স্ত্রীর অতীত সম্পর্কের কারণে কি তালাক দেয়া যাবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার বয়স 46 বছর, নতুন বিয়ে করেছি, মেয়ের বয়স ২৫ বছর। মেয়েটা অনেক সুন্দরী, পর্দা করে উচৃচতা ৫' ৪" ইঞ্চি অনার্স ২য় বর্সে পড়ছে, অনেক গরীব। একই অফিসে জব অবস্হায় ভদ্র, বিনয়ী এবং নামাজি দেখে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পরে মেয়েটা স্বামী ভক্তি স্বামীর প্রতি ভালোবাসা শ্রদ্ধা সবকিছু শতভাগ পালন করে আসছে।
বিয়ের অষ্টম দিনে হঠাৎ করে একটা ছেলে বন্ধুর অফিসে এসে জানায় যে এই মেয়ের সাথে তার দীর্ঘ ৩ বছরের শারীরিক সম্পর্ক এবং পুর্বে আরও একজন ছেলের সাথে তার শারীরিক সম্পর্ক ছিল। আমাকে হুমকি দেখায়, ব্যাবসা দ্বংস করবে, তারা দুইজন মিলে ছবি, ও কিছু এডিটিং ভিডিওসহ আমাকে দিতে থাকে। স্তীর সরলতায় স্বীকার করে যে ওই ছেলেগুলো তাকে ব্ল্যাকমেলিং করে তার সাথে ৪ বছর সম্পর্ক করেছে এবং সে ইচ্ছায় কখনো যায়নি ব্লাক মেলিং করে তার সাথে সম্পর্ক মাঝে মাঝে করত। একজন ২ বছর পুর্বে বিদেশ গেলেে অন্যজনও ছবি ও ভিডিও আত্বীয়, বন্ধু ও ফেসবুকে ভাইরালের ভয় দেখিয়ে ২/১ মাস পরে যেতে বাধ্য করতো। সে এখন ভালো হতে চায় আমার সাথে বিয়ে হওয়াতে নিয়মিত কোরআন বুঝে পড়তে পেরেছে এখন জীবনটা বদলে গেছে, শেষ জীবনটা ভালোভাবে কাটাতে চায়, বলছে স্বামী যেভাবে চালাবে সে ভাবেই চলবে।
বাসায় কেউ না থাকায় তাকে বাসায় তালা মেরে রাখি, ভার্সিটি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি তাতেও রাজি হয়েছে, মোবাইল নিয়ে নিয়েছি, আমার নামের সিম তুলে একটা বাটন ফোন দিয়েছি তাতেও তার কোন কমপ্লেন নেই।
কিন্তু মাঝে মাঝে ওই ছেলেগুলো whats app a amar কাছে স্ত্রীর বাজে ছবি পাঠানোর কারণে স্ত্রীর সাথে খারাপ ব্যবহার করে ফেলি, বিভিন্নভাবে মেন্টাল টরচারিং হয়ে যায় এবং স্রীকে ডিভোস দিয়ে সম্পর্ক শেষ করতে চাই। বিয়ের পুর্বে মেয়েকে জিগ্গেস করেছিলাম যে কারো সাথে কোন রিলেশন আছে বা হইছিল কী না?? , কিন্তু সে বলেছিল কোন ছেলের সাথে তার কোন সম্পর্ক নাই,
এখন তার ৪ বছরের শারীরীক সম্পর্কের সকল প্রমান আমার হাতে এসেছে। আমি সম্পর্ক রাখতে চাই না মেয়েকে ডিভোর্স দিতে চাই, কিন্তু মেয়েটা আমাকে জড়িয়ে ধরে শুধু হাউমাউ করে কান্না করে অঝোর ধারায় সে চোখের পানি ফেলে, বলে আপনাকে অনেক ভাল বাসে, আপনি ডিভোর্স না দিয়ে আমাকে মেরে ফেলেন!! বলে সে লিখিত রেখে মরে যাবে এই মৃত্যুর জন্যে কেউ দায়ি নয়।
মেয়ের ভিডিও গুলো বলছে সে অনেক হাসিখুশিতেই তাদের সাথে সেক্স করেছে, যেটা কোন ভাবেই মানতে পারি না।
গভীর রাত্রে একাকী উঠে তাজ্জুত পরে কাননা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়,
আমি ডিভোর্সি, বাচ্চা নাই, মেয়েটার পেটে সম্ভবত বাচ্চা এসেছে, ১ জুন ডেট ছিল, কিন্তু পিরিয়ড অফ আছে।
আমার মাথায় যখন স্ত্রীর পিছনের সেক্স স্ক্যান্ডাল ভাসে তখন মেনে নিতে পারি না, অস্বাভাবিক হয়ে যাই, মাথা ব্যাথা করে, তবে মেয়েরা অনেক গরীব ও সরল প্রকিতির, মেয়ে অতীত গোপন করতে অনেক মিথ্যা বলে।
যাদের সাথে সমর্পক ছিলো, ছেলেগুলো ছাত্র রাজনীতি করে ও অতি ধুর্ত ও খারাপ স্বভাবের।
আমার পিক দিয়ে বিদেশের ছেলেটা আইডি খুলে ইতিমধ্যে ১০০ জন ফলোয়ার ও বানিয়েছে, এরা অনেক খারাপ আমার বাবা মা তুলে অশ্লীল গালি দেয়, এক নং ব্লক করলে অন্য নং হতে যোগাযোগ করে, আমার ২০ বছরের অফিসিয়াল নং এটা বন্ধ করা সম্ভব নয়। স্ত্রীর স্ক্যান্ডাল নিয়ে থানায় যেতে ইচ্ছে করে না, ছেলেটা বিএনপি করে।
