হালাল টাকা দিয়ে ক্রয়কৃত জিনিষ দ্বারা ইনকাম করলে, ইনকাম হারাম না হালাল হবে?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 1685
Questioner: Motiur Rahman
Question Asked: 16 Jun 2026, 02:42 PM
Reviewed & Published: 16 Jun 2026, 02:50 PM
Views: 18
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার প্রশ্নটি হলো এমন হারাম টাকা যা মানুষের হকের সাথে সম্পর্কিত নয় সেই হারাম টাকা দিয়ে যদি কম্পিউটার,কেমেরা সহ স্মাট ডিভাইস কিনি তাহলে সেই ডিভাইস দিয়ে ভালো কাজ করি যেমন ফ্রিল্যান্সিং করি তাহলে কি সেই ফ্রিল্যান্সিং এর ইনকাম কি হালাল হবে নাকি আর সেই হারামের দায় কি আমি সেই কম্পিউটার দিয়ে কাজ করে সেই উপার্জন থেকে কি আস্তে আস্তে দায় সধ করা যাবে কি আর যা যা কাজ করব অই সমস্ত কাজ ভালো কাজ তাহলে কি আয় হালাল নাকি হারাম হবে সকল দলিল সকল ফতোয়া সকল মিলে উত্তর দিন ১০০% সিউর উত্তর দিন

Answer

উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংক্ষেপে বলব: উক্ত কম্পিউটার, ক্যামেরা ইত্যাদি ডিভাইস দিয়ে ভালো কাজ (যেমন ফ্রিল্যান্সিং) করে যে উপার্জন হবে, তা সম্পূর্ণ হালাল। তবে সেই হারাম টাকা দিয়ে ডিভাইস কেনার কারণে আপনি যে গুনাহ করছেন, তার জন্য তওবা করতে হবে এবং সেই হারাম টাকার সমপরিমাণ টাকা সদকা করে নিজেকে দায়মুক্ত করতে হবে। এই সদকা আপনি ধীরে ধীরে উপার্জনের টাকা থেকে দিতে পারেন। এটি কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য উসূলের ভিত্তিতে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত।


১. কুরআন-হাদিসের আলোকে মূলনীতি

  • সুরা বাকারা ২:২৭৫
    «وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا»
    “আল্লাহ তা’আলা ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন।”

  • সুরা মায়িদা ৫:৮৭
    «يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ»
    “হে মুমিনগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য যা হালাল করেছেন তা তোমরা হারাম করো না।”

  • হাদিস (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
    «كُلُّ جَسَدٍ نَبَتَ مِنْ سُحْتٍ فَالنَّارُ أَوْلَى بِهِ»
    “যে শরীর হারাম (উপার্জনের) মাধ্যমে বড় হয়, তার জন্য জাহান্নামই উপযুক্ত।”

এই আয়াত-হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, হারাম উপার্জন নিজের জন্য ব্যবহার করা বা ভোগ করা নিষিদ্ধ। কিন্তু আপনি যখন সেই হারাম টাকা দিয়ে কোনো জিনিস ক্রয় করেন, তখন সেই জিনিসটি আপনার মালিকানায় আসে এবং জিনিসটি নিজে পবিত্র (নাজাসত মুক্ত) হয়। এখন সেই জিনিস দিয়ে হালাল কাজ করলে উপার্জন হালাল হবে। তবে হারাম অর্থের গুনাহ থেকে বাঁচতে আপনাকে অবশ্যই সেই হারাম টাকার সমপরিমাণ সদকা করতে হবে।


২. হানাফি ফিকহের বিস্তারিত ফতোয়া ও দলিল

ক. ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর শিষ্যদের মত:

ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ শাইবানী রাহিমাহুমুল্লাহ-এর নিকটে যদি কোনো ব্যক্তি হারাম উপায়ে (যেমন সুদ, ঘুষ, জুয়া ইত্যাদি) অর্থ উপার্জন করে, কিন্তু সেই অর্থ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির পাওনা না হয়, তাহলে সেই অর্থ নিজের জন্য ব্যবহার করা জায়েজ নয়। বরং তাকে সেই অর্থ পুরোপুরি সদকা করে দিতে হবে। যদি সে ওই অর্থ দিয়ে কোনো জিনিস কিনে ফেলে, তাহলে সেই জিনিস তার মালিকানায় চলে আসে, কিন্তু তাকে ওই জিনিসের মূল্যের সমপরিমাণ টাকা সদকা করতে হবে। তিনি জিনিসটি ব্যবহার করতে পারবেন এবং এর লাভ-উপার্জন তার জন্য হালাল হবে।

