ব্যবসার মাসআলা না জানলে গুনাহ কতটুকু
Faith and Belief · Hanafi
Question
এই সব ক্ষেত্রে ব্যক্তি যদি কোন অজ্ঞতা বশত বা ইচ্ছা না করে ইলিম অন্বেষণ না করেই কোন ফরজ বা অকাট্য বিধান অস্বীকার করে তাহলে, তাকফিরের জন্য কোন কোন ক্ষত্রে তার অজ্ঞতা গ্রহণ যোগ্য হবে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মূল বিষয় হলো—যখন কোনো ব্যক্তি অজ্ঞতাবশত বা ইচ্ছা না করেও এমন কোনো বিষয়ে ইলম (জ্ঞান) অন্বেষণ না করে, যা তার জন্য জরুরি ছিল (যেমন নতুন ব্যবসা শুরু করলে ব্যবসার আহকাম জানা), ফলে সে কোনো ফরজ বা অকাট্য বিধান অস্বীকার করে বসে, তখন তাকফীর (কাফির বলার) ক্ষেত্রে তার এই অজ্ঞতা কি গ্রহণযোগ্য হবে?
হানাফী ফিকহের মূলনীতি হলো: আকীদা ও উসূল (মৌলিক বিষয়) এবং ফুরু’ (শাখাগত মাসআলা)—এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য করা হয়।
১. তাকফীরের শর্ত ও অজ্ঞতার ভূমিকা
ইসলামে কাউকে কাফির বলার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর মতে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো বিষয় অজ্ঞতাবশত অস্বীকার করে, তবে তা তাকে কাফির বানায় না, যতক্ষণ না সে জেনে-বুঝে ও হঠকারিতাপূর্ণভাবে অস্বীকার করে।
-
কুরআনের আয়াত:
﴿وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا﴾ (সূরা ইসরা: ১৫)
“আমরা শাস্তি দিই না, যতক্ষণ না রাসূল প্রেরণ করি।” -
হাদীস:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ”
(ইবনু মাজাহ, সহীহ)
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি ও জবরদস্তির কাজ ক্ষমা করে দিয়েছেন।”
তবে এই ক্ষমা শুধু গুনাহের জন্য, আর তাকফীরের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম।
২. হানাফী ফুকাহাদের মতামত
ক. ফরজ বা অকাট্য বিধানের প্রকারভেদ
হানাফী ফিকহে বলা হয়েছে:
- যে বিষয় দীনের অপরিহার্য অংশ (معلوم من الدين بالضرورة) — যেমন সালাত, রোযা, হজ্জ, জাকাত, রিবা হারাম, ব্যভিচার হারাম ইত্যাদি—এগুলো অস্বীকার করলে সাধারণত কুফর হয়, তবে শর্ত হলো, ব্যক্তি যদি মুসলিম পরিবেশে বড় হয়ে থাকে এবং তার কাছে এই শিক্ষা পৌঁছে থাকে।
- যে বিষয় অপরিহার্য নয় বরং ইজতিহাদী বা দ্ব্যর্থবোধক—সেগুলো অস্বীকার করলে কুফর হয় না, যদি না ব্যক্তি জেনে-বুঝে অস্বীকার করে।
খ. ইলম অন্বেষণ না করার কারণে অজ্ঞতা
ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.) “রাদ্দুল মুহতার”-এ (৩/২৮৭) বলেন:
“আহকামে শারইয়্যাহর মধ্যে যেগুলো জরুরি পর্যায়ের (যেমন নামায, রোযা) সেগুলোতে অজ্ঞতা গ্রহণযোগ্য নয়, কিন্তু যেগুলো জরুরি পর্যায়ের নয়, যেমন ক্রয়-বিক্রয়ের কিছু সূক্ষ্ম মাসআলা, সেখানে অজ্ঞতা ‘উযর (ওজর) হিসেবে গণ্য হবে।”
সুতরাং, ব্যবসা সম্পর্কিত ইলম অন্বেষণ করা ফরযে কিফায়া বা নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য ফরযে আইন হতে পারে। কিন্তু যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে না শিখে কোনো হারাম কাজ করে ফেলে, তাহলে সে গুনাহগার হবে, কিন্তু তাকে তৎক্ষণাত কাফির বলা যাবে না, যতক্ষণ না সে স্পষ্টভাবে জেনে-শুনে কোনো অকাট্য বিধানকে অস্বীকার করে।
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম) থেকে:
“কোনো ব্যক্তি যদি ফিকহের কোনো মাসআলা না জানার কারণে ভুল করে, তাহলে তাকে কাফির বলা যাবে না, যতক্ষণ না সে জেনে-শুনে কুরআন-হাদীসের স্পষ্ট দলিলকে অস্বীকার করে বা মশকরা করে।”
৩. প্রশ্নের প্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট জবাব
প্রশ্নকারী যা বলেছেন: “কেউ নতুন ব্যবসা করতে চাইলে ব্যাবসা সম্পর্কে ইলিম অন্বেষণ জরুরি। কিন্তু সেই ব্যক্তি যদি অজ্ঞতা বশত বা ইচ্ছা না করে ইলিম অন্বেষণ না করেই কোনো ফরজ বা অকাট্য বিধান অস্বীকার করে, তাহলে তাকফীরের জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে তার অজ্ঞতা গ্রহণযোগ্য হবে?”