অনেকেই বলে খারাপ চরিত্রের নারী কোন দিনও ভাল হয় না।
দয়া করে ইসলামীক পরামর্শ দিবেন। মেয়েকে কী ডিভোর্স দিয়ে চিন্তামুক্ত হবো,? উচিত কী না।?? জানাবেন।
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
উত্তর:
প্রথমেই জানিয়ে রাখি, আপনার অবস্থা অত্যন্ত কঠিন ও সংকটময়। আপনি ধৈর্য ধরে ইসলামী সমাধান জানতে চেয়েছেন, এটি প্রশংসনীয়। আমরা কুরআন ও সুন্নাহ এবং হানাফি ফিকহের আলোকে পরামর্শ প্রদান করছি।
১. স্ত্রীর অতীত ও তার তাওবা
স্ত্রী তার অতীত সম্পর্কে মিথ্যা বলেছে, যদি গোনাহকে লুকানোর নিয়তে করে থাকে, তাহলে এটাই তার করণীয় ছিলো। তাছাড়া ইসলামে তাওবা (অনুশোচনা) এমন একটি বড় নিয়ামত, যা পূর্বের গুনাহ মিটিয়ে দেয়।
কুরআনে বলা হয়েছে:
"হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করে দেন। তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার, ৫৩)
আপনার স্ত্রী এখন অনুতপ্ত, কান্নাকাটি করে, কুরআন পড়ে, নামাজ পড়ে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। এটি সৎ তাওবার লক্ষণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে তাওবা করে, সে যেন গুনাহ করেনি।" (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫০)
অতএব, তার অতীত গুনাহ যদি সত্যি সত্যি ত্যাগ করে থাকে এবং এখন সে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত, তবে তাকে সুযোগ দেওয়া ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আপনার উপর ওয়াজিব।
২. বিবাহের পর তার আচরণ
আপনি বলেছেন, বিয়ের পর স্ত্রী আপনার প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত, স্বামীভক্তি, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা সবকিছু পালন করছে। এমনকি আপনি তালা মেরে রাখা, মোবাইল নিয়ে নেওয়া, ভার্সিটি বন্ধ করা—সবকিছু মেনে নিয়েছে। এটি প্রমাণ করে সে সত্যিই পরিবর্তন চায় এবং আপনার সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী।
কুরআনে বলা হয়েছে:
"তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর। আর যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে হতে পারে তোমরা এমন কিছু অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।" (সূরা আন-নিসা, ৪:১৯)
৩. আপনার উপর চাপ ও ব্ল্যাকমেলিং
যে ছেলেগুলো আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করছে, তারা স্পষ্টতই ফাসিক ও জালিম। তাদের হুমকি ও অপকর্মের সাথে মোকাবিলা করার জন্য আপনাকে আইনি সহায়তা নেওয়া উচিত। থানায় যেতে ইচ্ছে না করলেও, ইসলামী আইন অনুযায়ী ফাসিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আপনার স্ত্রীও এদের শিকার, তাই তাকে দোষারোপ না করে বরং তাকে রক্ষা করুন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।" (বুখারি, হাদিস: ১০)
আপনার স্ত্রীকে মানসিক নির্যাতন করা বা তালাক দেওয়া ব্ল্যাকমেইলারদের জয়ী করে দেবে। বরং তাদের মোকাবিলা করুন।
একবার ভাবুন যারা আপনার মত একজন পুরুষের সাথে যা করছে, সে তো একজন অবলা ও দুর্বল নারী, তার সাথে কি ব্যবহারটাই না করেছে আপনার স্ত্রীকে নিজের বোন বা নিকটাত্মীয়র জায়গায় কল্পনা করুন,তখন তো দূরে সরিয়ে দেওয়ার কল্পনা আসবে না বরং প্রতিশোধের স্পৃহা প্রতিটি রক্তকনায় ভেসে উঠবে।
৪. তালাক দেওয়া কি উচিত?
