বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছেদ প্রসঙ্গে
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
জাঝাকুমুল্লহু খইরন
আমার বিয়ে হয় ২০২৪ এর আগস্টে। পরবর্তীতে অক্টোবর মাসে আমার ভাই আমার স্বামীর ল্যাপটপে দেখতে পায় অনেক মেয়েদের সাথে চ্যাটিং করা। আমাকে স্ক্রিনশট পাঠায়, আমি আমার স্বামীকে বলি সে স্বীকার করে এবং বলে আনার ভুল হয়ে গেছে মাফ করে দাও। সেসময় আমার ননদ, আমার ভাই আর আমি জানতাম বিষয় টা, পরিবারে আর কাউকে জানায়নি কারন ভাবছি একবার এরকম হয়, সে আমাকে আল্লাহর কসম বলে প্রতিশ্রুতি দেয় আর আমি সেটা বিশ্বাস করে আগাতে থাকি। তারপর ২০২৬ এর মার্চে আমার ভাই আবার দেখে তার আলাদা ফেচবুক আইডি কিন্তু প্রমাণ না রাখায় তাকে বললে সে অস্বীকার করে। আমিও মেনে নেই ,পরবর্তীতে গত মে মাসে আমার স্বামী আসে রাজশাহী। সে ঢাকায় থাকে আর আমি রাজশাহী তে থাকি। আসে ২ দিনের জন্য, যাওয়ার দিন ভুলে ফোন রেখে যায়। আমি পরবর্তীতে ফোনে দেখতে পারি অনেক মেয়েদের সাথে খারাপ খারাপ চ্যাটিং করা। আমি তাকে জানাই সে স্বীকার করে এবং মাফ চায় আবার রাজশাহী আসে,। তার সাথে অনেক তর্ক হয়,,, আমি তার পরিবারের মা বাবা চাচা মুরুব্বিদের এই বিষয় টা জানাই তারা শাসন করে এবং বলে তারা তাকে বুঝাবে আর আমার পরিবারে না বলতে। কিন্তু আমি আমার মা বাবা কে জানাই বিষয়টা, তখন আমার মা বাবা সিদ্ধান্ত নেয় সেখানে রাখবে না,,আমি আমার স্বামী , শাশুড়ী কে বিষয় টা জানাই। পরবর্তীতে ৩ দিনের মতো তারা আর কল দেয় নি আমাকে, আমি আমার স্বামী কে বলি আমার বাড়িতে কল দিতে কিন্তু সে বলে লজ্জায় সে আর কথা বলতে পারবে না। তার পরিবারো একই কথাই বলে, তারপর আমি বাসায় যাই আমার বাড়ি থেকে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেয়। আমি তখন কিছুদিন সময় নেই আমার বাবা মায়ের কাছে। আমার স্বামী কে বিষয় টা জানাই,, সে রাজি হয় আমার বাড়িতে কথা বলতে,আমার বাবা কে কল দেয় কিন্তু রিসিভ করে নি,আমার মা কে কল দেয় আমার মা বলে অভিভাবকের কথা ছাড়া আমি কিছু বলতে পারছি না। পরবর্তীতে আমার চাচা শ্বশুর আমার বাবাকে কল দেয় অনেক কথা হয় বোঝায় কিন্তু আমার বাবার কথা তখন লিখিত আমাদের ডকুমেন্ট করে দিতে হবে। পরবর্তীতে যদি এই কাজে জড়িত হয় আর সেটার প্রমাণ থাকে তাহলে কোর্টের দ্বারস্থ হতে হবে আর টাকার পরিমান উল্ল্যেখ থাকবে। তখন আমার চাচা শ্বশুর বলেন এসব করলে উনি এই বিষয়ে থাকবেন না কারন তার মুখের কথার তো দাম রাখলাম না। পরে আমার স্বামী কে বলি তোমার কি মতামত সে বলে বাড়ি থেকে যেটা বলছে সেটা। এই অবস্থায় ছিলো। পরে কথা হলে আমার স্বামী বলে লিখিত নিয়ে যদি সংসার করতে হয় সে আরো খারাপ হবে। আমি যেনো তাকে মাফ করে দিয়ে সুন্দর করে সংসার টা শুরু করি। আমি বলি আমার বাবা মা যেটা বলছে ওটা করতে হবে, তখন বলে তাহলে যেনো তাকে ডিভোর্স দেই এবং তাকে যেনো আর এই সম্পর্কে কোনো কল মেসেজ না দেই। তারপর আমি চুপ ছিলাম, ১ দিন পর কথা হয়। আমি তাকে সব বুঝিয়ে বলি কেনো আমার বাবা মা লিখিত চাচ্ছে তখন সে রাজি হয় লিখিত দিতে। কিন্তু সকালে উঠেই সে মত পরিবর্তন করে ফেলে বলে যে, সেটা সে করবে না কারন তার পরিবার থেকে নিষেধ করছে। আর আমার স্বামী বারবার আমাকে বলে তুমি না থাকার কারনে এটা হয়, তুমি থাকলে এরকম হবে না। আমি জানি এটা হারাম কাজ, এই কথা শুনে আমি ভাবি তাহলে সব কিছু আবার শুরু করি, তাকে আমি কল দিয়ে বলি ঠিক আছে সব শুরু করি আর আমরা একসাথে থাকাও শুরু করি, আমি যেহেতু রাজশাহী তে থাকি আমার আর একটা সেমিস্টার আছে এটা এখানে একসাথে থেকেই দেই, আর সে ঢাকায় যেহেতু প্রাইভেট চাকরি করে বেশি বেতনের না তাই ভাবলাম রাজশাহীতেই সেটা ম্যানেজ হয়ে যাবে আমরা এখানেই থাকি,, আর সেও সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিক এখন থেকে তারপর আমরা এক জয়গায় সেটেল্ড হবো। কিন্তু সে বলে না রাজশাহী তে থাকবো না। আমরা চুয়াডাঙ্গায় থাকবো গ্রামে আর আমি ব্যবসা করবো। আমি তখন সেটাতেও রাজি হই,আর সে আমাকে তখন বলে এখন কেনো আসছো? আর যদি আসোই তাহলে সবাইকে জানালে কেনো? এতো কিছু করলে কেনো? এখন আমি তোমাকে গ্রহন করবো কি না দেখো!! এরকম করে দুইদিন কথা হয়।। পরে আমার রাগে আর জিদে তাকে দেখানোর জন্য আমিও কথা বলি কয়েকটা ছেলের সাথে, তার কাছে পাসওয়ার্ড ছিলো সে এটা দেখতে পারে, পরে আমাকে বলে তুৃমি এটা কেনো করলে? তখন আমিও বলছি তোমাকে কষ্ট টা বোঝানোর জন্য। দেখো, আর একজন কথা বললে কিরকম অনুভূতি হয়? পরে সে বলে আমার সাথে সংসার করার দরকার নেই।আমার বাবা মা কে কল দিয়ে কান্না করে আমার সবকিছু বলে আর এটাও বলে কাগজ পাঠায় দিয়েন। তারপর আমি তাকে বুঝাই কেনো এটা করছি, সে পরবর্তীতে বুঝে। তারপর এখন সে কল দিচ্ছে আর বলতেছে দেখো আমি সেই পথে নেই জানি ওটা খারাপ, আর আমাকে বলতেছে তোমার প্রতি আমার ক্ষোভ,
তুমি বাড়াবাড়ি করছো, আমি লয়াল হবো, সত্য কথা বলবো, নামাজ পড়বো, কিন্তু তোমাকে কষ্ট দিবো। কারন তুমি আমার মান সম্মান নষ্ট করছো,, আর তোমার পরিবারের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখবো না কারন তারা আমার চাচা বাবা মাকে সম্মান করে নি। আমরা আবার সুন্দর করে সবকিছু শুরু করি, এভাবে বলে আমাকে। আমার বাবা মা কে বলি সব তারা এটাতে রাজি না,তারা ভয় পাচ্ছে ,, তারা আমাকে দোষারপ করছে। তাদের মন অসন্তোষ, আর তারা বরাবরি চাচ্ছে আলাদা হয়ে যাই।কিন্তু আমার মনে হচ্ছে সে যদি আসলেই ভালো হয়ে গেছে তাহলে তো সমস্যা নেই।এখন আমি বুঝতেছি না ভালো হয়েছে কি না? আমার বাবা মা বিচ্ছেদের কথা বলতেছে,।এখন আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না আসলেই ১. কোন পথ টা তে যাবো? ২. বাবা মা সম্পর্ক থাক এটা চাচ্ছে না। এক্ষেত্রে আমার করণীয় কি?
আজকে আমার শাশুড়ি কল দিয়ে বলতেছিলো তোমরা একসাথে থাকো ঢাকায় বাসা নাও, আমার স্বামী ও এটাতে রাজি
Answer
উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
প্রশ্নকারী বোনের জন্য আমাদের দু‘আ। দীর্ঘ সংকটময় বৈবাহিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ইসলামী সমাধান জানতে চেয়েছেন। আমরা হানাফী ফিকহের আলোকে নিম্নোক্ত উত্তর প্রদান করছি।
সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা:
স্বামী একাধিকবার নারীদের সাথে অবৈধ চ্যাটিং ও সম্পর্কে জড়িত হয়েছে, যা স্পষ্ট হারাম ও কবীরা গুনাহ। স্ত্রী তাকে ক্ষমা করে বহুবার সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু সে বারবার একই কাজ করেছে। পরে স্ত্রীর পরিবার লিখিত শর্ত চাইলে সে রাজি হয়েও পরে অস্বীকার করে। বর্তমানে সে স্ত্রীকে বলছে— “আমি নামায পড়বো, সত্য বলবো, কিন্তু তোমাকে কষ্ট দেবো” এবং “তোমার পরিবারের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখবো না”। এ ধরনের বক্তব্য প্রকৃত তাওবার লক্ষণ নয়।
১. কোন পথটি গ্রহণ করা উচিত?
ইসলামে বিবাহ অটুট রাখতে উৎসাহিত করা হয়েছে, কিন্তু যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চরম অশান্তি হয় এবং স্বামী ক্রমাগত হারাম কাজে লিপ্ত থাকে ও সংশোধন না হয়, তাহলে পৃথক হওয়া জায়েয। নিম্নলিখিত দিকগুলো বিবেচনায় নেয়া জরুরি:
- স্বামীর অনুতাপ ও বাস্তব পরিবর্তন: বারবার একই গুনাহ করা এবং পরে “তোমাকে কষ্ট দেবো” বলা প্রমাণ করে তার অন্তরে এখনও সংশোধন হয়নি। প্রকৃত তাওবার লক্ষণ হলো— পূর্বের গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা, লজ্জিত হওয়া এবং ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প। (বাহিশতী জেওর, কিতাবুত তাওবা)
- স্ত্রীর প্রতি হুমকি: “তোমাকে কষ্ট দেবো” বলা জুলুম। নবী ﷺ বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে নিজ পরিবারের জন্য সর্বোত্তম।” (তিরমিযী)
- স্ত্রীর পরিবারের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের হুমকি: শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাও গুনাহ। তা বৈবাহিক জীবনে আরও অশান্তি ডেকে আনবে।
সিদ্ধান্ত:
- যদি স্বামী সত্যিই তাওবা করে এবং স্ত্রীকে কষ্ট না দেয়ার, পরিবারের সাথে সম্পর্ক রাখার এবং হারাম সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয় (যা কোরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক ওযীফা হিসেবে গণ্য হবে), তাহলে পুনর্মিলনের চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে স্ত্রীকে অবশ্যই বুঝতে হবে— স্বামী এখনও পুরোপুরি বদলায়নি।
- অন্যথায়, যদি স্বামী তার আচরণ না বদলায় এবং বারবার একই পথে ফিরে যায়, তাহলে স্ত্রীর জন্য খুলা বা তালাক গ্রহণ করা জায়েয। স্ত্রী স্বামীকে মোহর বা কিছু অর্থ ফিরিয়ে দিয়ে সম্পর্ক বিচ্ছেদ করতে পারে। (সূরা বাকারা ২:২২৯; রদ্দুল মুহতার, ৩/৪৫৪)
বর্তমানে স্বামী “লিখিত চুক্তি” করবে না বলে অটল, অথচ শর্তহীনভাবে সুযোগ চায়— এটি তার অনুতাপের গভীরতা সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করে।
