স্ত্রী স্বামীর পরিবারের বিরক্তিকর বিষয় স্বামীকে বললে কি গীবত হয়?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين
প্রশ্নে উল্লেখিত বিষয়টি মহিলাদের জন্য একটি সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্ত্রী তার স্বামীর পরিবারের কোনো কাজ বা আচরণে বিরক্ত বা অপছন্দ বোধ করলে সেটি স্বামীকে বলা কি গীবত হবে কিনা, এবং যদি গীবত হয় তাহলে তার সমাধান কী, এবং কার কাছে সে তার স্বামীর পরিবারের সমস্যার কথা বলবে—এ বিষয়ে হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর দেওয়া হলো।
গীবতের সংজ্ঞা ও ব্যতিক্রম
গীবত হলো এমন কোনো কথা বলা যা শুনলে অপর মুসলিম ব্যক্তি অপছন্দ করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“গীবত হলো তোমার ভাইয়ের এমন বিষয় উল্লেখ করা যা সে অপছন্দ করে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৮৯)
তবে কিছু ক্ষেত্রে গীবত জায়েয, যেমন:
১. কোনো জুলুমের অভিযোগ করা (مظلمة) – যুলুমের শিকার ব্যক্তি সাহায্য চাওয়ার জন্য কথা বলতে পারে।
২. কোনো অন্যায় প্রতিরোধের জন্য বা সমাধানের জন্য কারো নিকট পরামর্শ চাওয়া।
৩. ফতোয়া জানার জন্য বা কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য কথা বলা।
(রদ্দুল মুহতার, ৯/৩২; ফাতাওয়া শামী, ৯/৫৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৭৫)
স্বামীকে পরিবারের বিষয় বলা কি গীবত?
স্ত্রী যদি তার স্বামীকে তার পরিবারের কোনো সদস্যের দোষ বা বিরক্তিকর আচরণের কথা বলে, তাহলে তা সাধারণত গীবত হিসেবে গণ্য হবে না, যদি নিম্ন শর্তগুলো পূর্ণ হয়:
১. উদ্দেশ্য সমাধান বা পরামর্শ – স্ত্রী শুধু অভিযোগ করতে বা গালি দিতে নয়, বরং স্বামীর কাছে সমস্যার সমাধান চাওয়ার জন্য বা স্বামীকে বিষয়টি অবহিত করার জন্য বলে। স্বামীই হলো পরিবারের প্রধান এবং তার দায়িত্ব ঘরের শান্তি বজায় রাখা।
২. স্বামীই উপযুক্ত ব্যক্তি – যেহেতু স্বামী নিজেই সেই পরিবারের সাথে সম্পর্কিত, তাই সে এসব কথা বলার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত পাত্র। তাকে বলা বৈধ, বরং প্রয়োজনীয়।
৩. প্রকাশ্যে না করে গোপনে – শুধু স্বামীকে ব্যক্তিগতভাবে বলা, অন্যদের কাছে ছড়িয়ে না দেওয়া।
ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন:
“কোনো মহিলা যদি তার স্বামীকে শাশুড়ি বা ননদদের অন্যায় আচরণের কথা বলে, তাহলে এটা গীবত নয়, বরং তার অধিকার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কথা।” (রদ্দুল মুহতার, ৯/৩২; ফাতাওয়া শামী, ৯/৫৮)
অতএব, স্ত্রী যদি কোনো বিরক্তি বা অপছন্দের কারণ স্বামীকে বলে যাতে স্বামী বিষয়টি বুঝে এবং সমাধানের চেষ্টা করে, তাহলে তা গীবত হবে না, বরং বৈধ ও উচিত।
যদি গীবত হয়ে যায় তাহলে সমাধান
যদি স্ত্রী কোনোভাবে গীবত করে ফেলে (যেমন: অযথা বাড়ির অন্যদের কাছে, বা রাগের মাথায় অপ্রয়োজনীয় বিবরণ দিয়ে ফেলে), তাহলে সমাধান হলো:
১. তওবা ও ইস্তিগফার – আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
২. ক্ষমা প্রার্থনা – যদি সম্ভব হয়, যার গীবত করা হয়েছে তার কাছে মাফ চাওয়া। তবে যদি এতে ঝগড়া বা পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি হয়, তাহলে শুধু আল্লাহর কাছে তওবাই যথেষ্ট (বিশেষ করে অশ্লীলতার আশঙ্কায়)। ইমাম নববী (রহ.) বলেন: “গীবতের কারণে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিদ্যমান থাকে এবং তার জানাজানি হলে ফিতনার ভয় না থাকে, তাহলে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া ওয়াজিব; অন্যথায় শুধু তওবাই যথেষ্ট।” (আল-আযকার, পৃষ্ঠা ৩৩৬)
কার কাছে সমস্যার কথা বলবে?
