অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে মনের মধ্যে নিয়ত চলে আসলে করণীয় কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
উস্তায, আমার সমস্যা হলো না চাইতেও আমার মনে একেক অনাকাঙ্ক্ষিত নিয়ত চলে আসে।
১। যেমন কোনো একটা কিছু ১বার করলে মনেহয় এটা হবে তাই ১ বারের জাগায় দুবার করা হয়। ৩ বার করলে মনেহয় তালাক হবে। এমন নিয়ত চলে আসে। প্রকৃতপক্ষে আমি তা চাইনা তাও মনে মনে নিয়ত করে ফেলি।
এমন নিয়ত কি আল্লাহ কবুল করেন?
রসূলুল্লহ সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিয়্যাতের উপরই কাজের ফলাফল নির্ভরশীল। মানুষ তার নিয়্যাত অনুযায়ী ফল পাবে।
তাই এই হাদিস অনুযায়ী, আমার এই না চাইতেও নিয়ত, এমন নিয়ত কবুল হবে কিনা।
২। নিয়ত মনে মনে করতে হয় অপরদিকে মানুষ না চাইতেও কিছু ভাব, চিন্তা মাথায় চলে আসে।
নিয়ত অন্তর দিয়ে করতে হয়। শয়তানও অন্তরে ওয়াসওয়াসা দেয়। কীভাবে বুঝবো কোনটা নিয়ত আর কোনটা শয়তানরর ওয়াসওয়াসা?
৩। মনে মনে ভাব উদয় হলে বা মাথায় আসলেই সেটা নিয়ত হয়ে যায়?
৪। নাকি মনে মনে শতবার চিন্তা আসুক মাথায় হাজারবার ভাব উদয় হচ্ছে যতক্ষণ পর্যন্ত দৃঢ় সংকল্প বা ইচ্ছা না করা হয় তাকে নিয়ত বলা যাবে না।
৫। শয়তানের ওয়াসওয়াসা আর নিয়ত তো এক জিনিস না তাহলে এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বুঝিয়ে বললে মুনাসিব হতো উস্তায।
এখানে কিছু কথা অন্য এক ভাই থেকে কপি করা। আমার মনেও এমন প্রশ্ন তাই জানতে চাওয়া মিন ফাদ্বলিক।
জাযাকাল্লহু খইরন উস্তায।
Answer
وعلیکم السلام و رحمة الله و برکاته
উত্তর প্রদানে আমি সহায়তা করছি। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেকের মনে একই রকম সংশয় থাকে। নিচে হানাফি ফিকহ ও আকিদার আলোকে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।
১. অনাকাঙ্ক্ষিত মনে মনে নিয়ত (যেমন: তিনবার করলে তালাক হবে – এমন কল্পনা) কি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য?
উত্তর:
না, এই ধরনের অনিচ্ছাকৃত, ক্ষণস্থায়ী বা শুধু মাথায় আসা চিন্তাকে শরিয়তে ‘নিয়ত’ বলে গণ্য করা হয় না। নিয়ত হলো দৃঢ় সংকল্প ও ইচ্ছা; যা অন্তর থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে করা হয়। হাদিসে ‘নিয়্যাত’ বলতে সেই ইচ্ছাকে বোঝানো হয়েছে যা বাস্তবায়নের সংকল্প থাকে।
রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “নিশ্চয়ই কাজের ফলাফল নির্ভর করে নিয়তের উপর।” (বুখারি, মুসলিম)
এই হাদিসের অর্থ হলো, যে কাজই করা হোক, তার সওয়াব বা শাস্তি নির্ভর করে সেই কাজের সময় অন্তরের ইচ্ছার উপর। কিন্তু যদি কেবল মনে মনে কিছু চিন্তা আসে, অথচ আপনি তা করতে চান না, বরং তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন, তাহলে তা নিয়ত নয়, বরং শয়তানের ওয়াসওয়াসা।
হানাফি ফিকহের কিতাব থেকে:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): “নিয়ত হলো অন্তরের দৃঢ় সংকল্প, আর ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের প্ররোচনা, যা সিদ্ধান্তে রূপ নেয় না।”
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তকি উসমানি): “মনের মধ্যে ক্ষণস্থায়ী চিন্তা আসা নিয়ত নয়। যদি কেউ নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মনে মনে কিছু ভেবে ফেলে, তাতে কোনো বিধান প্রয়োগ হয় না।”
সুতরাং, আপনি যে «একবার করলে মনে হয় এটা হবে তাই দুবার করি, তিনবার করলে তালাক হবে» – এই চিন্তাগুলো যদি শুধু মাথায় আসে এবং আপনি তা করতে চান না, তাহলে সেগুলো নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে না। আল্লাহ এগুলো ধরবেন না, ইনশাআল্লাহ।
২. নিয়ত আর শয়তানের ওয়াসওয়াসার পার্থক্য কীভাবে বুঝব?
