কনে পরিবারের সম্মতি ছাড়া বিয়ে প্রসঙ্গে
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আর বিয়ের ক্ষেত্রে কি কি ফরজ এটা বিস্তারিত জানতে চাই॥
Answer
উত্তর: কনে পরিবারের সম্মতি ছাড়া বিয়ে ও বিয়ের ফরজ বিষয়সমূহ
প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত: (১) কনে পরিবারের সম্মতি ছাড়া বিয়ে করতে পারবে কিনা; (২) বিয়ের ক্ষেত্রে কী কী ফরজ (অবশ্যকীয়) তা জানতে চাওয়া হয়েছে। নিচে হানাফি মাজহাবের কিতাব ও ফতোয়ার আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. কনে পরিবারের সম্মতি ছাড়া বিয়ে
হানাফি মতে মূলনীতি
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের স্বাধীন নারী নিজে নিজে বিয়ে করার অধিকার রাখেন। তার জন্য অভিভাবকের (ওয়ালি) অনুমতি বিয়ের শুদ্ধতার শর্ত নয়; বরং বিয়ের দলিল (ইজাব-কবুল) এবং সাক্ষী থাকলেই বিয়ে শুদ্ধ হবে। তবে অভিভাবকের অনুমতি নেওয়া উত্তম ও পছন্দনীয়।
এ প্রসঙ্গে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন:
«لا نكاح إلا بولي» قوله تعالى: فَانْكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ (النساء: 25)
“অভিভাবক ছাড়া বিয়ে নেই” – এই হাদিসটির ব্যাখ্যায় ইমাম আবু হানিফা বলেন, আয়াত ‘তাদের পরিবারের অনুমতি নিয়ে তাদের বিয়ে করো’ (সূরা নিসা: ২৫) এখানে ‘অভিভাবক’ নয় বরং ‘পরিবারের অনুমতি’ অর্থে এসেছে। নারী নিজেও এই অনুমতি প্রদান করতে পারেন। (শরহু মা‘আনি’ল আসার, ইমাম তাহাবি)।
শর্ত ও সতর্কতা
- স্বাধীন নারী বিয়ে দিতে সক্ষম; ক্রীতদাসীর বেলায় অভিভাবক প্রয়োজন।
- যদি নারী অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অক্ষম হন, তবে অভিভাবক জরুরি।
- সম কুফু (কুলীনতা) : যদি নারী নিজের সমকক্ষ না এমন পুরুষকে বিয়ে করেন এবং অভিভাবক আপত্তি করেন, তাহলে অভিভাবক বিয়ে ফাসাদ (বাতিল) করার জন্য আদালতে আবেদন করতে পারেন। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মতে এই ক্ষেত্রে অভিভাবকের আপত্তি গ্রহণযোগ্য। (রাদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬)
- মাকরুহ তানজিহি : অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা মাকরুহ বা অনুত্তম, কেননা এতে পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। (ফতোয়া উসমানি, ২/২৪)
ফতোয়া ও রেফারেন্স
-
ফতোয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): “হানাফি মাজহাবে প্রাপ্তবয়স্ক নারী তার ইচ্ছায় বিয়ে করতে পারেন। তবে এটা উত্তম নয় যে তিনি অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করবেন। অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত বিয়ে করলে তা শুদ্ধ হলেও উত্তম পন্থা নয়। যদি অভিভাবক বৈধ কারণ ছাড়া বাধা দেন, তাহলে নারী কাযীর (বিচারকের) সাহায্য নিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করতে পারেন।” (ফতোয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ২৪)
-
ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভি): “নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করা নারীর জন্য জায়েয, তবে অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া করলে মাকরুহ।” (ইমদাদুল ফতোয়া, ২/৩৪)
-
বাহেশতি জেওর: “প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করতে পারে, কিন্তু মা-বাবার অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা ভালো নয়।” (বাহেশতি জেওর, বিয়ের অধ্যায়)
সারসংক্ষেপ
কনে পরিবারের সম্মতি ছাড়া বিয়ে করতে পারবেন – হানাফি মতে এটি জায়েয, তবে অভিভাবকের অনুমতি নেওয়া সুন্নত ও অধিক নিরাপদ। যদি অভিভাবক অযৌক্তিকভাবে বাধা দেন, তবে নারী নিজে বা আদালতের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করতে পারেন। তবে বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারিবারিক সমর্থন জরুরি, তাই পরিবারের সাথে আলোচনা করে বিয়ে করাই ভালো।
২. বিয়ের ক্ষেত্রে ফরজ (অবশ্যকীয়) বিষয়সমূহ
হানাফি মাজহাবে বিয়ের ফরজ (শুদ্ধতার জন্য আবশ্যক) তিনটি:
১. ইজাব ও কবুল (পেশ করা ও গ্রহণ করা)
বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ একত্রে একই মজলিসে স্পষ্ট শব্দে হতে হবে। যেমন:
- ইজাব: “আমি আপনাকে বিয়ে করলাম” (زوّجتُك)
- কবুল: “আমি গ্রহণ করলাম” (قبلتُ)
এটা আরবিতে বা অন্য যে কোনো ভাষায় হতে পারে, যার দ্বারা বিয়ের উদ্দেশ্য স্পষ্ট বোঝা যায়। (আল-হিদায়া, ১/১৯২)
২. সাক্ষী (গোপন বিয়ে নয়)
বিয়ের জন্য দুই জন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুই জন নারী মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের সাক্ষী থাকা জরুরি। সাক্ষীদের বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ শুনতে ও বুঝতে হবে। (ফতোয়া আলমগিরি, ১/৮০)
দলিল:
عن عائشة رضي الله عنها قالت: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «لا نكاح إلا بولي وشاهدي عدل» (رواه ابن حبان)
“বিয়ে বৈধ নয় অভিভাবক ও ন্যায়পরায়ণ দুই সাক্ষী ছাড়া।” (ইবনে হিব্বান)
৩. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বৈধতা ও সম্মতি
- বর ও কনে উভয়ই মুসলিম (কাফিরের সাথে মুসলিম নারীর বিয়ে হারাম)।
- বিয়ে ইচ্ছাকৃত ও সম্মতির ভিত্তিতে হতে হবে। জোরপূর্বক বিয়ে শুদ্ধ নয়। নারী অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন। (রাদ্দুল মুহতার, ৩/৪২)
ফরজের পাশাপাশি ওয়াজিব বিষয়
(যা বিয়ের জন্য শর্ত হলেও ফরজের স্তরে না)
- মাহর (যৌতুক) : বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীকে নির্ধারিত মাহর দিতে বাধ্য। মাহর নির্ধারণ ওয়াজিব। (মা‘আরিফুল কুরআন, সূরা নিসা: ৪)
- ওয়ালি (অভিভাবক) : হানাফি মতে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর জন্য ওয়ালি ফরজ নয়, তবে মুস্তাহাব। অপ্রাপ্তবয়স্কের জন্য ওয়ালি ফরজ।
বিয়ের ফরজ সম্পর্কে কিতাবের উদ্ধৃতি
- ফতোয়া আলমগিরি: “নিকাহের রুকন তিনটি: ইজাব-কবুল, সাক্ষী, এবং দুই পক্ষের বৈধতা।” (ফতোয়া আলমগিরি, ১/৭)
- শরহু মা‘আনিল আসার (ইমাম তাহাবি): “আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে সে যেন বিয়ে করে।’ (সূরা নূর: ৩২) বিয়ের জন্য ইজাব-কবুল ও সাক্ষী আবশ্যক।”
- উসুলুশ শাশি: “নিকাহ ইজাব-কবুল ও সাক্ষী দ্বারা সম্পন্ন হয়।” (উসুলুশ শাশি, নিকাহ অধ্যায়)
বিয়ের শুদ্ধতার জন্য অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
- পাত্র-পাত্রী উভয়ই বিয়ের বাধা (যেমন: বংশ, দুধ সম্পর্ক, একই লিঙ্গ ইত্যাদি) মুক্ত হতে হবে।
- দলিল লিখে রাখা সুন্নত।
উপসংহার
১. কনে পরিবারের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করতে পারবেন – হানাফি মতে জায়েয, তবে উত্তম নয়।
২. বিয়ের ফরজ: ইজাব-কবুল, দুজন সাক্ষী, এবং পক্ষদ্বয়ের বৈধতা ও সম্মতি। মাহর ও ওয়ালি ফরজ নয়, কিন্তু ওয়াজিব বা মুস্তাহাব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক বিবাহের নির্দেশনা পালনের তৌফিক দিন। (আমিন)