স্বামী স্ত্রীর বিষয়ে গাফেল হলে ইসলামি বিধান
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، أما بعد:
ইসলামে বৈবাহিক সম্পর্কের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দাম্পত্য শান্তি ও উভয়ের যৌন চাহিদার সঠিক পরিপূরণ। কুরআন ও হাদিসে স্বামীকে স্ত্রীর প্রতি ন্যায্য আচরণ ও তার অধিকার আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে স্ত্রীর যৌন চাহিদা পূরণ করা স্বামীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যদি স্বামী সহবাসে সক্ষম হয়েও স্ত্রীর চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয় বা সময় অল্প হয়, তবে তা স্ত্রীর জন্য কষ্টকর এবং সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। নিম্নে হানাফি ফিকহ ও আলোচ্য কিতাবসমূহের আলোকে পরামর্শ প্রদান করা হলো।
১. স্বামীর দায়িত্ব ও স্ত্রীর অধিকার
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদয়ভাবে জীবনযাপন করো।” (সূরা আন-নিসা ৪:১৯)
অন্য আয়াতে:
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“স্ত্রীদের জন্য স্বামীদের ওপর তেমনই অধিকার আছে, যেমনি স্বামীদের জন্য স্ত্রীদের ওপর অধিকার আছে, ন্যায়সংগতভাবে।” (সূরা আল-বাকারা ২:২২৮)
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই যে তার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম, আর আমি আমার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম।” (তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)
স্বামীর উপর স্ত্রীর যৌন অধিকার প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ (৩/৫৬২) এ লিখেছেন:
“স্ত্রীর জন্য স্বামীর সাথে সহবাসের মাধ্যমে যৌন তৃপ্তি লাভের অধিকার রয়েছে। স্বামী যদি বিনা ওজরে স্ত্রীকে বঞ্চিত রাখে, তবে সে গুনাহগার হবে।”
২. স্বামীর টাইমিং কম হলে করণীয়
স্বামী যদি দ্রুত সহবাস শেষ করে ফেলে যার কারণে স্ত্রীর চাহিদা পূর্ণ হয় না, তাহলে স্বামীর উচিত স্ত্রীকে অগ্রিম স্পর্শ, চুম্বন, আদর-সোহাগ ও অন্যান্য বৈধ উপায়ে উত্তেজিত করা এবং সহবাসের পর স্ত্রীর চাহিদা পূরণের জন্য হাত বা অন্য বৈধ মাধ্যম ব্যবহার করা। ইমাম কাসানি (রহ.) ‘বাদায়িউস সানায়ি’ (২/৩৩২) তে বলেন:
“স্বামীর জন্য স্ত্রীর সাথে সহবাসের পূর্বে ও পরে কামোত্তেজনামূলক স্পর্শ ও ক্রিয়া করা মুস্তাহাব, যাতে স্ত্রীর যৌন তৃপ্তি অর্জিত হয়।”
৩. স্ত্রী নিজে কী করতে পারে?
হানাফি ফিকহের সেই বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রদ্দুল মুহতার’ (৬/৩৭১) এ ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) লেখেন:
“স্ত্রীর জন্য স্বামী ছাড়া অন্য কারো দ্বারা যৌন তৃপ্তি লাভ করা হারাম। নিজের হাত দ্বারাও (মাস্টারবেশন) তা বৈধ নয়, কারণ তা ফাহিশা কাজের অন্তর্ভুক্ত। তবে স্বামী নিজ হাত বা অন্যান্য অঙ্গ দ্বারা স্ত্রীকে তৃপ্তি দিতে পারেন।”
সুতরাং স্ত্রী নিজে করণীয়:
ক) ধৈর্যধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া।
খ) স্বামীকে ভদ্রভাবে বোঝানো যে তার চাহিদা পূরণ হয়নি এবং এতে বৈবাহিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গ) স্বামীকে স্ত্রীর চাহিদার গুরুত্ব সম্পর্কে ইসলামি শিক্ষা দেওয়া।
ঘ) যদি স্বামী বোঝেন না, তাহলে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ বা আলেমের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করা।
ঙ) শেষ উপায় হিসেবে স্ত্রী খুলার (তালাকের বিনিময়ে বিচ্ছেদের) আবেদন করতে পারে, যদি স্বামী ক্রমাগত তার হক আদায় না করে।
৪. স্বামীর গাফেলি ও করণীয়
আপনার প্রশ্নে উল্লেখিত “স্ত্রীর বিষয়ে গাফেল” – অর্থাৎ স্বামী স্ত্রীর যৌন চাহিদার প্রতি উদাসীন। ইমাম শাফি (রহ.) থেকে ‘উম্ম’ গ্রন্থে বর্ণিত:
“যদি স্বামী স্ত্রীর কাছে আসতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হয়, তবে স্ত্রী ইমামের (কাজি) কাছে অভিযোগ দায়ের করতে পারে। কাজি স্বামীকে নির্দিষ্ট সময় (সাধারণত চার মাস) পর্যন্ত মেয়াদ দেবেন। এর পরেও যদি সামর্থ্য সত্ত্বেও স্বামী না আসে, তাহলে স্ত্রী তালাক চাইতে পারে।” (হানাফি মাযহাবেও এই নীতির অনুমোদন আছে – দেখুন: ‘আল-হিদায়া’, ২/২৭৫)
স্ত্রীর জন্য উত্তম পদ্ধতি হলো:
- কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া করা। যেমন দোয়া: رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ
- স্বামীকে সময় দেওয়া এবং সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করা।
- কোনো মুসলিম কাউন্সেলরের কাছে যাওয়া।
উপসংহার:
স্বামীর উচিত স্ত্রীর যৌন সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। যদি স্বামীর টাইমিং কম হয়, তবে তিনি অন্যান্য বৈধ উপায়ে স্ত্রীকে তৃপ্তি দেওয়ার চেষ্টা করবেন। স্ত্রীর জন্য ধৈর্য ও দোয়া অবলম্বন করা এবং স্বামীর সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা করা কর্তব্য। কোনো অবস্থাতেই নিজে নিষিদ্ধ পন্থা অবলম্বন করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা উভয়ের সম্পর্ক মধুর ও পরিপূর্ণ করুন। আমীন।
والله أعلم بالصواب
(আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন)