শবে বরাতের নামাজ বা লাইলাতুল আশুরার নামাজ নিয়ে প্রশ্ন
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: শবে বরাত (১৫ শাবান) ও লাইলাতুল আশুরার নামাজের হুকুম
প্রশ্নকারী দুইটি বিষয় উল্লেখ করেছেন: “শবে বরাতের নামাজ” এবং “লাইলাতুল আশুরার নামাজ”। প্রকৃতপক্ষে ইসলামি পরিভাষায় ‘লাইলাতুল আশুরা’ বলে কিছু নেই। আশুরা হলো ১০ মহররমের দিন, সেটি রাত নয়। সম্ভবত প্রশ্নকারী লাইলাতুল বরআত (শবে বরাত) ও আশুরার দিনকে একত্রে আলোচনা করতে চেয়েছেন। অথবা ‘লাইলাতুল আশুরা’ বলতে ১০ মহররমের রাতকে বুঝানো হয়েছে—কিন্তু সেটির কোনো বিশেষ ফজিলত হাদিসে বর্ণিত হয়নি। তাই আমরা পৃথকভাবে উত্তর দেব।
১. শবে বরাত (১৫ শাবানের রাত) ও তার নামাজ
ক. হাদিসের অবস্থান:
শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে সহিহ হাদিস বিদ্যমান। যেমন—
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “অর্ধ শাবানের রাতে (শবে বরাতে) আল্লাহ তাআলা তার সৃষ্টির দিকে বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষী ব্যতীত সবাইকে মাগফিরাত দান করেন।”
(সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৫৬৬৫; শুআবুল ঈমান, বায়হাকি)
তবে নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাতবিশিষ্ট নামাজ (যেমন ১০০ রাকাত বা ১২ রাকাত) শবে বরাতের জন্য প্রমাণিত নয়। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এই রাতে সাধারণ নফল নামাজ পড়তেন, কিন্তু কোনো বিশেষ পদ্ধতি বা নির্ধারিত রাকাতের উল্লেখ নেই।
খ. হানাফি ফিকহের মতামত:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ) ও তার সঙ্গীগণ শবে বরাতে ইবাদতকে উৎসাহিত করেছেন, তবে বিশেষ নামাজের কোনো ব্যবস্থাপত্র দেননি।
- ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ) ‘রদ্দুল মুহতার’ (২/৫৬) এ লিখেছেন: “শবে বরাতে জামাতের সঙ্গে বিশেষ নামাজ পড়া বিদআত। তবে ব্যক্তি নিজে একাকী নফল নামাজ পড়তে পারে।”
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ) ‘জাওয়াহিরুল ফিকহ’ (১/৩৮৪) এ বলেন: “শবে বরাতে নির্ধারিত সংখ্যার নামাজ (১০০ রাকাত) প্রমাণিত নয়; তা পরিত্যাগ করাই উত্তম। বরং সাধারণ নফল, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও ইস্তিগফার করা উচিত।”
- মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) ‘ফাতাওয়া উসমানি’ (২/২১০)-এ উল্লেখ করেন: “শবে বরাতে বিশেষ নামাজের কোনো সহিহ হাদিস নেই। তবে নফল নামাজ (তাহাজ্জুদ, চাশত, ইশরাক) সাধারণ নিয়মে পড়া জায়েজ।”
সুতরাং হানাফি মতে:
- জামাতে বা নির্দিষ্ট রাকাত গণনা করে শবে বরাতের নামাজ পড়া বিদআত (অগ্রহণযোগ্য নয়া আমল) বলে গণ্য হবে।
- ব্যক্তি নিজে একাকী নফল নামাজ (যেমন ২, ৪, ৮, ১২ রাকাত) নিয়ত করে পড়তে পারবে, তবে একে ‘শবে বরাতের নামাজ’ বলে বিশেষ বিবেচনা না করে সাধারণ নফল হিসেবে আদায় করবে।
গ. সহিহ হাদিসের আলোকে পরামর্শ:
শবে বরাতে রাত জেগে ইবাদত করা মুস্তাহাব। তবে সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো:
- ইশার পর কিছু নফল নামাজ (তাহাজ্জুদ, আউওয়াবিন) পড়া।
- কুরআন তিলাওয়াত ও তাফসির পাঠ।
- বেশি বেশি ইস্তিগফার, দরুদ শরিফ ও দুয়া করা।
- কবর জিয়ারত করা (হাদিসে এসেছে, রাসুল ﷺ এই রাতে কবরস্থানে গিয়েছিলেন)।
২. লাইলাতুল আশুরা (১০ মহররমের রাত)
ক. হাদিসে কোনো বিশেষ ফজিলত নেই:
মহররম মাস ফজিলতপূর্ণ, বিশেষ করে ১০ মহররম (আশুরার দিন) রোজা রাখা সুন্নত। কিন্তু রাতের (লাইলাতুল আশুরা) কোনো বিশেষ ইবাদত বা নামাজ হাদিসে প্রমাণিত নয়। ইমাম বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে শুধু দিনের রোজা ও সাধারণ নফল ইবাদতের কথা এসেছে, রাতের জন্য নয়।
খ. হানাফি ফিকহে মতামত:
- আল-হিদায়া ও ফাতাওয়া আলমগিরি-তে বলা হয়েছে: “১০ মহররমের রাতে বিশেষ নামাজের কোনো প্রমাণ নেই। তবে ব্যক্তি নফল নামাজ পড়তে চাইলে সাধারণ নিয়মে পড়তে পারে, কিন্তু ‘আশুরার নামাজ’ বলে নিয়ত করবে না।”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/১৫৭)-এ শাহ আব্দুল আজিজ (রহ) বলেন: “লাইলাতুল আশুরার নামাজ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এটি কোনো সহিহ হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত নয়।”
সুতরাং:
- ১০ মহররমের রাতে বিশেষ কোনো নামাজ নেই।
- শুধু দিনের রোজা ও তওবা-ইস্তিগফার করা সুন্নত।
সারসংক্ষেপ (সংক্ষিপ্ত উত্তর)
| বিষয় | সহিহ হাদিস? | হানাফি মতে হুকুম | |------|-------------|------------------| | শবে বরাতের বিশেষ নামাজ (১০০/১২ রাকাত) | না, সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয় | বিদআত; করা উচিত নয়। তবে সাধারণ নফল নামাজ (একাকী) জায়েজ। | | শবে বরাতে ইবাদত (নফল, জিকির, দুয়া) | হ্যাঁ, ফজিলতের হাদিস সহিহ | মুস্তাহাব (উত্তম) | | লাইলাতুল আশুরার (১০ মহররম রাত) বিশেষ নামাজ | না, কোনো হাদিস নেই | বিদআত; কোনো বিশেষ আমল নেই। দিনে রোজা রাখাই সুন্নত। |
হানাফি কিতাবের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার – ইবনে আবেদীন (২/৫৬)
- ফাতাওয়া উসমানি – মুফতি তাকি উসমানি (২/২১০)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া – আশরাফ আলি থানভি (২/১৫৭)
- জাওয়াহিরুল ফিকহ – মুফতি মুহাম্মদ শফি (১/৩৮৪)
- আল-হিদায়া – মারগিনানি (নফল নামাজ অধ্যায়)
- শরহ মা’আনিল আছার – ইমাম তাহাবি (হাদিসের ব্যাখ্যা)