বন্ধক রেখে সুদে টাকা নেওয়া, আসল ও সুদ মিলে টাকা জমা, স্বর্ণকার সুদ ছাড়া গহনা ফেরত দিচ্ছে না—এমতাবস্থায় করণীয় কী?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 1833
Questioner: Sonali Islam 0084
Question Asked: 20 Jun 2026, 10:32 AM
Reviewed & Published: 20 Jun 2026, 10:38 AM
Views: 62
Tokens: 5,019
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
আমাদের অনেক টাকা ঋণ। একজন আম্মুকে তার গহনা দিয়ে স্বণর্কারের কাছে বন্ধক রেখে টাকা নিতে বলছে।এখন তার জিনিস ফেরত দিতে হবে। সেখানে আসল - সুদ মিলে টাকা জমে গেছে। আমি তা কী তা ফেরত দিতে আম্মুকে আসল টাকা বাবদ টাকা দিতে পারব?
তবে স্বর্ণকার শুধু আসলে তো জিনিস ফেরত দেবে না সুদ না নিয়ে। তবে কী করণীয়?

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নটি পরিষ্কার করে বুঝা যাচ্ছে যে, আপনার আম্মু স্বর্ণকারের কাছে গহনা বন্ধক রেখে সুদী ঋণ নিয়েছেন। এখন গহনা ফেরত নিতে গেলে স্বর্ণকার সুদসহ টাকা দাবি করছে। আপনি জানতে চান—আম্মুকে শুধু আসল টাকা দিলে কি চলবে? আর স্বর্ণকার সুদ না নিলে জিনিস ফেরত দেবে না, তাই কী করণীয়?

সংক্ষিপ্ত উত্তর:

  1. আপনি আপনার আম্মুকে শুধু আসল টাকার পরিমাণ (যত টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল) দিতে পারেন। এটি বৈধ এবং সওয়াবের কাজ।
  2. সুদ দেওয়া বা নেওয়া উভয়ই হারাম। তাই আপনি আম্মুকে সুদ দেওয়ার জন্য টাকা দিতে পারবেন না। আম্মু নিজেও সুদ দিতে বাধ্য নন, বরং তাকে তাওবা করতে হবে।
  3. যদি স্বর্ণকার জোর করে সুদ ছাড়া গহনা ফেরত দিতে রাজি না হয়, তবে চরম প্রয়োজন (যেমন গহনাটি খুব মূল্যবান এবং হারালে বড় ক্ষতি) হলে আম্মু নিজে সুদ দিয়ে গহনা উদ্ধার করতে পারেন, কিন্তু সাথে সাথে তাওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এরূপ লেনদেন থেকে বিরত থাকতে হবে। আপনি সুদ পরিশোধে সাহায্য করতে পারবেন না।

বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা:

১. সুদের হারাম হওয়া: কুরআন, হাদিস ও ইজমা দ্বারা সুদ (রিবা) স্পষ্টভাবে হারাম। আল্লাহ বলেন:

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
"আল্লাহ বেচাকেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারা, ২:২৭৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَعَنَ اللَّهُ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ
"আল্লাহ লানত করেছেন সুদখোরকে, সুদদাতাকে, তার লেখককে ও তার সাক্ষীদ্বয়কে।" (মুসলিম)

ফিকহের কিতাবে স্পষ্ট: বন্ধক রেখে সুদে টাকা নেওয়া জায়েয নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৫/১৬৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৩/২১৬)

২. আপনার আম্মুর করণীয়:

  • আম্মু গুনাহগার হয়েছেন সুদী চুক্তিতে জড়িত হয়ে। তার উচিত তাওবা করা এবং ভবিষ্যতে এসব লেনদেন থেকে বিরত থাকা।
  • ঋণের আসল টাকা ফেরত দেওয়া তার উপর ওয়াজিব। কিন্তু সুদ দেওয়া তার জন্য বৈধ নয়।
  • স্বর্ণকারকে শুধু আসল টাকা দিয়ে গহনা ফেরত চাইতে হবে। যদি সে রাজি না হয়, তবে সম্ভব হলে ইসলামি আদালতে বা সালিসের মাধ্যমে মীমাংসা করা উচিত।

