স্ত্রীর চাকরি করা নিয়ে।
Family Life · Hanafi
Question
আমি চাইনা, আমার স্ত্রী বাইরে গিয়ে চাকরি করুক। চাইনা সে ছেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে উপার্জন করুক, যেখানে তার পর্দার খেলাফ হবে এবং ফিতনার আশংকা থাকবে।
আমার মা আমার স্ত্রীকে নানা কথা বলেন এবং ভুল ধরতে থাকেন। যদিও আমার স্ত্রী তেমন কিছুই করে না ভুল ধরার মত। আমার মা খুবই খুতখুতে। এখান থেকে আমার স্ত্রীর মনে হয়, যদি সে কিছু করত (চাকরি) যেহেতু সে শিক্ষিত। তাহলে তাকে এসব কথা কোনো ইফেক্ট করতো না।
অন্যদিকে আমার শাশুড়ি চাকরি করেন এবং ঘর সামলান। শশুড় মৃত। শাশুড়ি আমার স্ত্রীকে চাকরির কথা বলেন, ইনকামের দিকে অনুপ্রানীত করতে থাকেন।
মোটকথা আমি চাইনা আমার স্ত্রীর পর্দার খেলাফ করে চাকরি করুক বা ফ্রি মিক্সিং এ জড়াক। কিংবা অন্যের গোলামি করুক। আমি আমার স্ত্রীকে রাব্বাতুল বাইত হিসেবেই চাই। ইসলাম নারীকে যে মর্যাদা দিয়েছেন, তার থেকে ভাল আর কি বা হতে পারে।
সার্বিক অবস্থায় আমার করনীয় কি?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রশ্নটির জন্য ধন্যবাদ। আপনি আপনার স্ত্রীকে পর্দার খেলাফ ও ফিতনামুক্ত পরিবেশে রাখতে চান এবং ইসলাম নারীকে যে মর্যাদা দিয়েছে তাতে সন্তুষ্ট—এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও দায়িত্বশীল স্বামীর পরিচয়। আপনার করণীয় সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও হানাফি ফিকহের আলোকে নিম্নে বিস্তারিত জানানো হলো।
১. নারীর বাইরে চাকরি করার শর‘ঈ বিধান
ইসলাম নারীকে ঘরের রাণী (রাব্বাতুল বাইত) হিসেবে সম্মানিত করেছে। তার প্রাথমিক দায়িত্ব হলো ঘর-সংসার ও সন্তানদের দেখাশোনা করা, স্বামীর জন্য ঘরকে শান্তিময় করা। বাইরে গিয়ে চাকরি করা সাধারণত উৎসাহিত করা হয় না, বিশেষত যখন তা পর্দা লঙ্ঘন, বেগানা পুরুষের সাথে মুক্ত মেলামেশা (ফ্রি মিক্সিং) বা ফিতনার কারণ হয়।
শর‘ঈ নীতিমালা:
-
পর্দা বাধ্যতামূলক: আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান কর এবং আগেকার জাহেলিয়াতের মতো নিজেদের প্রদর্শন করিও না।” (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৩)
ইমাম আবু বকর জাস্সাস (রহ.) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন: এখানে নারীকে ঘরেই অবস্থান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বের হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে যদি না কোনো বৈধ প্রয়োজনে। (আহকামুল কুরআন, ৩/৪৫৭) -
স্বামীর অনুমতি ছাড়া চাকরি জায়েয নয়: স্বামী পরিবারের কর্তা (কওওয়াম) হওয়ায় তার স্ত্রীকে বাইরে যেতে নিষেধ করার অধিকার আছে। হাদীসে এসেছে,
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর তোমাদের প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল…” (বুখারী, মুসলিম) -
প্রয়োজন ও শর্ত সাপেক্ষে জায়েয: যদি পরিবারে চরম আর্থিক সংকট থাকে এবং স্বামী উপার্জনে অক্ষম হয়, তবে স্ত্রী পর্দা রক্ষা করে, বেগানা পুরুষের সাথে মেলামেশা না করে এবং নিরাপদ পরিবেশে চাকরি করতে পারে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে আপনি চান না এবং আর্থিক প্রয়োজনও নেই বলে মনে হচ্ছে।
হানাফি ফিকহের গ্রন্থসমূহ:
ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) রদ্দুল মুহতার (৬/৪৬০) এ লিখেছেন:
“মহিলার জন্য ঘর থেকে বের হওয়া জায়েয নয় যদি না কোনো বৈধ প্রয়োজন থাকে এবং তাতে ফিতনার আশঙ্কা না থাকে। চাকরির জন্য বের হওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত।”
ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৩৪) তে এসেছে:
“নারীর জন্য বেগানা পুরুষের সাথে মিশে চাকরি করা বা পর্দা লঙ্ঘন করে কাজ করা হারাম। স্বামী তাকে নিষেধ করলে তা মান্য করা ওয়াজিব।”
সুতরাং আপনার ইচ্ছা ও নিষেধ সম্পূর্ণ শর‘ঈ এবং আপনার স্ত্রীর জন্য তা মান্য করা আবশ্যক।
২. আপনার মাতার সাথে সম্পর্ক ও করণীয়
আপনার মা আপনার স্ত্রীর ভুল ধরছেন এবং খুঁতখুঁতে। এটি একটি সাধারণ পারিবারিক সমস্যা। কিন্তু ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শান্তি বজায় রাখা জরুরি। আপনার করণীয়:
-
মাকে সম্মান জানিয়ে বোঝান: আপনি আপনার মায়ের সাথে নম্রভাবে কথা বলুন, তাকে বুঝিয়ে বলুন যে আপনার স্ত্রী ভালো আছে এবং অহেতুক ভুল ধরা ইসলামে পছন্দনীয় নয়। হাদীসে এসেছে:
“মুসলিম সে, যে অন্য মুসলিমের জিহ্বা ও হাত থেকে নিরাপদ থাকে।” (বুখারী) -
মায়ের কথা শুনুন, কিন্তু স্ত্রীর প্রতি ইনসাফ করুন: যদি মা অন্যায় বলেন, তবে আপনি স্ত্রীর পক্ষ নিন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে তার পরিবারের প্রতি উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের প্রতি তোমাদের চেয়ে বেশি উত্তম।” (তিরমিযী) -
মাকে ইতিবাচক কাজে ব্যস্ত রাখুন: যেমন নাতি-নাতনির দেখাশোনা বা অন্যান্য সৎ কাজে উৎসাহ দিন।
৩. শাশুড়ির প্রভাব ও করণীয়
আপনার শাশুড়ি নিজে চাকরি করেন এবং আপনার স্ত্রীকে উৎসাহ দেন। এখানে আপনার করণীয়:
-
স্বামী হিসেবে আপনার কর্তৃত্ব বজায় রাখুন: আপনার স্ত্রীকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিন যে আপনি তার বাইরে চাকরি করতে চান না। এটি আপনার অধিকার ও দায়িত্ব। শাশুড়ির কথায় প্রভাবিত না হয়ে তিনি যেন আল্লাহর হুকুম ও আপনার কথাই মেনে চলেন।
-
শাশুড়ির সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করুন: সরাসরি দ্বন্দ্বে না গিয়ে তাকে বুঝানোর চেষ্টা করুন। বলুন: “আমার স্ত্রী ঘরের কাজেই অধিক সম্মানিত, ইসলাম তাকে রাব্বাতুল বাইত বানিয়েছে। আমরা তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ চাই।”
৪. আপনার করণীয়: সার্বিক দিকনির্দেশনা
ক) স্ত্রীকে ইসলামের মর্যাদা বোঝান: তাকে বলুন, “ইসলাম নারীকে যে সম্মান দিয়েছে, তা কোনো চাকরি দিতে পারে না। তুমি ঘরের রাণী, সন্তানদের প্রথম বিদ্যালয়। তুমি যদি সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলো, তবে তা জিহাদের চেয়েও বড় সওয়াবের কাজ।”
খ) স্ত্রীর শিক্ষার ব্যবহারের বিকল্প দিন: তিনি শিক্ষিত—তাকে ঘরে বসে অনলাইনে ইসলামী শিক্ষা দেওয়া, কুরআন শিক্ষা দেওয়া, অথবা মেয়েদের মাদ্রাসায় পড়ানো (যেখানে পর্দা রক্ষিত) ইত্যাদির পরামর্শ দিন। এতে তার শিক্ষার সদ্ব্যবহার হবে এবং পর্দাও রক্ষা পাবে।
গ) স্ত্রীকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করুন: তার মন খারাপ হয় জেনে আপনার মায়ের কথায়। আপনি তাকে সান্ত্বনা দিন, বলুন আপনি তার পাশে আছেন। স্বামীর সহানুভূতি ও ভালোবাসা স্ত্রীর জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি।
ঘ) মা ও শাশুড়ির সাথে কৌশলী আচরণ করুন: দু’জনের সাথে পৃথকভাবে বসে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরুন। তাদের বলুন, আপনি চান আপনার পরিবার আল্লাহর হুকুম মেনে চলুক। প্রয়োজনে স্থানীয় আলেম বা বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির সাহায্য নিন।
ঙ) ধৈর্য ও ইস্তিগফার করুন: পারিবারিক উত্তেজনা কমাতে বেশি বেশি দুরূদ পড়ুন ও ইস্তিগফার করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন: “যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন।” (সূরা আত-তালাক ৬৫:২)
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
- আপনার স্ত্রীর জন্য বাইরে চাকরি করা, যেখানে পর্দা লঙ্ঘন হয় বা ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তা হারাম।
- স্বামী হিসেবে আপনার নিষেধ করা আপনার অধিকার ও দায়িত্ব। আপনার স্ত্রীকে তা মেনে চলা ওয়াজিব।
- মা ও শাশুড়ির কথা শুনতে পারেন, তবে শরী‘আতের সীমারেখা অতিক্রম করা যাবে না।
- স্ত্রীর শিক্ষার সঠিক ব্যবহারের জন্য পর্দা রক্ষাকারী বিকল্প ব্যবস্থা করুন (যেমন ঘর থেকে অনলাইনে শিক্ষাদান বা মেয়েদের মাদ্রাসা)।
- পরিবারে শান্তি বজায় রাখতে ধৈর্য, হিকমত ও দো‘আ অবলম্বন করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আপনার পরিবারে শান্তি ও বরকত দান করুন। (আমিন)
উল্লেখিত কিতাবসমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
- ফাতাওয়া উসমানী
- ইমদাদুল ফাতাওয়া
- বাহিশতী জেওর
- ফাতাওয়া আলমগীরী
- মা‘আরিফুল কুরআন