানুষ মন্দ মানুষের। এটি স্বভাবগত বিষয়।”
সুতরাং, আয়াতটি কখনোই বলছে না যে, ভালো মানুষ ভালো জীবনসঙ্গী পাবে না; বরং বলছে—ভালো মানুষের জন্য উপযুক্ত হলো ভালো মানুষ, আর মন্দ মানুষের জন্য মন্দ। কিন্তু দুনিয়াতে কখনো কখনো ভালো মানুষকে মন্দ জীবনসঙ্গী দিয়ে পরীক্ষা করাও আল্লাহর পক্ষ থেকে হতে পারে।
২. সূরা ফুরকান (২৫:৭৪)-এর দোয়া
আল্লাহ বলেন:
"رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا"
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদেরকে এমন স্ত্রী-পতি ও সন্তান দান করুন যারা আমাদের চোখের শীতলতা (সুখ-শান্তি) হবে, আর আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন।”
এই দোয়া শেখানোর মাধ্যমেই আল্লাহ বুঝিয়েছেন যে, ভালো জীবনসঙ্গী কামনা করা এবং তার জন্য দোয়া করা অত্যন্ত কাম্য ও প্রশংসনীয়। যদি ভালো মানুষ ভালো পেতেই না, তাহলে এই দোয়া শেখানোর কোনো অর্থ হয় না। বরং এই দোয়া শিক্ষা দেওয়ার অর্থ হলো—তোমরা চাও, আর আমি দিই। তবে সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাধীন।
৩. হাদিসের আলোকে ভালো জীবনসঙ্গী পাওয়ার উপায়
নবী করীম (সা.) বলেছেন:
"তোমরা চারটি বিষয়ের জন্য বিয়ে করো: সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য ও দ্বীন। তুমি দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার দাও, তাহলে তুমি সফল হবে।" (বুখারী ও মুসলিম)
অর্থাৎ, ভালো জীবনসঙ্গী পাওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো দ্বীন (ধার্মিকতা) ও চারিত্রিক পবিত্রতা। সুতরাং, আপনি যদি নিজে নেককার হন এবং দ্বীনদার জীবনসঙ্গী চান, তাহলে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকুন, আল্লাহ অবশ্যই আপনার জন্য ভালো ব্যবস্থা করবেন—যদি বর্তমানে না পান, তবে ভবিষ্যতে কোনো না কোনোভাবে ভালোই পাবেন।
৪. বিয়ে কি অসুখী রাখে?
বিয়ে করা মানেই সবসময় দুঃখ পাওয়া—এ ধারণা সম্পূর্ণ ইসলামবিরোধী। ইসলামে বিয়েকে শান্তির নিদর্শন (সূরা রূম, ৩০:২১) বলা হয়েছে। তবে দুনিয়ার কোনো কাজই সম্পূর্ণ সুখময় নয়; এখানে পরীক্ষা ও কষ্ট থাকবেই। হাদিসে এসেছে:
“দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা আর কাফিরের জন্য জান্নাত।” (মুসলিম)
অর্থাৎ, দুনিয়ায় পূর্ণ সুখ পাওয়া যাবে না, তবে দ্বীনদার জীবনসঙ্গী পেলে ইহকাল ও পরকালের জন্য তা বড় নিয়ামত। আপনি যদি আল্লাহর কাছে ভালো জীবনসঙ্গী চান এবং নিজে ভালো হওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না।
উপসংহার
- আপনার বোনের বক্তব্য ভুল বোঝার ওপর ভিত্তি করে। কুরআনের আয়াত বলছে ভালো ভালোর উপযুক্ত, মন্দ মন্দের উপযুক্ত—কিন্তু এটি বাস্তবে ঘটে না এমন নয়।
- ভালো জীবনসঙ্গী চাওয়া এবং তার জন্য সূরা ফুরকানের দোয়া পড়া অত্যন্ত উত্তম।
- বিয়ে সুখের মাধ্যম, তবে দুনিয়ায় পূর্ণ সুখ কখনোই সম্ভব নয়—এটাই ইসলামী বিশ্বাস।
- প্রস্তাবনা: নিজে দ্বীনের ওপর থাকুন, বেশি করে দোয়া করুন, এবং উক্ত বোনের ভুল ধারণা ত্যাগ করে কুরআনের সঠিক তাফসির পড়ুন বা আলেমদের কাছ থেকে জেনে নিন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন। (আমীন)
সূত্র
- তাফসিরে ইবনে কাসীর (সূরা নূরের তাফসির)
- তাফসিরে কুরতুবী
- বেহেশতি জেওর (বিয়ের অংশ)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী)