বিবাহিত মেয়ের পুনরায় পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার পর তার এবং তার সন্তানের সাথে ব্যবহার কেমন হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
উস্তায একটা বিষয় জানার ছিল,
আমার রক্তের সম্পর্কীয় এক আত্মীয় ব্যভিচারে লিপ্ত, সে বর্তমানে গর্ভবতী। ব্যবিচারের শাস্তি তো আমাদের দেশে নেই,তাই শরিয়া অনুযায়ী তার সাথে, তার সন্তানের সাথে আমাদের ব্যবহার কেমন হওয়া উচিত?
তার হিস্ট্রি হচ্ছে তাকে পারিবারিক ভাবে এক জায়গায় বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সে তার পছন্দের ছেলের সাথে পালিয়ে বিয়ে করে।কোনো ইদ্দত পালন করে নি,তার হাসবেন্ড কে সে ডিভোর্স দিয়েছে কিন্তু হাসবেন্ড দিয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই।হাসবেন্ড ও পরবর্তীতে বিয়ে করে নিয়েছে। ifaatwa তে জেনে আমি তাকে জানিয়ে ছিলাম যে তাদের বিয়েটা হয় নি,সে এখনো যিনায় লিপ্ত। সে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে তার সাথে আমার যোগাযোগ বন্ধ ছিল।প্র্যাগ্নেন্ট হওয়ার পর সে নিজেই আমাকে মেসেজ দিয়ে তার অনাগত সন্তানের ব্যাপারে জানায়।সেদিন আমি তার সাথে ভালোভাবেই কথা বলেছি।পরবর্তীতে তাকে তার বিয়ের সহিহ না হওয়া নিয়ে বিস্তারিত লিখে জানাই।শেষে তাকে এটা বলে দিই যতদিন না সে এই হারাম সম্পর্ক থেকে বের না হয় ততদিন যেন আমার সাথে যোগাযোগ না করে।সে পালটা রিপ্লাই করে তারা হুজুরের থেকে জেনেই বিয়ে করেছে।
এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে তার সাথে আমার ব্যবহার কেমন হবে? যোগাযোগ বন্ধ রাখবো, নাকি যোগাযোগ ঠিক রাখবো?তার বাচ্চার সাথে আমার ব্যবহার কেমন হবে? অন্য বাচ্চাদের মতো?
তাকে এই হারাম থেকে বের করে আনতে আমার করনীয় কী?
Answer
উত্তরঃ
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার আত্মীয়া যে জিনার (ব্যভিচারের) মতো জঘন্য পাপে লিপ্ত হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। শরীয়তের দৃষ্টিতে জিনা কবিরা গুনাহ এবং এর জন্য দুনিয়ায় শারীরিক শাস্তি (হদ্দ) থাকলেও আমাদের দেশে তা কার্যকর না হওয়ায় এর অর্থ এই নয় যে বিষয়টি হালকা। তাকে বোঝানো উচিত যে আল্লাহর কাছে তওবা করা ফরজ।
১. তার সাথে আপনার ব্যবহার কেমন হবে?
- প্রথমত, আপনার কর্তব্য হলো তাকে নরম ভাষায় বারবার উপদেশ দেওয়া, আল্লাহর শাস্তির ভয় দেখানো এবং তওবা করতে উৎসাহিত করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তুমি উপদেশ দাও, নিশ্চয় উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসে।” (সূরা আয-যারিয়াত: ৫৫)
- তবে যদি আপনার সাথে যোগাযোগ রাখার কারণে সে তার পাপকে স্বাভাবিক মনে করে অথবা আপনি তার পাপের সমর্থক হিসেবে বিবেচিত হন, তাহলে কিছু সময়ের জন্য যোগাযোগ বন্ধ রাখা (হাজর) জায়েয আছে। কিন্তু এটি চূড়ান্ত বিচ্ছেদ নয়, বরং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
- হানাফি ফিকাহ অনুযায়ী, কাছের আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা (সিলাতুর রাহিম তরক করা) হারাম, তবে পাপ কাজে সহযোগিতা না করার জন্য ন্যূনতম সম্পর্ক (যেমন প্রয়োজনীয় কথা বলা) বজায় রাখা যাবে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১৬)
- আপনি যদি মনে করেন যে আপনার উপদেশ তার জন্য কার্যকর হবে, তাহলে যোগাযোগ রাখা এবং দাওয়াত দেওয়া চালিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু যদি দেখেন যে আপনার কথায় তার কোনো প্রভাব পড়ছে না এবং সে বরং গর্ব করে বলছে ‘হুজুর থেকে জেনেই বিয়ে করেছি’, তবে তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিন যে এই বিয়ে শরীয়তসম্মত নয় (কারণ ইদ্দত পালন না করা, প্রথম বিবাহের বৈধ বিচ্ছেদ না হওয়া ইত্যাদি)।
২. তার সন্তানের সাথে আপনার ব্যবহার কেমন হবে?
- জিনার সন্তান (ওয়ালাদুয যিনা) সম্পূর্ণ নিষ্পাপ। তার কোনো অপরাধ নেই। ইসলামে কাউকে তার পিতার অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়া হয় না।
- আপনারা তার মায়ের আত্মীয় হওয়ার কারণে সেই সন্তানও আপনাদের রক্তসম্পর্কের আত্মীয় (মায়ের দিক থেকে)। সুতরাং তার সাথে অন্য সন্তানদের মতোই সদয় ও স্নেহপূর্ণ ব্যবহার করা জরুরি। তাকে ঘৃণা করা বা অবহেলা করা গুনাহ।
- সন্তানের নাম, লালন-পালন, খোরাক ইত্যাদি মায়ের ওপর এবং মায়ের পরিবারের দায়িত্ব। পিতার পরিচয় দেওয়া জরুরি নয়; বরং মায়ের দিকে সম্পৃক্ত করাই উত্তম। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৬০)
৩. তাকে এই হারাম থেকে বের করে আনতে আপনার করণীয় কী?
- আল্লাহর কাছে তার হেদায়েতের জন্য দোয়া করতে থাকুন।
- তাকে সরাসরি না বলে কোনো আলিম বা বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
- তাকে জানান যে, এই পাপ থেকে তওবা করা ফরজ। তওবার শর্ত হলো:
- সাথে সাথে এই হারাম সম্পর্ক ছিন্ন করা।
- ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
- অতীতের পাপের জন্য লজ্জিত হওয়া ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
- তার মা-বাবা বা অভিভাবকদের মাধ্যমে তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করুন, তবে বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করুন, যাতে তার ইজ্জত নষ্ট না হয় (যতদিন না সে প্রকাশ্যে পাপ করছে)।
হানাফি কিতাবের উদ্ধৃতি:
- “যিনা কবিরা গুনাহ, এবং তার সন্তান বৈধ পিতার দিকে সম্পৃক্ত হবে না; বরং সন্তান মায়ের দিকে সম্পৃক্ত।” (ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/৩২)
- “আত্মীয়স্বজনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম, তবে পাপ কাজে সহায়তা না করার জন্য ন্যূনতম সম্পর্ক রাখা জরুরি।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২২৫)
- “জিনার সন্তানের সাথে সদয় ব্যবহার করা ওয়াজিব, কারণ সে নিষ্পাপ।” (আহসানুল ফাতাওয়া, ৫/৩৩২)
মোটকথা: আপনি তাকে উপদেশ দিতে থাকুন, তবে প্রয়োজন না থাকলে তার সাথে সম্পর্ক না রাখাই উত্তম। তার সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসুন এবং অন্য আত্মীয় সন্তানদের মতো ব্যবহার করুন। আল্লাহ তাকে হেদায়েত দান করুন। আমীন।