শর্তযুক্ত ৩ তালাক সংক্রান্ত

Marriage and Divorce · Hanbali

Question No: 1815
Questioner: Md Saiful
Question Asked: 19 Jun 2026, 09:40 PM
Reviewed & Published: 19 Jun 2026, 09:50 PM
Views: 60
This answer is according to the 'Hanbali' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি আমার স্ত্রীকে বলেছিলাম তুমি যদি ওই ছেলের সাথে আবার যোগাযোগ করো তাহলে আমাদের তিন তালাক হয়ে যাবে,, তার কিছুদিন পরেই আমার স্ত্রীকে আমি ওই ছেলের সাথে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করতে দেখেছি,, এখন প্রশ্ন হচ্ছে , আমার স্ত্রীর ওপর কি তিন তালাক পতিত হয়েছে কিনা ?

Answer

উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি একটি শর্তযুক্ত তালাক (তা‘লীক) সংক্রান্ত। আপনি আপনার স্ত্রীকে বলেছেন: “তুমি যদি ওই ছেলের সাথে আবার যোগাযোগ করো, তাহলে আমাদের তিন তালাক হয়ে যাবে।” এর কিছুদিন পর আপনি তাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে ওই ছেলের সাথে যোগাযোগ করতে দেখেছেন। এখন প্রশ্ন হলো— এতে কি তিন তালাক পতিত হয়েছে?

সংক্ষিপ্ত জবাব:

বিষয়টি নিয়ে ইমামগণের মতভেদ আছে। তবে হাম্বলী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত ও অধিকাংশ সালাফ-খালাফের ফতোয়া অনুযায়ী, আপনার উক্ত শর্ত পূর্ণ হওয়ায় তিন তালাকই পতিত হয়েছে। তবে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, ইবনুল ক্বাইয়িম, শাইখ ইবন উসাইমীন প্রমুখ বড় আলিমের মতে এটি এক তালাক গণ্য হবে, যদি আপনার উদ্দেশ্য শুধু তাকে ভয় দেখানো বা নিষেধ করা হয় (যেমনটি আপনার বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে)।

নিচে বিস্তারিত দলীল ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।


বিস্তারিত আলোচনা:

১. শর্তযুক্ত তালাকের মূলনীতি

শরিয়তে শর্তযুক্ত তালাক বৈধ। যদি কোনো ব্যক্তি বলে, “যদি তুমি অমুক কাজ করো, তাহলে তুমি তালাক” এবং সেই কাজটি করা হয়, তবে তালাক পতিত হয়। এটি কুরআন ও সুন্নাহর সাধারণ নীতির ওপর ভিত্তি করে। আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ
“হে নবী! যখন তোমরা স্ত্রীদের তালাক দাও, তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিও।” (সূরা আত-তালাক: ১)

এখানে তালাকের শর্ত দেওয়াও তালাকের অন্তর্ভুক্ত।

২. সংখ্যা উল্লেখ করলে কি তিন তালাক হয়?

আপনি বলেছেন: “আমাদের তিন তালাক হয়ে যাবে” – অর্থাৎ শর্ত পূরণ হলে তিন তালাক দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

অধিকাংশ আলিমের মত (হাম্বলী, শাফিঈ, মালিকী, হানাফী):
যদি কোনো ব্যক্তি শর্তসাপেক্ষে তিন তালাকের কথা বলে এবং শর্ত পূর্ণ হয়, তাহলে তিন তালাকই পতিত হয়। কারণ সে নিজেই সংখ্যা নির্ধারণ করেছে। ইবন কুদামা (রহ.) বলেন:

“إذا قال: إن فعلت كذا فأنت طالق ثلاثاً، ففعلت، طلقت ثلاثاً”
“যদি কেউ বলে: ‘যদি তুমি অমুক কাজ করো, তাহলে তুমি তিন তালাক’, এবং সে কাজ করে, তবে সে তিন তালাকেই পতিত হবে।” (আল-মুগনী ৭/৩৩২)

এটি হাম্বলী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত।

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল ক্বাইয়িমের মত:
তারা বলেন, এ ধরনের শর্তযুক্ত তালাক যেখানে উদ্দেশ্য স্ত্রীকে ভয় দেখানো বা কোনো কাজ থেকে বিরত রাখা, সেখানে সংখ্যার উল্লেখ থাকলেও তা এক তালাক গণ্য হবে। কারণ মূল উদ্দেশ্য তালাক দেওয়া নয়, বরং নিষেধ করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

“إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ”
“নিশ্চয় কাজ নিয়্যাতের ওপর নির্ভরশীল।” (বুখারী: ১, মুসলিম: ১৯০৭)

ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:

“إذا قال: إن فعلت كذا فأنت طالق ثلاثاً، ونوى التهديد، ففعله، طلقت واحدة”
“যদি কেউ বলে: ‘যদি তুমি অমুক করো, তবে তুমি তিন তালাক’ এবং তার উদ্দেশ্য ভয় দেখানো, তাহলে শর্ত পূরণ হলে এক তালাক পতিত হয়।” (মাজমু‘ ফাতাওয়া ৩৩/১০৯)

শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) এ মতকে শক্তিশালী বলেছেন। (আশ-শারহুল মুমতি‘ ১৩/১২২)

৩. আপনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ

  • আপনি স্ত্রীকে বলেন: “তুমি যদি ওই ছেলের সাথে আবার যোগাযোগ করো, তাহলে আমাদের তিন তালাক হয়ে যাবে।”
  • এরপর আপনি তাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে ওই ছেলের সাথে বার্তা বিনিময় করতে দেখেছেন। (যোগাযোগ প্রমাণিত)
  • শর্ত পূর্ণ হয়েছে।

এখন আপনার নিয়্যাত কী ছিল?

  • যদি আপনার উদ্দেশ্য ছিল সত্যই তালাক দেওয়া (অর্থাৎ শর্ত পূরণ হলে তিন তালাক পতিত হোক), তাহলে অধিকাংশ আলিমের মতে তিন তালাক পতিত হয়েছে
  • যদি আপনার উদ্দেশ্য শুধু তাকে ভয় দেখানো ও নিষেধ করা ছিল (যেমন অধিকাংশ স্বামীর বেলায় হয়), তাহলে ইবন তাইমিয়্যাহ ও ইবন উসাইমীন প্রমুখের মতে এক তালাক পতিত হয়েছে

শাইখ ইবন বায (রহ.)-এর ফতোয়া: তিনি বলেন, শর্তযুক্ত তালাকে সংখ্যার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ; তবে তিনি সাধারণত সতর্কতা অবলম্বন করে বলতেন যে, ব্যক্তি তার নিয়্যাত অনুযায়ী বিচারিত হবে। (মাজমু‘ ফাতাওয়া ২২/২৩২)

৪. হুঁশিয়ারি

  • তালাকের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। যদি তিন তালাক পতিত হয়ে থাকে, তাহলে আপনার স্ত্রী আপনার জন্য হারাম হয়ে গেছেন; তাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার জন্য তার পূর্ব স্বামী (অন্য কাউকে) বিয়ে ও তালাকের প্রক্রিয়া (হিল্লাহ) ছাড়া কোনো উপায় নেই।
  • যদি এক তালাক পতিত হয়, তাহলে ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে আনা সম্ভব (রুজ‘আত)।

সুতরাং প্রস্তাবিত সমাধান:

  1. তওবা ও ইস্তিগফার করুন – তালাকের ব্যাপারে সতর্ক না হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।
  2. নিয়্যাত যাচাই করুন – আপনি সত্যিই কি চেয়েছিলেন? তালাক দেওয়া নাকি শুধু নিষেধ করা? আপনার অন্তরের অবস্থা ভালোভাবে পরখ করুন।
  3. নিকটবর্তী আলিমের পরামর্শ নিন – একজন বিশ্বস্ত আলিম (বিশেষত হাম্বলী মাযহাবের ) এর কাছে আপনার নিয়্যাত ও ঘটনার বর্ণনা দিন। তিনি আপনার অবস্থা বুঝে সঠিক ফতোয়া দেবেন।
  4. সতর্কতা – এ মুহূর্তে স্ত্রীর সাথে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বজায় না রেখে ইদ্দতের অপেক্ষা করুন। যদি তিন তালাক পতিত হয়েছে বলে নিশ্চিত হন, তাহলে তাকে তালাকপ্রাপ্তা হিসেবে গণ্য করুন।

সংক্ষিপ্ত উত্তর:

  • অধিকাংশ আলিমের মতে: আপনার স্ত্রীর ওপর তিন তালাক পতিত হয়েছে।
  • ইবন তাইমিয়্যাহ ও ইবন উসাইমীনের মতে: এক তালাক পতিত হয়েছে, যদি আপনার উদ্দেশ্য শুধু ভয় দেখানো হয়।
  • আপনার কর্তব্য: নিয়্যাত পর্যালোচনা করে একজন হাম্বলি মাযহাবের আলিমের শরণাপন্ন হন। আল্লাহ তাআলা আপনার বিষয়ে সহজতা দান করুন।

وَاللَّهُ أَعْلَمُ


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.