উত্তর:
তাকফীরের জন্য অজ্ঞতা গ্রহণযোগ্য হবে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে:
-
যদি বিধানটি ‘মা’লূম মিনাদ্দীন বি যারূরাহ’ (দীনের অপরিহার্য অংশ) না হয়—অর্থাৎ কোনো ইজতিহাদী মাসআলা বা সূক্ষ্ম ফিকহী বিষয়। যেমন, ফাসিদ ও বাতিল বাইনের পার্থক্য, কাবযের শর্ত ইত্যাদি। এগুলো অস্বীকার করলে কুফর হবে না।
-
যদি ব্যক্তি নওমুসলিম হয় বা দ্বীনের জ্ঞান লাভের সুযোগ কম পায়—তখন তাকে সদয়ভাবে শেখানো হবে, তাকফীর নয়।
(ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/২৫৭) -
যদি ব্যক্তি অস্বীকার করার সময় একান্তই অজ্ঞ থাকে এবং পরবর্তীতে জানার পর তা মানতে রাজি হয়—তবে পূর্বের অবস্থার কারণে তাকে কাফির বলা যাবে না।
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩২৫)
তবে যে ক্ষেত্রে অজ্ঞতা গ্রহণযোগ্য হবে না:
- যদি বিধানটি দীনের স্পষ্ট ও অকাট্য বিষয় হয় (যেমন রিবা হারাম, কুরআনের কোনো আয়াত অস্বীকার, নবুওয়াত অস্বীকার) এবং ব্যক্তি মুসলিম পরিবেশে বড় হয়ে সে সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েও ইচ্ছাকৃতভাবে না জেনে অস্বীকার করে, তাহলে তার অজ্ঞতা ওজর হিসেবে গণ্য হবে না এবং তাকে তাকফীরের হুকুম প্রযোজ্য হতে পারে, তবে শর্ত হলো প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
(রদ্দুল মুহতার, ৪/২২৪)
৪. সারসংক্ষেপ
- ব্যবসার মতো বিষয়ে ইলম অন্বেষণ করা জরুরি, কিন্তু তা না করার কারণে কেউ যদি কোনো ফরজ বা অকাট্য বিধান অজ্ঞতাবশত অস্বীকার করে, তাহলে সাধারণত তাকে কাফির বলা যাবে না, যতক্ষণ না সে জেনে-শুনে এবং নাছোড়বান্দা হয়ে অস্বীকার করে।
- ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) ও তাঁর অনুসারীদের নীতি: তাকফীরে অত্যন্ত সতর্কতা। অজ্ঞতা, ভুল ও বাধ্যতা—এই তিনটি বিষয় তাকফীরের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
- উপদেশ: যদি কারো মধ্যে এমন কোনো ভুল দেখা যায়, তবে তৎক্ষণাৎ তাকে শেখানোর চেষ্টা করা উচিত, তাকে কাফির বলা সম্পূর্ণ অনুচিত। ইমাম তাহাবী (রহ.) বলেছেন: “আমরা আহলে কিবলার কারো কুফরী ফতোয়া দেই না যতক্ষণ না তার কাছে স্পষ্ট প্রমাণ পৌঁছে এবং সে তা জেনে-বুঝে অস্বীকার করে।”
তথ্যসূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনু আবিদীন): ৩/২৮৭, ৪/২২৪
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী): ২/২৫৭-২৬০
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): ৪/৩২৫
- ফাতাওয়া আলমগীরী: ২/২৫৭
- শারহু মা‘আনিল আছার (ইমাম তাহাবী): ১/১২৩
- উসূলুশ শাশী: ২/১৫০
আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।
والله أعلم بالصواب