দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক না থাকলে ইদ্দতের বিধান কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
কারো ডিভোর্সের পর সে যদি আবার বিয়ে করতে চায় তাহলে তো ইদ্দত পালনের পর সে বিয়ে করতে পারবে তাই না? কিন্তু যার কথা বলছি সে বলে কি তার স্বামীর সাথে তো তার অনেক দিনের সম্পর্ক নেই তাই নাকি ইদ্দত পালন না করলেও হবে। এটা কতটুকু সঠিক? তাকে এব্যাপারে কিভাবে বুঝানো যেতে পারে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। তালাক পরবর্তী ইদ্দত পালন করা শরীয়তের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান। আপনি যে বিষয়টি নিয়ে জানতে চেয়েছেন, তা হলো— দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক না থাকার কারণে কি ইদ্দত পালনের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায়?
উত্তরটি হলো: এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল ও শরীয়তসম্মত নয়।
নিচে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও দলিল পেশ করা হলো:
ইদ্দত কেন ফরজ?
ইদ্দতের বিধান কুরআন, হাদিস এবং ইসলামী আইন দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। ইদ্দতের উদ্দেশ্য ও হিকমত (কারণ) নিম্নরূপ: ১. গর্ভ স্পষ্ট করা: এটি মূল উদ্দেশ্য। তালাকের পর নারীর গর্ভে সন্তান আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া, যাতে বংশ মিশ্রিত না হয়। এমনকি যদি দীর্ঘদিন সহবাস না-ও হয়ে থাকে, তবুও সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না (যেমন: স্বপ্নদোষ, বা ভুলে অথবা কোনো বাধ্যবাধকতার কারণে সন্তান হতে পারে)। ২. ইবাদত ও আল্লাহর আদেশ পালন: ইদ্দত পালন করা একটি ইবাদত। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইদ্দতের নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করেছেন। শুধু সম্পর্ক না থাকার কারণে এই ইবাদত পরিত্যাগ করার অনুমতি নেই। ৩. স্বামীর জন্য চিন্তার সময়: ইদ্দতের সময় স্বামী চাইলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার (রজু) সুযোগ পায়। দীর্ঘদিন সম্পর্ক না থাকলেও তালাকের পরে এই সুযোগটি আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন।
দলিল (প্রমাণ):
(ক) কুরআনের আয়াত: আল্লাহ তাআলা সূরা আল-বাকারায় বলেন: وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ... অর্থ: "আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা নিজেদেরকে তিন কুরূ (হায়েয বা পবিত্রতা) পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২২৮)
এই আয়াতটি সাধারণ। অর্থাৎ, তালাকপ্রাপ্তা প্রতিটি নারীর জন্যই এই বিধান। এখানে স্বামীর সাথে সম্পর্ক ছিল কি না, কতদিন সম্পর্ক ছিল, তা শর্ত নয়।
(খ) হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ، إِلَّا عَلَى زَوْجٍ، فَإِنَّهَا تُحِدُّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا অর্থ: "যে নারী আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, তার জন্য কোনো মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশি শোক (ইদ্দত) পালন করা জায়েয নয়; কিন্তু স্বামীর জন্য (তালাক বা মৃত্যুর পর) চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করবে।" (সহীহ বুখারী, হাদিস: ১২৮০; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৮৬)
এখানে 'স্বামীর জন্য ইদ্দত' বলতে শুধু মৃত্যু নয়, বরং তালাকের পরও ইদ্দত পালন বাধ্যতামূলক। এবং এই ইদ্দতের সময়সীমা স্বামীর সাথে সম্পর্কের দৈর্ঘ্যের ভিত্তিতে পরিবর্তিত হয় না।
(গ) হানাফি ফিকহের কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য ইদ্দত পালন করা ফরজ (ওয়াজিব)। কোনো অবস্থাতেই এটি পরিত্যাগ করা জায়েজ নয়। এমনকি যদি স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে স্পর্শ (একান্ত সাক্ষাৎ) কখনো না-ও হয়ে থাকে, তবুও ইদ্দত পালন করা আবশ্যক। (রদ্দুল মুহতার, তালাক অধ্যায়)
- ফাতাওয়া আলমগীরী (হিন্দীয়া): এতে উল্লেখ আছে যে, যখন কোনো মহিলার তালাক হয়ে যায়, তখন তার জন্য ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব। ইদ্দতের মধ্যে তাকে বিয়ে করা, বাগদান করা, অথবা সাজসজ্জা করা নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞা তখনই কার্যকর হয় না যদি ইদ্দত পালনের প্রয়োজন না থাকে। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৫২৭)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): এতে বলা হয়েছে, 'ইদ্দত হলো নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করা... এটি একটি শরয়ী বিধান, যা মেয়েলোকের জন্য আবশ্যক।' (ইমদাদুল ফাতাওয়া, বিবাহ ও তালাক অধ্যায়)
তাহলে কিভাবে বুঝাবেন?
