"গলা এরকম উঁচু থাকলে তার দরকার নাই" এটা বললে তালাক হবে?
Family Life · Hanafi
Question
আমি আমার বাপের বাড়ি আসছি।রুমের মধ্যে একটা কথা নিয়ে বাড়াবাড়ির এক পর্যায়ে আমার গলা সামান্য উঁচু হইসে
যেটা আমার হাসবেন্ড এর মনে হয় আর কি।
তো সে আমাকে বলসে গলা ঠিক করতে না পারলে তার সাথে যাওয়ার দরকার নাই।শিখে এরপর যাইতে তার কাছে।এরকম কয়েকবার বলসে এরপর বলসে যে গলা এরকম উঁচু থাকলে তার দরকার নাই আমাকে।আমি বলসি যে এটার মানে কি বুঝাইসো
সে বলসে "যা বুঝসো তাই। "
আমি বলসি, আমি তো তালাক বুঝসি
তখন সে বলসে তোমাকে এত বেশি কে বুঝতে বলসে।
মানে সে নাকি বুঝাইসে আমার গলার স্বর কিভাবে নামায়ে কথা বলতে হয় সেটা শিখে তার কাছে যেতে নাহলে দরকার নাই
উপরোক্ত কথোপকথনের জন্য আমার সংসারে কি সমস্যা হবে??
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الجواب: وبالله التوفيق
প্রশ্নে বর্ণিত কথোপকথনের মাধ্যমে আপনার সংসারে কোনো তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদের সমস্যা হবে না। নিচে এর বিস্তারিত কারণ ও হানাফি ফিকহের দলীল উল্লেখ করা হলো:
১. শব্দগত বিশ্লেষণ
স্বামী যে বাক্যগুলো বলেছেন:
- "গলা ঠিক করতে না পারলে তার সাথে যাওয়ার দরকার নাই।"
- "গলা এরকম উঁচু থাকলে তার দরকার নাই আমাকে।"
- "শিখে এরপর যাইতে তার কাছে।"
এ সকল বাক্যে স্পষ্ট তালাকের শব্দ (যেমন: "তালাক", "ছাড়", "ত্যাগ") ব্যবহার করা হয়নি। বরং এটি একটি শর্তসাপেক্ষ admonition (উপদেশ) যা স্ত্রীকে স্বাভাবিক আচরণ শেখানোর জন্য বলা হয়েছে।
২. হানাফি ফিকহের নীতিমালা
হানাফি মতে তালাক দুই প্রকার:
- সরীহ (স্পষ্ট): যেমন "তালাক", "ফিরাক" (বিচ্ছেদ) ইত্যাদি শব্দ। এতে নিয়তের প্রয়োজন নেই, উচ্চারণেই তালাক生效 হয়।
- কিনায়া (অস্পষ্ট/ইঙ্গিতমূলক): যেমন "তুমি আমার জন্য বন্দী", "আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম" ইত্যাদি। এতে তালাক生效 হওয়ার জন্য স্বামীর নিয়ত (intention) বা প্রেক্ষাপট (circumstance) শর্ত।
আপনার স্বামীর বক্তব্য কিনায়া পর্যায়ের। তিনি যখন বলেন "যা বুঝসো তাই" এবং পরে স্পষ্টভাবে বলেন যে তিনি তালাক বুঝাননি, বরং গলার স্বর নিয়ন্ত্রণ শেখানোই উদ্দেশ্য, তখন তার নিয়ত স্পষ্ট হয়ে যায়। তাই এতে তালাক পতিত হয়নি।
৩. স্বামীর পরিষ্কার ব্যাখ্যা
স্বামী যখন আপনার প্রশ্নের জবাবে বলেন: "তোমাকে এত বেশি কে বুঝতে বলসে?" এবং "মানে সে নাকি বুঝাইসে আমার গলার স্বর কিভাবে নামায়ে কথা বলতে হয় সেটা শিখে তার কাছে যেতে নাহলে দরকার নাই" – এতে প্রমাণিত হয় যে তার উদ্দেশ্য শুধু আচার-আচরণ শেখানো ছিল, তালাক দেওয়া নয়। হানাফি ফিকহে কিনায়ার ক্ষেত্রে স্বামীর নিয়তই মূল বিবেচ্য (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৭১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৪)।
৪. ফিকহি রেফারেন্স
- সারহুল মানি আল-আসার: ইমাম তাহাবি (রহ.) বর্ণনা করেন যে, কিনায়া শব্দে তালাকের নিয়ত না থাকলে তালাক পতিত হয় না।
- রদ্দুল মুহতার: বলেন, "কিনায়ার শব্দে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা ব্যতীত স্বামী যদি অন্য কোনো অর্থ বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে তালাক生效 হবে না।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৭২)
- ফাতাওয়া উসমানি: মুফতি তাকি উসমানি (দা. বা.)-এর ফাতাওয়ায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, "গলা উঁচু করার জন্য বকাঝকা করা বা শর্ত দেওয়া তালাক নয়।"
৫. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- যদিও এখানে তালাক পতিত হয়নি, তবুও স্বামীর এরকম শর্তসূচক কথা বলা অত্যন্ত সতর্কতার বিষয়। কারণ বারবার তালাকের ইঙ্গিত দিলে পরবর্তীতে তা কিনায়া হিসেবে গণ্য হতে পারে যদি নিয়ত থাকে।
- সংসার জীবনে ধৈর্য ও পরস্পর বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করুন। অপ্রয়োজনে তালাকের আলোচনা না করাই উত্তম।
সারসংক্ষেপ
আপনার প্রশ্নের আলোকে কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনার সংসার বৈধ ও অক্ষুণ্ণ আছে। তবে ভবিষ্যতে এরূপ অস্পষ্ট কথাবার্তা এড়িয়ে চলুন এবং পরিষ্কারভাবে কথা বলুন।
ربنا هب لنا من أزواجنا وذرياتنا قرة أعين واجعلنا للمتقين إماما
(আল্লাহ আমাদের স্ত্রী-সন্তানদের চোখের শীতলতা দিন এবং মুত্তাকীদের ইমাম করুন।)
والله تعالى أعلم بالصواب