পার্থক্যের মূলনীতি:
- নিয়ত: একটি স্থির ইচ্ছা, যা আপনি সচেতনভাবে এবং দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ করেন। যেমন: “আমি নামাজ পড়ব”, “আমি রোজা রাখব”। নিয়ত করলে আপনি সেই কাজ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন।
- ওয়াসওয়াসা: এমন চিন্তা যা আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বারবার আসে, আপনি তা অপছন্দ করেন, এবং তা করতে ভয় পান। ওয়াসওয়াসা সাধারণত শয়তান থেকে আসে, যা আপনার মনে সন্দেহ, ভয় বা খারাপ চিন্তা তৈরি করে।
হানাফি আলিমদের বক্তব্য:
- বাহিশতি জেওয়ার (আশরাফ আলী থানভি): “যখন কোনো চিন্তা আসে এবং আপনি তা প্রতিরোধ করতে চান, বুঝে নিন এটি ওয়াসওয়াসা। আর যদি আপনি তা করতে ইচ্ছুক হন এবং প্রয়োগের সংকল্প করেন, সেটি নিয়ত।”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: “যে চিন্তা অন্তরে এসে যায় কিন্তু আপনি তা অপছন্দ করেন এবং সাথে সাথে তা দূর করতে চান, সেটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। এজন্য কোনো গুনাহ হবে না। বরং এর প্রতিরোধে সওয়াব রয়েছে।”
সহজ উপায়:
- নিয়ত: আপনি বলেন “আমি এটা করব”, এবং আপনার মধ্যে তা করার দৃঢ়তা থাকে।
- ওয়াসওয়াসা: আপনি বলেন “আমি এটা করতে চাই না”, কিন্তু চিন্তা বারবার আসে।
আপনার বর্ণিত উদাহরণ (তিনবার করলে তালাক হবে – এমন চিন্তা) স্পষ্টতই ওয়াসওয়াসা, কারণ আপনি তা মানতেও চান না, বরং এতে ভয় পান।
৩. মনে মনে ভাব উদয় হলেই কি তা নিয়ত হয়ে যায়?
না, তা হয় না।
নিয়ত হওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্প ও ইচ্ছা আবশ্যক। শুধু মাথায় কোনো ভাব আসা বা চিন্তা উদয় হওয়াকে নিয়ত বলা হয় না।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে:
- আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” (সূরা বাকারা: ২৮৬)
- রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “আমার উম্মতের অন্তরে যা আসে (যা তারা উচ্চারণ করে না বা কাজে পরিণত করে না) তা আল্লাহ মাফ করে দেন, যতক্ষণ না তারা তা কাজে পরিণত করে বা কথা বলে।” (বুখারি, মুসলিম)
হানাফি ফিকহ:
- শরহু মাআনিল আসার (তাহাবি): “নিয়ত অন্তরের কাজ; এটি সিদ্ধান্ত ও সংকল্পের নাম, ক্ষণস্থায়ী চিন্তার নাম নয়।”
- ফাতাওয়া আলমগিরি: “যদি কেউ মনে মনে কোনো কথা ভাবে কিন্তু দৃঢ় সংকল্প না করে, তা নিয়ত হবে না।”
সুতরাং, আপনার মাথায় যে চিন্তা আসে, সেটা যতবারই আসুক, যতক্ষণ আপনি তা করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত না নিচ্ছেন, ততক্ষণ তা নিয়ত নয়।
৪. মনে মনে শতবার চিন্তা আসলেও কি নিয়ত হয় না?