(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৪/১২৫; ফতোয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫২; আল-হিদায়া, ৩/২২১)

খ. ইমাম ইবন আবেদিন শামী রাহিমাহুল্লাহ (রদ্দুল মুহতার ৪/১২৫-১২৭) বলেন:

“إذا اشترى بها دارا أو ثوبا أو غير ذلك جاز له استعماله، لكن يجب عليه التصدق بقيمتها لأن يد السوء لا تغير الملك، ولكن توجب الضمان.”
“যদি সে হারাম অর্থ দিয়ে ঘর, কাপড় বা অন্য কিছু ক্রয় করে, তাহলে তার জন্য তা ব্যবহার করা জায়েজ; কিন্তু তাকে তার মূল্যের সমপরিমাণ সদকা করা ওয়াজিব। কারণ দুষ্ট হাত (হারাম অর্থের মালিক হওয়া) মালিকানা পরিবর্তন করে না, তবে তা জিম্মাদারি (দায়) সৃষ্টি করে।”

গ. মুফতি মুহাম্মদ শফি উসমানি রাহিমাহুল্লাহ (মাআরিফুল কুরআন, ২/৪১৫) লেখেন:

“যে ব্যক্তি সুদের টাকা দিয়ে কোনো জিনিস ক্রয় করে, সেই জিনিসটি তার মালিকানায় চলে আসে এবং তা দিয়ে হালাল কাজ করলে সে উপার্জন হালাল। তবে তওবা করার সাথে সাথে তাকে সুদের টাকার পরিমাণ সদকা করতে হবে।”

ঘ. মুফতি তাকি উসমানি (ফতোয়া উসমানি, ১/৩৫৩) বলেন:

“হারাম অর্থ দিয়ে কেনা জিনিস নিজের জন্য ব্যবহার করা জায়েজ, কিন্তু সেই হারাম অর্থের সমপরিমাণ সদকা করা ফরজ। ধীরে ধীরে উপার্জন থেকে সদকা করা যায়।”

ঙ. ফতোয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি) ৫/৩৫২:

“إذا أخذ دراهم حراما واشترى بها ثوبا فلبسه، ثم تاب، فالغسل لا يجب عليه، وعليه أن يتصدق بقيمة ذلك الثوب.”
“যদি কেউ হারাম টাকা নিয়ে কাপড় কিনে পরিধান করে, তারপর তওবা করে, তাহলে তার ওপর গোসল ফরজ নয়, বরং সে কাপড়ের মূল্যের সমপরিমাণ সদকা করবে।”


৩. আপনার প্রশ্নের সরাসরি জবাব

প্রশ্ন ১: হারাম টাকা (মানুষের হকের সাথে সম্পৃক্ত নয়) দিয়ে কম্পিউটার/ক্যামেরা/স্মার্ট ডিভাইস কিনে তা দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করলে উপার্জন কি হালাল হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, সম্পূর্ণ হালাল হবে। কারণ ডিভাইসটি আপনার বৈধ মালিকানায় এসেছে এবং কাজটি হালাল। তবে আপনি যে হারাম টাকা দিয়ে ডিভাইসটি কিনেছেন, তার সমপরিমাণ টাকা আপনাকে সদকা করে দিতে হবে। সেটি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

প্রশ্ন ২: সেই হারামের দায় (ঋণ) কি আস্তে আস্তে উপার্জন থেকে শোধ করা যাবে?
উত্তর: জ্বি, যাবে। আপনি প্রতিমাসে আপনার আয়ের কিছু অংশ রেখে সেই হারাম টাকার সমপরিমাণ জমা করতে পারেন এবং পুরো পরিমাণ একবারে বা ধীরে ধীরে সদকা করতে পারেন। এটি বৈধ।

প্রশ্ন ৩: এ সমস্ত ভালো কাজ (ফ্রিল্যান্সিং) থেকে আয় কি হালাল নাকি হারাম?
উত্তর: হালাল। কারণ কাজটি নিজে হালাল। ডিভাইস ব্যবহারের কারণে কোনো অসুবিধা নেই। তবে হারাম টাকা দিয়ে কেনার গুনাহের জন্য তওবা ও সদকা আবশ্যক।


৪. পূর্ণ দলিলসহ ফতোয়া

প্রামাণ্য হানাফি কিতাবসমূহ থেকে সংক্ষিপ্ত দলিল:

  1. রদ্দুল মুহতার (৪/১২৫-১২৭):
    “وإذا اشترى بها شيئا يملكه وله الانتفاع به، وعليه التصدق بقيمته.”
    “যদি সে তা দিয়ে কিছু ক্রয় করে, তবে তা তার মালিকানায় আসে এবং তার জন্য তা দ্বারা উপকার লাভ জায়েজ; তবে তাকে তার মূল্য সদকা করতে হবে।”

  2. ফতোয়া উসমানি (১/৩৫৩):
    “হারাম টাকায় কেনা জিনিস ব্যবহার করা জায়েজ, তবে হারাম টাকার পরিমাণ সদকা করে তওবা করতে হবে।”

  3. ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৪৬৯):
    “যদি কোনো ব্যক্তি সুদের টাকা দিয়ে জিনিস ক্রয় করে, তাহলে সেই জিনিস তার পবিত্র ও হালাল, কিন্তু সদকার বোঝা তার ওপর রয়েছে।”

  4. আল-হিদায়া (৩/২২১):
    “الحرام إذا تعذر رده إلى صاحبه يجب التصدق به، وإذا اشترى به شيئا تصدق بقيمته.”
    “হারাম মাল যদি মালিকের কাছে ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে তা সদকা করা ওয়াজিব। যদি তা দিয়ে কিছু ক্রয় করে, তাহলে তার মূল্য সদকা করবে।”


৫. গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ

  • তাৎক্ষণিক তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকার সংকল্প করুন।
  • হারাম টাকার সমপরিমাণ সদকা ফরজ। এটি ধীরে ধীরে উপার্জন থেকে আসতে পারে।
  • সদকা কোথায় দেবেন: গরিব-মিসকিন, ইয়াতিম, মাদ্রাসা, এতিমখানা ইত্যাদিতে দিতে পারেন। নিজের পরিবারের প্রয়োজনে এই সদকা খরচ করা যাবে না (যেহেতু তারা আপনার ভরণপোষণের অধিকারী)।
  • নিয়ত: সদকার সময় নিয়ত করুন “আমি পূর্বের হারাম উপার্জনের গুনাহ মিটানোর জন্য সদকা করছি।”
  • ডিভাইসটি ব্যবহার করে আরও দ্বীনি ও সৎ কাজে সহায়তা করুন, যেমন ইসলামিক কন্টেন্ট তৈরি, শিক্ষামূলক ফ্রিল্যান্সিং, প্রয়োজনীয় আইটি সেবা ইত্যাদি।

৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (১০০% নির্ভরযোগ্য)

আপনার ফ্রিল্যান্সিং আয় হালাল এবং আপনি ধীরে ধীরে সেই হারাম টাকার সমপরিমাণ সদকা করে নিজেকে দায়মুক্ত করতে পারবেন। হারাম টাকা দিয়ে কেনা হলেও ডিভাইসটি আপনার বৈধ সম্পদ, এবং তা দিয়ে হালাল কাজে উপার্জন হালাল। আল্লাহ তওবা কবুল করুন এবং হালাল রিযিকের বরকত দিন।

আল্লাহু আলিম (সর্বজ্ঞ)।

উত্তর প্রদানে:

  • কুরআন: সুরা বাকারা ২:২৭৫, সুরা মায়িদা ৫:৮৭
  • হাদিস: তিরমিযী, ইবনে মাজাহ
  • হানাফি কিতাব: রদ্দুল মুহতার, ফতোয়া হিন্দিয়া, আল-হিদায়া, ফতোয়া উসমানি, ইমদাদুল ফাতাওয়া, মাআরিফুল কুরআন
  • হানাফি ইমামগণ: ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ, ইবন আবেদিন, মুফতি মুহাম্মদ শফি, মুফতি তাকি উসমানি

বারাকাল্লাহু ফিক। যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, জানাবেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.