বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্রি-মিক্সিং হলে কোথায় পড়া উচিত?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 1747
Questioner: Entishar Rashid Chowdhury
Question Asked: 18 Jun 2026, 12:12 AM
Reviewed & Published: 18 Jun 2026, 12:26 AM
Views: 55
Tokens: 6,318
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একজন ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট।
বাসায় থাকলে অলসতাজনিত কারণে আমার নামাজ এবং পড়াশোনা ঠিকমতো করা হয় না।

একারণে গত কয়েক বছর যাবত আমি সকাল-সন্ধ্যা ভার্সিটি থাকি যাতে আমি নামাজ এবং পড়াশোনা ঠিকমতো করতে পারি।

ভার্সিটিতে বয়েজ লাউঞ্জ আছে, সেখানে পড়াশোনা করার ব্যবস্থাও আছে কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ চেয়ার-টেবিল নেই, অনেক সময় পরিচিত কেউ এসে পড়লে তাদের সাথে গল্প-গুজব করতে গিয়ে সময় নষ্ট হয়, আবার মাঝে মাঝে বদনজরের ভয়ও কাজ করে। এর বাইরে, বয়েজ লাউঞ্জের সাথে একটা প্রেয়ার রুম আছে, ওইখানে কেউ পড়াশোনা করে না, করা যায় কিনা তাও জানি না।

ভার্সিটিতে লাইব্রেরি আছে, যেখানে পড়াশোনার পরিবেশ বয়েজ লাউঞ্জ থেকে ভালো, কিন্তু সেখানে ফ্রি-মিক্সিং হয়। নজরের হেফাজত করা কঠিন।

এমতাবস্থায় আমার করণীয় কী? আমার কি লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করা ঠিক হবে? নাকি বয়েজ লাউঞ্জেই পড়াশোনা করা উচিত? নাকি প্রেয়ার রুমে পড়াশোনা করা যায় এবং সেখানেই চেষ্টা করা উচিত?

Answer

প্রশ্ন: আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। বাসায় থাকলে অলসতার কারণে নামাজ ও পড়াশোনা ঠিকমতো হয় না। তাই গত কয়েক বছর ধরে আমি সকাল-সন্ধ্যা ভার্সিটিতে থাকি যাতে নামাজ ও পড়াশোনা ঠিকমতো করতে পারি। ভার্সিটিতে বয়েজ লাউঞ্জ আছে, কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল নেই, পরিচিতজন এলে সময় নষ্ট হয়, বদনজরের ভয় থাকে। লাইব্রেরির পরিবেশ ভালো কিন্তু সেখানে ফ্রি-মিক্সিং হয়, নজর হেফাজত করা কঠিন। প্রেয়ার রুম আছে, কিন্তু সেখানে কেউ পড়াশোনা করে না। আমার করণীয় কী?


উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين وعلى آله وأصحابه أجمعين

প্রিয় শিক্ষার্থী, আপনার উদ্বেগ ও দ্বীনদারির জন্য আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আপনি যে নামাজ ও পড়াশোনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ খুঁজছেন, এটি একটি প্রশংসনীয় প্রচেষ্টা। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে প্রতিটি বিকল্পের বিশ্লেষণ ও আপনার করণীয় উল্লেখ করা হলো:

১. বয়েজ লাউঞ্জে পড়াশোনা

  • সুবিধা: এটি পুরুষদের নির্দিষ্ট জায়গা, তাই নজর হেফাজতের সমস্যা তুলনামূলক কম। নামাজের সময় হলে সহজেই জামাতে নামাজ পড়া যায়।
  • অসুবিধা: পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল না থাকা এবং গল্প-গুজবে সময় নষ্ট হওয়া।
  • হুকুম: এটি জায়েয, তবে আপনাকে চেষ্টা করতে হবে যাতে অনর্থক কথাবার্তা ও সময় নষ্ট না হয়। মহান আল্লাহ বলেন,
    ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ ۚ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ﴾
    (سورة المنافقون: ৯)
    "হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে; যারা এরূপ করবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।"
    সুতরাং বয়েজ লাউঞ্জে পড়ার সময় আপনি সময় ব্যবস্থাপনার চেষ্টা করুন এবং বদনজর থেকে বাঁচতে সূরা ফালাক, সূরা নাস ও আয়াতুল কুরসি পড়ে আল্লাহর কাছে হেফাজত চান।

২. লাইব্রেরিতে পড়াশোনা (ফ্রি-মিক্সিং পরিবেশ)

