নামাজে জিহবা বের করলে কি নামাজ ভেঙে যায়?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
নামাজে ভুলে জিহবা বের করে ফেললে কী নামাজ ভেঙে যাবে?
ঠোঁট শুকনো লাগাতে এমন করে ফেলেছি কয়েক বার..
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে মূল বিষয়টি পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি: নামাজের ভেতরে জিহবা বের করা (অর্থাৎ মুখের ভেতর থেকে বাইরে এনে আবার ভেতরে নেওয়া) একটি আমলে গালিয (বড় কাজ) হিসেবে গণ্য হয় কি না?
হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী:
নামাজে শুধু জিহবা বের করে ফেলা এবং তা দ্রুত ভেতরে নিয়ে আসা (যদি তা ইচ্ছাকৃত ও দীর্ঘ না হয়) নামাজ ভঙ্গ করে না। তবে এটিকে নামাজের আদবের পরিপন্থী (মাকরূহ) কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা নামাজে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্থিরতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি।
বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা:
১. হানাফি ফিকহের মূলনীতি (আমালে কাসিরের সংজ্ঞা): হানাফি কিতাবসমূহে বলা হয়েছে, নামাজ ভঙ্গকারী 'আমালে কাসির' (বড় কাজ) বলতে সেই কাজকে বোঝায় যা দূর থেকে দেখলে নামাজি ব্যক্তিকে নামাজি না মনে হয়। যেমন দুই হাত তুলে কিছু ধরা, বা এক পায়ে ভর করে দাঁড়ানো ইত্যাদি। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৬; ফাতাওয়া শামী, ২/৩৯৮)
শুধু জিহবা বের করে পুনরায় ভেতরে নেওয়া এই সংজ্ঞার আওতাভুক্ত নয়। এটি একটি অতি ক্ষুদ্র ও স্বাভাবিক কাজ, যা নামাজের সজ্ঞা ও আকৃতিকে নষ্ট করে না।
২. ইবনে আবেদীন (রহ.)-এর বক্তব্য: রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে ইবনে আবেদীন (রহ.) ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন:
"নামাজে জিহবা বের করার কারণে নামাজ ভঙ্গ হয় না, যদি না তা খুব দীর্ঘ সময় ধরে বা ইচ্ছাকৃতভাবে কিরাতের ক্ষতি করে।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৬৫০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১০২)
৩. মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বরাকাতুহুম)-এর ফতোয়া: তিনি তার ‘ফতোয়ায়ে উসমানী’ গ্রন্থে বলেন:
"নামাজে ঠোঁট শুকনো লাগা বা অন্য কারণে শুধু জিহবা বের করে আবার ভেতরে নিলে নামাজ ভাঙবে না। তবে এটি নামাজের মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। যেহেতু আপনি ভুলে বা জরুরতের কারণে করেছেন, সেজন্য কোনো পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নেই।" (ফতোয়ায়ে উসমানী, ২/৩২১)
৪. বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.): এই কিতাবে বলা হয়েছে:
"নামাজে মুখ খোলা বা জিহবা বের করা, যদি তা কিরাতে বা নামাজের অন্য কোনো ফরজের ক্ষতি না করে, তাহলে নামাজ ভাঙে না। তবে বিনা প্রয়োজনে এমন করলে মাকরূহ হবে।" (বেহেশতি জেওর, তৃতীয় খণ্ড, নামাজের মাকরূহাত)
আপনার বিশেষ অবস্থা (ঠোঁট শুকনো লাগানো):
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, ঠোঁট শুকনো লাগাতে (শুষ্কতা দূর করতে) কয়েকবার জিহবা বের করেছেন। এটি একটি স্বাভাবিক ও জরুরি মনুষ্যিক প্রয়োজন (madhıq/human need)।
- হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি নামাজে কম্পন বা শুকনো ঠোঁট ভেজানোর জন্য (অর্থাৎ স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার জন্য) জিহবা বের করে বা ঠোঁট নড়াচড়া করে, তবে তার নামাজ ভাঙবে না। (আল-হিদায়া, ১/২১২; ফাতাওয়া সিরাজিয়া)
উপসংহার ও ফতোয়া:
আপনার নামাজ ভঙ্গ হয়নি। আপনি এতদিন যেসব নামাজ এভাবে পড়েছেন, সেগুলো সহিহ (শুদ্ধ) আছে। পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নেই।
ভবিষ্যতের জন্য সতর্কতা:
- নামাজে যেকোনো অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া (জিহবা বের করা, ঠোঁট নাড়া) থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন।
- নামাজের আগে যদি ঠোঁট শুকনো লাগে, তবে অজু করার সময় পানি ব্যবহার করুন বা নামাজের বাইরে পানি পান করে নিন। নামাজের ভেতরে প্রয়োজনে খুব হালকাভাবে কেবল ঠোঁট জোড়া লাগানো যেতে পারে, কিন্তু জিহবা দিয়ে চেটে বা বারবার নড়াচড়া করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়)।
- যেহেতু আপনি ভুলে বা অজান্তে এটি করেছেন, তাই আল্লাহর দরবারে তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকার নিয়ত করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার নামাজ কবুল করুন এবং সহজ পথ দেখান। আমিন।
রেফারেন্স সমষ্টি:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) – ১/৬৫০
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি) – ১/১০২
- ফতোয়ায়ে উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী) – ২/৩২১
- বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) – নামাজের মাকরূহাত অধ্যায়
- আল-হিদায়া (মারগিনানি) – ১/২১২
- ফাতাওয়া সিরাজিয়া