তালাক ইসলামে হালাল, কিন্তু সর্বনিকৃষ্ট হালাল জিনিস (আবু দাউদ, হাদিস: ২১৭৮)। তালাক দেওয়ার আগে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করুন:
-
স্ত্রীর তাওবা ও পরিবর্তন: সে এখন দ্বীনের উপর আছে, কুরআন পড়ে, নামাজ পড়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"যে ব্যক্তি তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তার গুনাহকে আল্লাহ পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেন।" (সূরা আল-ফুরকান, ৭০)
তার অতীতের কারণে যদি তালাক দেন, তবে আপনি একজন সম্ভাবনাময় মুমিন নারীকে হারাবেন, যে আপনার সঙ্গেই থাকতে চায়। -
গর্ভাবস্থার সম্ভাবনা: তার পিরিয়ড বন্ধ, সম্ভবত আপনার সন্তান এসেছে। গর্ভবতী অবস্থায় তালাক দেওয়া অত্যন্ত কঠিন ও জটিল (ইদ্দতের কারণে)। এক্ষেত্রে তালাক না দেওয়াই উত্তম।
-
আপনার মানসিক অবস্থা: আপনি স্বীকার করেছেন যে তার অতীত ভেবে আপনি অস্বাভাবিক হয়ে যান, মাথাব্যথা হয়। এটি স্বাভাবিক। তবে এজন্য আপনি তাকে দোষারোপ করবেন না; বরং নিজের চিকিৎসা করুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
হানাফি ফিকহের কিতাবে এসেছে:
"স্ত্রীর পূর্বের গুনাহ যদি সে তাওবা করে ফেলে, তবে তালাক দেওয়া মাকরুহ (অপছন্দনীয়) হয়ে যায়, কারণ ইসলাম তাওবাকারীকে গ্রহণ করে।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২২৪)
অতএব, তালাক দেওয়ার পরিবর্তে নিম্নোক্ত ব্যবস্থা নিন:
৫. আপনার করণীয়
ক. ধৈর্য ও ইখলাসের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করুন:
আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারা, ১৫৩)
খ. স্ত্রীকে ক্ষমা করুন এবং তার সাথে সদ্ব্যবহার করুন:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।" (তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)
গ. ব্ল্যাকমেইলারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিন:
তাদের ছবি-ভিডিও প্রমাণসহ থানায় এফআইআর করুন। যদি বিএনপি রাজনীতির কারণে ভয় পান, তবে স্থানীয় আলেম বা গণ্যমান্য ব্যক্তির সাহায্য নিন।
ঘ. স্ত্রীর সাথে একান্তে বসে কথা বলুন:
তাকে জানান যে আপনি অতীত ভুলে যেতে চান, কিন্তু ভবিষ্যতে সে যেন সতর্ক থাকে। তার সাথে ইসলামী জীবনযাপন চালিয়ে যান।
ঙ. নিজের মানসিক চাপ কমানোর জন্য:
- বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করুন।
- রাতের বেলা তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
- বিশ্বস্ত কোনো আলেম বা মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিন।
৬. বিশেষ পরামর্শ
আপনার স্ত্রী গরীব ও সরল প্রকৃতির, অতীতে প্রতারিত হয়েছে। এখন সে আল্লাহর পথে ফিরে এসেছে। যদি আপনি তাকে তালাক দেন, তবে সে আবার সেই খারাপ পরিবেশে পড়ে যেতে পারে। বরং আপনি তাকে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার কথা স্মরণ করিয়ে দিন।
হাদিসে কুদসিতে এসেছে:
"হে আদম সন্তান! যতক্ষণ তুমি আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে আশা রাখবে, ততক্ষণ আমি তোমাকে ক্ষমা করব। আমার কাছে যত বড় গুনাহই হোক না কেন, আমি ক্ষমা করতে দ্বিধা করব না।" (তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৪০)
৭. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর: তালাক দেওয়া কখনো জায়েয হবে না।
শরিয়তের দৃষ্টিতে:
- স্ত্রী যদি সত্যিই তাওবা করে এবং এখন নেককার হয়, তবে তালাক দেওয়া মাকরুহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি)।
"ক্ষমা করাই তাকওয়ার নিকটবর্তী।" (সূরা আল-বাকারা, ২৩৭)
আপনার জন্য দোয়া করি, আল্লাহ আপনাকে সঠিক পথ দেখান এবং আপনার সংসারে শান্তি দান করুন। আমীন।
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
সূত্র:
- কুরআন (সূরা আয-যুমার: ৫৩, সূরা আন-নিসা: ১৯, সূরা আল-বাকারা: ১৫৩, ২৩৭, সূরা আল-ফুরকান: ৭০)
- হাদিস (ইবনে মাজাহ: ৪২৫০, আবু দাউদ: ২১৭৮, বুখারি: ১০, তিরমিজি: ৩৮৯৫ ও ৩৫৪০)
- রদ্দুল মুহতার (৩/২২৪)
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৫০)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৩২১)