অমুসলিমের সাথে কথা বলা, শাতিমে রাসূল সন্দেহ, এবং ওয়াসওয়াসা নিয়ে জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
★আগের উত্তরের একটা অংশ
ব্যবহারিক পরামর্শ:
(ক) স্থানটিতে যাওয়ার আগে এবং যাওয়ার সময় ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়ুন।
(খ) তার সাথে শুধু পেশাগত প্রয়োজনেই কথা বলুন, দীনের আলোচনা বা বিতর্কে যাবেন না যদি সে তা সহ্য করতে না পারে।
(গ) তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করুন। যদি কোনদিন তার মুখ থেকে নবীজি সা.-এর বিরুদ্ধে কিছু শোনেন, তবে অবশ্যই তাকে সতর্ক করুন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান।
(ঘ) যদি তার উপস্থিতিতে আপনার ওয়াসওয়াসা তীব্র হয় এবং আপনার মনস্থির না থাকে, তাহলে অন্য কোনো শিক্ষক বা স্থানে কাজ শেখার ব্যবস্থা করুন। দ্বীনের মধ্যে স্বচ্ছলতা অবলম্বন করাই উত্তম।
নতুন প্রশ্নঃ ব্যাবহারিক পরামর্শের বিষয়ের খ থেকে ঘ নিয়ে।
(খ) তার সাথে তেমন কথা বলিনা আমি এমনিতেই অমুসলিম দেখতে পারিনা।এমনিতেই কথা বললে গোনাহ বা ইমানে সমস্যা হবে কি?
(গ)সে যেহুতু নিশ্চিত শাতিমে রাসুল সাঃ না নিয়ত কি ছিলো জানিনা। তার কথা শুনলে রাগ উঠে তাকে যদি পর্যবেক্ষন না করি গোনাহ বা ইমানে সমস্যা হবে কি?
(ঘ)আমার এমনিতেই ওসওয়াসার সমস্যা আছে তাকে দেখলেই হয় এমন বিষয় না এমনিতেও ওসওয়াসা আসে সম্ভবত আমার ওসওয়াসা রোগ আছে । এখন যদি অন্য যায়গায় না গিয়ে এখানেই শিখি গোনাহ বা ইমানে সমস্যা
Answer
উত্তর: নতুন প্রশ্নের আলোকে ব্যাখ্যা ও নির্দেশনা
প্রশ্নের শুরুতে উল্লেখিত ‘ব্যবহারিক পরামর্শের’ (খ), (গ) ও (ঘ) নং পয়েন্ট নিয়ে আপনার নতুন সংশয়গুলো পরিষ্কার করে উত্তর দেওয়া হলো। প্রতিটি পয়েন্ট পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
(খ) তার সাথে কথা বললে গোনাহ বা ঈমানের সমস্যা হবে কি?
আপনি বলেছেন, আপনি অমুসলিমদের দেখতেই পারেন না, কিন্তু পেশাগত প্রয়োজন ছাড়া তাঁর সাথে কথা বলেন না। জানতে চান, এমনিতেই কথা বললে কি গোনাহ বা ঈমানের সমস্যা হবে?
উত্তর:
অমুসলিমদের প্রতি সাধারণ ঘৃণা পোষণ করা ইসলামী আকীদার অংশ মাত্র, কারণ তারা কুফরী ও শিরকের ওপর রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তাদের সাথে সদাচরণ ও বৈধ কাজের জন্য কথাবার্তা বলা নিষিদ্ধ। কুরআন ও হাদীসে অমুসলিমদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণের নির্দেশ এসেছে, যতক্ষণ না তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে।
-
কুরআন:
لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
“আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও ইনসাফ করতে, যারা তোমাদের সাথে ধর্মের ব্যাপারে যুদ্ধ করে নি এবং তোমাদেরকে বাড়ি থেকে বহিষ্কার করে নি। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালবাসেন।” (সূরা মুমতাহিনা: ৮) -
হাদীস:
এক হিন্দু মহিলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে আসতেন এবং তিনি তাঁর সাথে সদয়ভাবে কথা বলতেন। (বুখারী, মুসলিম)
হানাফী ফিকহের রায়:
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, অমুসলিমদের সাথে বৈধ ব্যবসা ও পেশাগত সম্পর্ক জায়েয। তাদের সাথে সাধারণ কথা বলাও জায়েয, যদি তাতে দীনের কোন ক্ষতি না হয়। তবে তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বা তাদের কুফরীকে সমর্থন করা নিষিদ্ধ। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৮)
আপনার অবস্থা:
যেহেতু আপনি শুধু পেশাগত প্রয়োজনেই কথা বলেন এবং তাঁর সাথে দীনের বিতর্কে যান না, তাই তা জায়েয এবং গোনাহ নয়। বরং আপনার নিজের মধ্যে অমুসলিম দেখার অসহিষ্ণুতা (যা আপনি উল্লেখ করেছেন) একটি নৈতিক ও মানসিক সমস্যা হতে পারে। তবে এটি ঈমানের সমস্যা নয়, যদি আপনার অন্তরে কুফরীর প্রতি ঘৃণা থাকে এবং আপনি ইসলামের প্রতি দৃঢ় থাকেন।
উপদেশ:
- অমুসলিমদের সাথে কথা বলার সময় শিষ্টাচার বজায় রাখুন, কিন্তু তাদের ধর্মীয় বিষয়ে সমালোচনা না করাই উত্তম।
- নিজের মন থেকে ওয়াসওয়াসা দূর করতে ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়ুন।
- তাদের দেখলে যদি তীব্র ঘৃণা বা ওয়াসওয়াসা হয়, তবে অভ্যাসগতভাবে ধৈর্য ধারণ করুন এবং সওয়াবের নিয়ত করুন।
(সারসংক্ষেপ: অমুসলিমের সাথে বৈধ কাজের জন্য কথা বলা জায়েয, গোনাহ নয়, ঈমানের সমস্যা নয়।)
(গ) তাকে পর্যবেক্ষণ না করলে কি গোনাহ বা ঈমানের সমস্যা হবে?
আপনি বলেছেন, আপনি নিশ্চিত নন যে তিনি শাতিমে রাসূল ﷺ কিনা, তাঁর নিয়ত জানেন না। তাঁর কথা শুনলে আপনার রাগ হয়। এখন যদি তাকে পর্যবেক্ষণ না করেন, তাহলে কি গোনাহ হবে?
উত্তর:
প্রথম কথা, কোনো ব্যক্তি শাতিমে রাসূল ﷺ কিনা তা জানার জন্য তার কথাবার্তা ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করা জরুরি, কিন্তু এটি আপনার উপর ফরজ নয়। যদি আপনি সুন্নী মুসলিম হন এবং তাঁর কোন স্পষ্ট কুফরী বা নবী ﷺ-এর প্রতি অশ্লীলতা শুনতে না পান, তবে তাকে শাতিম মনে করার কোন ভিত্তি নেই।
-
কুরআন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ ধারণা থেকে দূরে থাক, কারণ কিছু ধারণা গোনাহ।” (সূরা হুজুরাত: ১২) -
হাদীস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “তোমরা ধারণা থেকে বাঁচো, কারণ ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা।” (বুখারী, মুসলিম)
হানাফী ফিকহের রায়:
কোনো ব্যক্তিকে কাফির বা শাতিম সাব্যস্ত করার জন্য সুস্পষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন। সন্দেহের ভিত্তিতে তাকে অভিযুক্ত করা জায়েয নয়। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/২৫৩; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩৭)
আপনার অবস্থা:
যেহেতু আপনি তার নিয়ত জানেন না এবং সে নিশ্চিত শাতিম নয়, তাই তাকে পর্যবেক্ষণ না করাতে কোন গোনাহ নেই। তবে যদি তার থেকে সরাসরি নবী ﷺ সম্পর্কে বাজে কথা শুনতে পান, তাহলে সেটি কর্তৃপক্ষকে জানানো ওয়াজিব হবে।
উপদেশ:
- নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করুন। রাগ শয়তানের প্ররোচনা।
- যদি তার কথা শুনে রাগ আসে, তাহলে ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়ুন এবং চুপ থাকুন।
- যদি তার কথা স্পষ্ট কুফরী না হয়, তবে তাকে উপেক্ষা করুন। পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক নয়।
(সারসংক্ষেপ: তাকে পর্যবেক্ষণ না করা গোনাহ নয়, ঈমানের সমস্যা নয়। তবে যদি সুস্পষ্ট কুফরী শোনেন, তাহলে সতর্ক করা কর্তব্য।)
(ঘ) ওয়াসওয়াসা রোগ থাকা সত্ত্বেও যদি এখানেই কাজ শিখি, তাহলে কি গোনাহ বা ঈমানের সমস্যা হবে?
আপনি বলেছেন, আপনার ওয়াসওয়াসা রোগ আছে। তাকে দেখলেই ওয়াসওয়াসা আসে, আবার এমনিতেও আসে। অন্য জায়গায় না গিয়ে এখানেই কাজ শিখলে কি সমস্যা হবে?
উত্তর:
ওয়াসওয়াসা (যা মনস্তাত্ত্বিক বা শয়তানের প্ররোচনা থেকে হয়) আপনার ইচ্ছাধীন নয়। ইসলামে ওয়াসওয়াসাকে গোনাহ গণ্য করা হয় না, যদি না আপনি তা মেনে নেন বা কাজে পরিণত করেন। বরং ওয়াসওয়াসার সময় আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
-
কুরআন:
وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
“আর যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (সূরা আ’রাফ: ২০০) -
হাদীস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মতের ওয়াসওয়াসা ও মনে উদিত খারাপ চিন্তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা কাজে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে।” (বুখারী, মুসলিম)
হানাফী ফিকহের রায়:
ওয়াসওয়াসা রোগীর জন্য করণীয় হলো:
- ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়া।
- তাকে প্রভাবিত করতে না দেওয়া।
- স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করা।
(রদ্দুল মুহতার, ১/৪২৩; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৫২)
আপনার অবস্থা:
আপনার ওয়াসওয়াসা রোগ থাকা সত্ত্বেও যদি আপনি ঐ স্থানে কাজ শিখতে চান, তবে তা জায়েয। কারণ কাজ শেখা নিজেই একটি বৈধ ও প্রয়োজনীয় কাজ। ওয়াসওয়াসার কারণে যদি আপনার ইবাদত বা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়, তাহলে আপনি অন্য জায়গায় যেতে পারেন, কিন্তু তা ফরজ নয়।
উপদেশ:
- ওয়াসওয়াসা এলে ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়ুন।
- নিজেকে ব্যস্ত রাখুন।
- বিশ্বাস রাখুন, ওয়াসওয়াসা আপনার ঈমান নষ্ট করবে না, কারণ আপনি তা অপছন্দ করেন।
- যদি ওয়াসওয়াসা অত্যধিক হয়, তাহলে একজন আলেম বা মনোবিজ্ঞানীর সাহায্য নিন।
(সারসংক্ষেপ: ওয়াসওয়াসা থাকা অবস্থায় ঐ স্থানে কাজ শেখা জায়েয ও গোনাহ নয়। তবে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অন্য জায়গা বিবেচনা করতে পারেন।)
সম্পূর্ণ নির্দেশনা (সারমর্ম)
| পয়েন্ট | উত্তর | |---|---| | (খ) অমুসলিমের সাথে কথা বলা | জায়েয, গোনাহ নয়, যদি দীনি বিষয়ে সমালোচনা না হয়। | | (গ) তাকে পর্যবেক্ষণ না করা | গোনাহ নয়, তবে যদি স্পষ্ট কুফরী শোনেন, তবে সতর্ক করা প্রয়োজন। | | (ঘ) ওয়াসওয়াসা থাকা সত্ত্বেও ঐ স্থানে কাজ শেখা | জায়েয, ওয়াসওয়াসা নিজে গোনাহ নয়, কাজ শেখা বৈধ। |
মূলনীতি:
“الْأَصْلُ فِي الْأَشْيَاءِ الْإِبَاحَةُ حَتَّى يَدُلَّ الدَّلِيلُ عَلَى التَّحْرِيمِ”
“আসল নীতি হলো: প্রতিটি জিনিস হালাল, যতক্ষণ না হারামের দলিল আসে।” (ইবনে নুজাইম, আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর)
প্রাসঙ্গিক কিতাবের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): অমুসলিমের সাথে লেনদেন ও কথা বলার বিধান। (খণ্ড ৬, পৃ. ৩৮৮)
- ফাতাওয়া আলমগীরী: কাফির সাব্যস্ত করার শর্ত। (খণ্ড ২, পৃ. ২৫৩)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানবী): ওয়াসওয়াসা ও তার প্রতিকার। (খণ্ড ৪, পৃ. ৩৭)
- মা’আরিফুল কুরআন (মুফতি শফী): সূরা মুমতাহিনার তাফসীর। (খণ্ড ৮, পৃ. ৩২৮)
- উসুলুশ শাশী: জায়েয ও নাজায়েযের মূলনীতি। (পৃ. ১২৫)
আপনার জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ
- মনের রোগ নিরাময়: ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ এবং ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বেশি পড়ুন।
- দ্বীনের প্রতি সহনশীলতা: অমুসলিমদের সাথে সহাবস্থানের নীতি ইসলামে আছে। তাদের ধর্ম নিয়ে বিতর্ক বা ঘৃণা প্রদর্শন না করাই ভালো।
- উপরের সিদ্ধান্ত: আপনি যদি মনে করেন ওয়াসওয়াসার কারণে আপনার ইবাদত বা মানসিক শান্তি নষ্ট হয়, তাহলে অন্য জায়গায় কাজ শেখার ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু তা ফরজ নয়; শুধু উত্তম ব্যবস্থা মাত্র।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন এবং দ্বীনের উপর অটল রাখুন। আমীন।