যে মহিলা দীর্ঘদিন সম্পর্ক না থাকার অজুহাতে ইদ্দত পালন করতে অস্বীকার করছেন, তাকে আপনি সহজভাবে নিম্নলিখিত উপায়ে বোঝাতে পারেন:
১. কুরআন ও হাদিসের সরাসরি কথা বলুন: তাকে বলুন, "আপনি কুরআনের আয়াত বা হাদিসে ইদ্দতের কোনো শর্ত দেখেছেন কি? আল্লাহ বলেছেন 'তালাকপ্রাপ্তা নারীরা', তিনি বলেননি 'যাদের স্বামীর সাথে সম্পর্ক আছে'। আল্লাহ যা বলেছেন, তা মেনে চলা আমাদের ঈমানের দাবি।"
২. উদাহরণ দিন: তাকে বলুন, "ধরুন, একজন জজ রায় দিচ্ছেন— 'যে ব্যক্তি বেআইনি কাজ করেছে, তাকে শাস্তি দিতে হবে।' এখন যদি সেই ব্যক্তি বলে, 'আমি তো অনেকদিন আগে কাজটা করেছিলাম, তাই শাস্তি দরকার নেই', তাহলে কি জজ তা মেনে নেবেন? না। তদ্রূপ, তালাকের পর ইদ্দত পালন করা আবশ্যক, তা কতদিন আগে সম্পর্ক শেষ হয়েছে তার উপর নির্ভর করে না।"
৩. ইসলামী বুদ্ধিমত্তা: তাকে বোঝান যে একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের কাজ হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশ মান্য করা। আমাদের বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে শরীয়তের বিধান পরিবর্তন করার অধিকার নেই। ইদ্দত না করে বিয়ে করলে সেই বিয়ে হারাম ও গুনাহর কাজ হবে এবং সে বিয়ে পরবর্তীতে বাতিলও হতে পারে।
৪. পরিণতি: তাকে জানান যে, ইদ্দত না পালন করে বিয়ে করলে তা স্পষ্ট গুনাহ। তাছাড়া, নতুন বিয়েতে যদি সন্তান হয়, তাহলে বংশ নিয়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই ধরনের অনিয়মের কারণে সমাজে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
উপসংহার:
ইদ্দত পালন করা ফরজ। কোনো অবস্থাতেই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক দীর্ঘদিন না থাকার কারণে ইদ্দতের বিধান বাতিল হয় না। বরং, ইদ্দতের সময়কাল নির্ধারিত থাকে তালাকের তারিখ থেকে, সম্পর্ক শেষ হওয়ার তারিখ থেকে নয়। যদি তিনি দীর্ঘদিন আলাদা থাকেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিক তালাক এখনো না দিয়ে থাকেন, তাহলে এখন তালাক দিলে তালাকের দিন থেকে ইদ্দত গণনা হবে। আর যদি আগেই তালাক দিয়ে থাকেন, তাহলে ইদ্দত পালন করা বাধ্যতামূলক।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথ বুঝার ও পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর: দীর্ঘদিন সম্পর্ক না থাকার কারণে ইদ্দত পালন না করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। ইদ্দত যে কোনো তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য ফরজ। এটি আল্লাহর আদেশ, যা মান্য করা ওয়াজিব।