২. বাবা-মায়ের অভিমত ও করণীয়
- বাবা-মা মেয়ের মঙ্গল চান এবং স্বামীর পুনরায় গুনাহ করার আশঙ্কায় বিচ্ছেদ চাচ্ছেন। এটি তাদের স্বাভাবিক অভিভাবকত্ব। তবে ইসলামে বাবা-মা জোর করে মেয়েকে তালাক দিতে বাধ্য করতে পারেন না, বরং পরামর্শ দিতে পারেন।
- স্ত্রী যদি মনে করে স্বামী আসলেই বদলে গেছে এবং সে আবার গ্রহণ করতে চায়, তবে তার জন্য বাবা-মাকে বোঝানো জরুরি। উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার জন্য দ্বীনদার মুরুব্বী বা ইসলামী পরামর্শদাতা (কাজী/মুফতি) নিয়োগ করতে পারেন।
- তবে স্ত্রী যদি দেখে স্বামীর মধ্যে সত্যিকারের পরিবর্তন নেই, তাহলে বাবা-মায়ের কথাকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়। বরং তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো উচিত। নবী ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি পিতামাতার অবাধ্য হয়, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (আবু দাউদ) – তবে এখানে অবাধ্যতা সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সাথে সম্পর্কিত নয়; বাবা-মা যদি শরীয়ত সম্মত কিছু বলেন, তা মেনে চলা উত্তম।
সার্বিক পরামর্শ:
- স্বামীকে একটি চূড়ান্ত সময় দিন (যেমন ১-২ মাস) এবং দেখুন তিনি সত্যিই তার আচরণ পরিবর্তন করেন কিনা। স্ত্রী নিজেও তার পূর্বের ভুল (ছেলেদের সাথে চ্যাটিং) থেকে তাওবা করুন।
- ইস্তেখারা করুন— আল্লাহর কাছে হেদায়েত চান। সহীহ উপায়ে ইস্তেখারা পড়ুন এবং নিজের অন্তরের শান্তি ও প্রবণতা লক্ষ্য করুন।
- যদি স্বামী লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি না হয় এবং বারবার মিথ্যা বলতে থাকে, তাহলে বিচ্ছেদই উত্তম। স্ত্রী তখন স্বামীকে খুলা বা তালাক দিতে পারেন।
- বর্তমানে শাশুড়ি ও স্বামী যদি ঢাকায় একসাথে থাকতে বলেন, তা যদি স্ত্রীর জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক হয় এবং স্বামী পূর্বের গুনাহ থেকে বিরত থাকে, তাহলে সে প্রস্তাব শর্তসাপেক্ষে গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে সুবিধা হলো— স্ত্রী স্বামীর ওপর নজর রাখতে পারবেন।
করণীয়:
একজন নির্ভরযোগ্য আলেম বা ইসলামী কাউন্সেলরের শরণাপন্ন হোন যিনি উভয় পক্ষের কথা শুনে শরীয়ত সম্মত সমাধান দিতে পারবেন। একা এই জটিল সমস্যার সমাধান করা কঠিন।
উল্লেখযোগ্য হাদীস ও ফিকহি গ্রন্থ:
- সূরা নিসা ৪:৩৫ – স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ থাকলে দুই পক্ষের পরিবার থেকে সালিশ নিযুক্ত করা।
- সহীহ বুখারী, কিতাবুত তালাক – “তোমাদের নারীদের কাছে ভালো ব্যবহার করো”।
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) – ৩/৪৫৫-৪৬০, খুলা ও তালাকের বিবরণ।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) – ২/৪৯০, স্বামীর দুর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অধিকার।
- বাহিশতী জেওর (১০ম অধ্যায়) – স্বামী-স্ত্রীর কর্তব্য ও সমস্যা সমাধান।
*আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফীক দিন এবং আপনার সংসারে শান্তি দান করুন। আমীন।