  • অসুবিধা: এখানে পুরুষ-মহিলার অবাধ মেলামেশা হয়, যা শরিয়তে নিষিদ্ধ। নজরের হেফাজত করা অত্যন্ত কঠিন, বিশেষ করে যখন দৃষ্টি অনিয়ন্ত্রিত হতে পারে।
  • হুকুম: ফ্রি-মিক্সিং পরিবেশে পড়াশোনা করা মাকরূহ তাহরিমি (নিষিদ্ধ পর্যায়ের অপছন্দনীয়) এবং এটি গুনাহের কাজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
    «إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ حَظَّهُ مِنَ الزِّنَا، أَدْرَكَ ذَلِكَ لَا مَحَالَةَ، فَزِنَا الْعَيْنَيْنِ النَّظَرُ...»
    (صحيح البخاري: ৬২৪৩; صحيح مسلم: ২৬৫৭)
    "আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানের জন্য জিনার যে অংশ নির্ধারণ করেছেন, তা সে অবশ্যই প্রাপ্ত হবে। দুই চোখের জিনা হলো দৃষ্টি..."
    তাই লাইব্রেরিতে পড়া থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ সেখানে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন।

৩. প্রেয়ার রুমে পড়াশোনা

  • সুবিধা: এটি নির্জন ও পরিচ্ছন্ন জায়গা, ফ্রি-মিক্সিং নেই, নামাজের সময় হলে সহজেই ইবাদত করা যায়। বদনজর ও সময় নষ্টের সমস্যাও কম।
  • ব্যবহার: প্রেয়ার রুম সাধারণত নামাজের জন্য নির্ধারিত; তবে সেখানে পড়াশোনা করা নাজায়েজ নয় যদি নামাজের সময় অন্য মুসল্লির জন্য অসুবিধা না হয়। তবে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে সেখানে পড়াশোনা করলে নামাজ আদায়ে কোনো বাধা আসবে না। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে নিতে পারেন।
  • হুকুম: এটি সবচেয়ে উত্তম ও নিরাপদ বিকল্প। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন,
    "يُكْرَهُ اسْتِعْمَالُ الْمَسْجِدِ لِغَيْرِ الصَّلَاةِ وَالْعِلْمِ وَالذِّكْرِ"
    (رد المحتار: ১/৬৭০)
    "মসজিদকে নামাজ, জ্ঞানচর্চা ও জিকির ব্যতীত অন্য কাজে ব্যবহার করা মাকরূহ।"
    প্রেয়ার রুম যদি মসজিদের মতো পবিত্র স্থান না হয়, তবে পড়াশোনা করার অনুমতি রয়েছে। তবে সেখানে কেউ পড়াশোনা করে না— আপনি শুরু করে দিতে পারেন এবং ধীরে ধীরে এটি একটি অভ্যাসে পরিণত হবে।

আপনার করণীয় (সারসংক্ষেপ):

  1. সর্বোত্তম: প্রেয়ার রুমে পড়াশোনা করা (যদি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয় এবং নামাজের সময় অন্যকে অসুবিধা না হয়)।
  2. দ্বিতীয়: বয়েজ লাউঞ্জে পড়া, সেখানে চেয়ার-টেবিলের অভাব পূরণ করতে টেবিল বা ডেস্ক আনার চেষ্টা করুন এবং সময় নষ্ট না করার জন্য সতর্ক থাকুন।
  3. পরিহার করুন: ফ্রি-মিক্সিং পরিবেশে লাইব্রেরিতে পড়া থেকে বিরত থাকুন।

এছাড়া বাসায় পড়ার সময় অলসতা কাটানোর জন্য নিচের টিপসগুলো অনুসরণ করুন:

  • নির্দিষ্ট সময়সূচি তৈরি করুন (যেমন, ফজরের পর ১ ঘণ্টা, আসরের পর ১ ঘণ্টা)।
  • পড়ার ঘরটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিস দূরে সরান।
  • পড়া শুরু করার আগে "বিসমিল্লাহ" ও "আয়াতুল কুরসি" পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।

আল্লাহ তাআলা আপনার দ্বীনি ও দুনিয়াবি কাজে বরকত দান করুন এবং আপনাকে সর্বোত্তম পথ দেখান। আমীন।

রেফারেন্স:

  • কুরআন মজিদ: সূরা নূর (২৪:৩০-৩১), সূরা মুমিনুন (২৩:১-১১)
  • সহিহ বুখারি: ৬২৪৩ (চোখের জিনা প্রসঙ্গে)
  • রদ্দুল মুহতার: ১/৬৭০ (মসজিদের ব্যবহার)
  • আল-হিদায়া: ৪/৪২২ (মেলামেশার বিধান)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৫/৩৯১ (হাতেম আলী), ফাতাওয়া উসমানী: ২/৪২২

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.