৩. আপনি কি আম্মুকে আসল টাকা দিতে পারবেন? হ্যাঁ, আপনি আম্মুকে গিফট বা কর্জ হিসাবে আসল টাকা দিতে পারেন। এটি একটি পুণ্যময় কাজ, কারণ মা-বাবার প্রয়োজন মেটানো সন্তানের দায়িত্ব।

তবে বলতে হবে যে এই টাকা দিয়ে যেনো শুধুমাত্র আসল ঋন পরিশোধ করে,সুদ নয়।

৪. সুদ দিয়ে গহনা উদ্ধারের বিধান: যদি স্বর্ণকার কোনোমতেই সুদ ছাড়া গহনা ফেরত না দেয়, তাহলে ফিকহের কিতাবে একটি প্রয়োজনীয় (দারুরা) অনুমতি দেওয়া হয়েছে:

إذا كان الرهن في يد المرابي فطلب الراهن رهنه وأبى المرابي إلا بالربا فإنه يدفع الربا ويأخذ رهنه ويكره ذلك
"যদি বন্ধকী জিনিস সুদখোরের কাছে থাকে এবং বন্ধকদাতা জিনিস ফেরত চায়, কিন্তু সুদখোর সুদ ছাড়া ফেরত দিতে রাজি না হয়, তাহলে বন্ধকদাতা সুদ দিয়ে জিনিস নিয়ে নিতে পারে, তবে তা মাকরূহ (নিষিদ্ধের কাছাকাছি)।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৩/২১৬; রদ্দুল মুহতার, ৫/১৬৭)

অর্থাৎ, শুধুমাত্র চরম প্রয়োজন (যেমন গহনাটি অত্যন্ত মূল্যবান, বা পরিবারের একমাত্র সঞ্চয়) এবং অন্য কোনো উপায় না থাকলে আম্মু নিজে নিজের টাকা থেকে সুদ দিয়ে গহনা উদ্ধার করতে পারেন। কিন্তু আপনাকে বা অন্য কাউকে সেই সুদ দিতে দেওয়া যাবে না, কারণ এটি গুনাহে সহযোগিতা হবে। মনে রাখবেন, এটা অনুমতি মাত্র, উৎসাহ নয়। পরবর্তীতে তাকে তাওবা করতে হবে।

৫. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:

  • ভবিষ্যতে কখনোই বন্ধক রেখে সুদী লেনদেন করবেন না। ইসলামী শরিয়তে জিনিস বন্ধক রেখে কর্জ নেওয়া যায়, তবে শরিয়তসম্মত শর্তে—যেখানে কোনো সুদ বা অতিরিক্ত শর্ত থাকে না। (সহীহ বুখারি, হাদিস ২৪৫১)
  • স্বর্ণকারের সাথে যোগাযোগ করে তাকে বোঝান যে সুদ হারাম। সম্ভব হলে তাকে শুধু আসলে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করুন।
  • প্রয়োজনীয় টাকা যদি অন্য কোনো হালাল উৎস (যেমন কর্জে হাসানা, আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য) থেকে সংগ্রহ করা যায়, তবে তা উত্তম।

সারকথা: আপনি আম্মুকে আসল টাকা দিতে পারেন। তবে বলতে হবে যে এই টাকা দিয়ে যেনো শুধুমাত্র আসল ঋন পরিশোধ করে,সুদ নয়। আম্মুকে তাওবা করতে বলুন। প্রয়োজনে তিনি নিজে (এবং শুধুমাত্র নিজের টাকা দিয়ে) সুদ দিয়ে গহনা উদ্ধার করতে পারেন, কিন্তু তা কেবল দারুরা স্তরে এবং তাওবার সাথে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সুদ ও সব ধরনের হারাম লেনদেন থেকে হেফাজত করুন। (আমিন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.