অন্যের নেক আমল দেখে মনে হিংসা আসলে করণীয় কী?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 1822
Questioner: Khurshid Jahan Sania
Question Asked: 20 Jun 2026, 12:54 AM
Reviewed & Published: 20 Jun 2026, 01:15 AM
Views: 52
Tokens: 3,869
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কেউ আমার চাইতে বেশি আমল করলে তাকে দেখলে হিংসা হয় মনে হয় যেন আল্লাহ আমার চাইতে বেশি তাঁকে ভালোবাসে এটা কি গুনাহ হবে?

Answer

প্রশ্ন: কেউ আমার চাইতে বেশি আমল করলে তাকে দেখলে হিংসা হয়, মনে হয় যেন আল্লাহ আমার চাইতে বেশি তাঁকে ভালোবাসে, এটা কি গুনাহ হবে?

উত্তর

আপনার মনে এই ধরনের চিন্তার উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক মানবিক দুর্বলতা, এটা ইসলামের দৃষ্টিতে এটি **বর্জনীয় ** এবং এটি থেকে বাঁচা ওয়াজিব (অত্যাবশ্যক)। তবে হিংসা না করে বরং তার থেকে বেশী নিজে আমল করার চিন্তা করা যাকে গিবতা বলে, এটা প্রশংসনীয়

হিংসা এবং গিবতা এর পার্থক্য

হিংসা হল, কারো ভালো জিনিষ দেখে এটা কামনা করা যে, তার ঐ ভালো জিনিষটি তার থেকে দূরে চলে যাক। এটা শরীয়তে নিন্দনীয়।

গিবতা হল, কারো ভালো জিনিষ দেখে এটা কামনা করা যে, তার ঐ ভালো জিনিষ তার কাছে থাকুক, তবে আমার জন্য এর থেকে বেশী অর্জন হোক।এটা প্রশংসনীয়।

১. হিংসা (হাসাদ) কবীরা গুনাহ

অন্যের নেক আমল দেখে হিংসা করা ইসলামে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। হিংসা মানে তার আমল নষ্ট হওয়াকে কামনা করা। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:

"অথবা তারা লোকদেরকে হিংসা করে আল্লাহ তা'আলা নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দান করেছেন তার জন্য?" (সূরা আন-নিসা: ৫৪)

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:

"তোমরা হিংসা থেকে বাঁচো। নিশ্চয়ই হিংসা আগুন যেমন শুকনো কাঠকে পুড়িয়ে ফেলে, তেমনি নেক আমলকে পুড়িয়ে ফেলে।" (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯০৩)

২. আল্লাহর ভালোবাসা সম্পর্কে ধারণা

আপনার মনে যদি এই ধারণা আসে যে "আল্লাহ আমার চাইতে বেশি তাঁকে ভালোবাসে", তাহলে এটি আল্লাহর প্রতি খারাপ ধারণা (সু-ই জন্ন) হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ ধারণা থেকে বাঁচো। নিশ্চয়ই কিছু ধারণা গুনাহ।" (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)

আমরা কারোর বাহ্যিক আমল দেখে আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। কারণ:

  • অনেকের আমল গোপন থাকে
  • নিয়তের বিশুদ্ধতা আল্লাহই জানেন
  • খতমে নবুওয়াতের পর কেউ জান্নাতি না জাহান্নামি তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না

ইমাম গাযযালী (রহ.) বলেন: "অন্যের নেক আমল দেখে হিংসা করা এবং নিজেকে তার চেয়ে কম মনে করা—এটা শয়তানের প্ররোচনা। বরং মুমিনের উচিত অন্যের ভালো দেখে তার জন্য দুআ করা এবং নিজের আমলে উন্নতি করার চেষ্টা করা।" (ইহইয়া উলুমিদ্দীন, ৩/৩০)

৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিকোণ

হানাফি মাযহাবের কিতাবসমূহে হিংসাকে কবীরা গুনাহ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে:

ফাতাওয়া হিন্দিয়াতে বলা হয়েছে:

"হাসাদ (হিংসা) হলো অন্যায়ভাবে অন্যের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা এবং তার নেয়ামত অপছন্দ করা। এটি হারাম ও কবীরা গুনাহ।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৬)

রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) এ উল্লেখ আছে:

"ঈর্ষা ও হিংসা করা কবীরা গুনাহ, যদি তা অন্তরে পোষণ করা হয় এবং তার কারণে কোনো ক্ষতি করার ইচ্ছা থাকে। তবে যদি শুধু অন্তরের অনুভূতি হয় এবং তা দূর করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা মাফ হওয়ার আশা রাখে।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৬)

ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) তে বলা হয়েছে:

"অন্যের আমল দেখে হিংসা হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু তা দূর করার চেষ্টা করা ফরজ। যদি মনে এই ধারণা আসে যে আল্লাহ তাকে বেশি ভালোবাসে, তাহলে তা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট না থাকার নামান্তর। বান্দার উচিত নিজের আমলে মনোযোগ দেওয়া এবং অন্যের জন্য ভালো কামনা করা।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩০)

৪. করণীয়

আপনার মনে যখনই এরূপ হিংসার ভাব আসে, তখন:

  1. ইস্তিগফার পড়ুন: "আস্তাগফিরুল্লাহ" পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।
  2. দুআ করুন: ঐ ব্যক্তির জন্য দুআ করুন, যেমন: "আল্লাহুম্মা বারিক লাহু ফী আমলিহি" (হে আল্লাহ! তার আমলে বরকত দিন)।
  3. নিয়ত সংশোধন করুন: নিজের নিয়ত করুন যে, আপনিও তার মতো বেশি আমল করার চেষ্টা করবেন।
  4. গিবত (পরনিন্দা) থেকে বিরত থাকুন: হিংসা যেন কোনো অপবাদ বা গিবতে পরিণত না হয়।

৫. কুরআন ও হাদিসের আলোকে সমাধান

আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

"তোমরা যে বিষয়ে হিংসা করছ, সেটা আল্লাহর অনুগ্রহ। আমরা মানুষকে তাদের উপার্জন অনুযায়ী দিয়ে থাকি।" (সূরা আন-নিসা: ৫৪, ভাবার্থ)

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:

"তোমাদের কেউ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।" (বুখারি, হাদিস: ১৩)

উপসংহার

আপনার মনে অন্যের আমল দেখে হিংসা হওয়া এবং মনে করা যে আল্লাহ তাকে বেশি ভালোবাসে, তার থেকে ঐ ভালো আমলটি চলে যাক—এটি গুনাহ এবং এটি থেকে তওবা করা জরুরি। তবে তার থেকে চলে না যাক, বরং আমার জন্য সমপরিমাণ বা বেশী অর্জন হোক, এমনটা কামনা করা জায়েজ ও প্রশংসনীয়।

সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো: অন্যের নেক আমল দেখে হিংসা না করে, বরং তার জন্য শুকরিয়া আদায় করা যে আল্লাহ তাকে নেক আমলের তাওফীক দিয়েছেন এবং নিজেও সেই আমল করার চেষ্টা করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হিংসা থেকে হেফাজত করুন এবং নেক আমলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার তাওফীক দিন। আমীন।


উত্তর প্রদানে সহায়ক গ্রন্থাবলী:

  • কুরআনুল কারীম (সূরা নিসা: ৫৪, সূরা হুজুরাত: ১২)
  • সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম
  • আবু দাউদ (হাদিস: ৪৯০৩)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩৫৬)
  • রদ্দুল মুহতার (৬/৩৮৬)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৩০)
  • ইহইয়া উলুমিদ্দীন (৩/৩০)
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি) - সূরা নিসার তাফসির

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.