স্ত্রীর জন্য স্বামীর পরিবারের সমস্যা বলার সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি হলো:
১. স্বামী – সর্বপ্রথম স্বামীকে জানাবে এবং তার সঙ্গেই সমাধানের চেষ্টা করবে।
২. বয়স্ক ও অভিজ্ঞ আত্মীয় – যদি স্বামীর মাধ্যমে সমাধান না হয়, তাহলে একজন স্থানীয় জ্ঞানী ও সৎ আত্মীয় (যেমন: নিকটস্থ বড় ভাই, বোন, বা পারিবারিক পরামর্শদাতা) যাকে উভয় পক্ষ বিশ্বাস করে।
৩. ইসলামী স্কলার বা মুফতি – কোনো জটিল সমস্যায় শরয়ি পথে সমাধানের জন্য একজন আলেমের নিকট বিষয়টি উপস্থাপন করতে পারে।
কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যদের কাছে, বিশেষ করে যারা সমস্যা সমাধানে অক্ষম বা অপ্রয়োজনীয়, তাদের কাছে বিবরণ দেওয়া গীবতের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং তা পরিত্যাজ্য।
কুরআন-হাদিসের দিকনির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয় কিছু সন্দেহ গুনাহ। আর তোমরা গুপ্তচরবৃত্তি করো না এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি নিজ মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করে? তোমরা তো তা ঘৃণাই করো। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২)
হদিসে এসেছে:
“তোমরা গীবত থেকে বেঁচে থাকো; কেননা গীবত শয়তানের জঘন্য কাজ ও হারাম।” (আবু দাউদ, হাদীস: ৪৮৭৪)
হানাফি ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার (৯/৩০-৩৪) – গীবতের সংজ্ঞা ও জায়েয স্থান।
- ফাতাওয়া শামী (৯/৫৫-৫৯) – বিশেষ করে পরিবারের মধ্যে সমস্যা বলার বিধান।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী, ৪/২৭০-২৭৫) – স্ত্রীর জন্য স্বামীকে তার পরিবারের কথা বলা বৈধ।
- বেহেশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, গীবত অধ্যায়) – গীবতের ব্যতিক্রম উল্লেখ আছে।
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী, ৩/৩৪৫-৩৪৬) – পরিবারের সমস্যা স্বামীকে বলা জায়েয।
- আল-হিদায়া (গীবত বিষয়ক অনুচ্ছেদ)
সারসংক্ষেপ
স্ত্রী যদি তার স্বামীর পরিবারের কোনো বিরক্তিকর বিষয় স্বামীকে সমাধান,সংশোধনের জন্য জানায়, তাহলে তা গীবত নয়; বরং বৈধ ও প্রয়োজনীয়। তবে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অন্যদের কাছে তা বলা গীবত হবে। গীবত হলে তওবা করবে এবং সম্ভব হলে ব্যক্তির কাছে মাফ চাইবে। সমস্যা বলার জন্য স্বামীই প্রথম ও প্রধান ব্যক্তি, তারপর একজন যোগ্য পরামর্শদাতা বা আলেম।
والله أعلم بالصواب