হ্যাঁ, হয় না।
শর্ত: নিয়ত হতে গেলে অন্তরে ইচ্ছা ও সংকল্প দৃঢ় হতে হবে। বারবার চিন্তা আসা শুধু মানসিক প্রক্রিয়া, নিয়ত নয়।
উদাহরণ: ধরুন, আপনি কাউকে তালাক দিতে চান না, কিন্তু শয়তান বারবার মনে এ চিন্তা ফেলে: “তালাক বলো, তালাক বলো…” আপনি তা প্রতিরোধ করছেন। এখানে নিয়ত হচ্ছে না। বরং আপনি যদি একবারও দৃঢ়ভাবে ইচ্ছা করেন “আমি তালাক দেব”, তাহলে সেটা নিয়ত হবে।
ফাতাওয়া উসমানি থেকে: “নিয়তের জন্য অন্তরের সিদ্ধান্ত জরুরি। শুধু ধারণা বা কল্পনা যথেষ্ট নয়।”
তাই আপনার ওয়াসওয়াসা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। আল্লাহ তায়ালা নিয়তের বিনিময় দেন, কল্পনার নন।
৫. শয়তানের ওয়াসওয়াসা ও নিয়তের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য
| নিয়ত | ওয়াসওয়াসা | |-----------|----------------| | দৃঢ় ইচ্ছা ও সংকল্প | ক্ষণস্থায়ী চিন্তা, যা বিরক্তিকর ও অপছন্দনীয় | | ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রহণ করা হয় | অনিচ্ছাকৃতভাবে মাথায় আসে | | স্থির থাকে, কাজে পরিণত করার সম্ভাবনা থাকে | বারবার বদলায়, কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না | | ব্যক্তি তা করতেই চায় | ব্যক্তি তা অপছন্দ করে এবং প্রতিরোধ করে | | আল্লাহর কাছে হিসাব হবে (ভালো বা মন্দ) | আল্লাহ মাফ করে দেন, কারণ এটি শয়তানের প্ররোচনা |
আলিমদের উক্তি:
- ইবনে আবিদীন (রদ্দুল মুহতার): “নিয়ত হলো অন্তরে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। আর ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের ফিসফিসানি, যা অন্তরে সন্দেহ ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে।”
- আশরাফ আলী থানভি (বাহিশতি জেওয়ার): “ওয়াসওয়াসার চিহ্ন হলো, আপনি তা করতে ভয় পান এবং চান না। নিয়তের চিহ্ন হলো, আপনি তা করতে প্রস্তুত বোধ করেন।”
আপনার বর্ণিত সমস্যাগুলো স্পষ্টতই ওয়াসওয়াসা। তাই আপনি তা উপেক্ষা করুন, আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান এবং নিশ্চিত থাকুন যে এগুলোর কোনো প্রভাব আপনার ঈমান বা আমলে পড়বে না।
প্রয়োজনীয় নির্দেশনা (উপসংহার):
-
ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার উপায়:
- “আ’উযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম” পড়ুন।
- এই চিন্তাগুলোতে মনোযোগ দেবেন না, বরং এড়িয়ে চলুন।
- বিশ্বাস রাখুন, আল্লাহ আপনার প্রকৃত নিয়তই দেখেন, ওয়াসওয়াসা নয়।
-
নিয়তের ব্যাপারে সতর্কতা:
- কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে (যেমন তালাক, শিরক, কুফর) যদি মনে মনে শুধু চিন্তা আসে, তাহলে তা নিয়ত নয়। কিন্তু যদি আপনি তা করতে সক্ষম হন এবং সংকল্প করেন, তাহলে সে বিষয়ে সতর্ক থাকবেন।
- তালাকের ক্ষেত্রে ‘তিনবার করলে তালাক হবে’ – এমন ধারণা শুধু ওয়াসওয়াসা, তাই এটি তালাক নয়।
-
আল্লাহর রহমত:
আল্লাহ বলেন: “আমি মানুষের প্রতি তার চেয়ে বেশি দায়িত্ব চাপাই না যা সে সহ্য করতে পারে।” (সূরা বাকারা: ২৮৬)
আপনার এই ভয় ও ওয়াসওয়াসা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কারণ নয়। বরং এটি শয়তানের ধোঁকা। আপনি ধৈর্য ধরুন এবং দোয়া করতে থাকুন।
উস্তাযের পক্ষ থেকে পরামর্শ:
প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” বেশি বেশি পড়ুন। এতে ওয়াসওয়াসা কমবে, ইনশাআল্লাহ।
জাযাকাল্লাহু খইরান। আপনার কোন সংশয় থাকলে জানাবেন। আল্লাহ তায়ালা আপনার ওয়াসওয়াসা দূর করুন এবং আপনার নিয়তকে খালিস করুন। আমীন।