স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে স্বামীর ফোন না ধরলে বা তার আদেশ না মানলে কি গুনাহ হবে?
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমার শারিরীক অসুস্থতার কারনে আমার হাজবেন্ড কল করলেও আমি রিসিভ করি নি। যদিও আমাকে বলেছে বেশি সময় নিবে না কিন্তু আমি আজ কথা না বলে কালকে কল করতে বলেছি। কিন্তু তিনি চাচ্ছিলেন যেন তখনই তার সাথে কথা বলি। এমতাবস্থায় আমি তার কল কেটে দিলে তিনি বলেন, "তাহলে আল্লাহর লা'নত নিয়েই ঘুমাও"।কারন তার অসন্তুষ্ট অবস্থায় আমি ঘুমাতে যাচ্ছি। উল্লেখ্য আমাদের মনমালিন্য চলছে অনেক মাস যাবত।
এক্ষেত্রে আমার জানার বিষয় হলো আসলেই কি তার অসন্তুষ্টি বা তার কথা বলতে চাওয়াকে অমান্য করে ঘুমাতে যেতে চাওয়ার কারনে কি আমি গুনাহগার হবো?
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা দরকার:
১. স্বামীর আদেশ মানার ব্যাপারে ইসলামী নির্দেশনা:
ইসলামে স্ত্রীর জন্য স্বামীর বৈধ আদেশ মানা ফরজ (ওয়াজিব), যতক্ষণ না তা আল্লাহর নাফরমানি বা শরীয়তের সীমালঙ্ঘন না হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"যদি আমি কাউকে আদেশ করতাম যে, অন্য কাউকে সিজদা করুক, তবে নারীদেরকে আদেশ করতাম তাদের স্বামীকে সিজদা করতে।" (আবু দাউদ, তিরমিযী, সহিহ)
তবে এই আদেশ মানার শর্ত হলো:
- তা যৌক্তিক ও শরীয়তসম্মত হতে হবে।
- স্ত্রীর কোনো মারাত্মক অসুস্থতা বা অপারগতা থাকলে তা ওজর (excuse) হিসেবে গণ্য হবে।
২. আপনার পরিস্থিতির বিশ্লেষণ:
আপনি শারীরিকভাবে অসুস্থ, যা একটি বৈধ ওজর। আপনার স্বামী ফোনে কথা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আপনি তার সাথে তখন কথা না বলে পরের দিন কথা বলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এটি আপনার পক্ষ থেকে অস্বীকার নয়, বরং সময় পরিবর্তনের অনুরোধ। আপনার অসুস্থতা যদি সত্যিই এমন ছিল যে আপনি কথা বলতে সক্ষম ছিলেন না (যেমন: অতিরিক্ত দুর্বলতা, ব্যথা, ঘুমের প্রয়োজন ইত্যাদি), তাহলে আপনি গুনাহগার হবেন না।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ পালনে অক্ষম, তার ওপর কোনো দায়িত্ব নেই।" (মাজমুঊল ফাতাওয়া: ২১/৬৩)
৩. স্বামীর অসন্তুষ্টি ও তার কথা:
আপনার স্বামী বলেছেন: "তাহলে আল্লাহর লা'নত নিয়েই ঘুমাও।"
এটি একটি গুরুতর কথা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"একজন মুমিনকে লা'নত দেওয়া (অভিশাপ করা) তাকে হত্যা করার মতোই (গুনাহের দিক থেকে)।" (সহিহ বুখারি: ৬১০৫)
স্বামীর উচিত ধৈর্য ধারণ করা এবং স্ত্রীর অসুস্থতা বোঝা। তার অসন্তুষ্টি থাকলেও তার উচিত নয় এমন কঠোর ভাষা ব্যবহার করা। তবে স্ত্রীর দায়িত্ব হলো যতটা সম্ভব স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখা, যতক্ষণ না তা শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন করে।
৪. আপনার গুনাহগার হওয়া বা না হওয়া:
- আপনি যদি সত্যিই অসুস্থতার কারণে এবং তার কথার প্রতি অমনোযোগী না হয়ে শুধু সময় পরিবর্তনের অনুরোধ করে থাকেন, তাহলে আপনি গুনাহগার হবেন না।
- তবে যদি আপনার অসুস্থতা ততটা গুরুতর না হয় এবং আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে তার কথা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য সময় বাড়িয়ে দেন, তাহলে তা বৈধ নয়। আপনার উচিত স্বামীর সাথে কথা বলে বিষয়টি মীমাংসা করা।
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেছেন:
"স্ত্রী যদি স্বামীর আদেশ পালনে সক্ষম হয়, তবে তা পালন করা ওয়াজিব। কিন্তু যদি তার শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতা থাকে, তবে তার ওপর কোনো গুনাহ নেই।" (শারহুল মুমতি': ১২/৩৩৯)
৫. আপনার করণীয়:
- আপনি আপনার অসুস্থতা ও বিভ্রান্তির কথা স্বামীকে সহজভাবে বোঝান।
- তার সাথে শান্তিপূর্ণভাবে কথা বলার চেষ্টা করুন এবং তার মন জয় করুন।
- আপনার অসুস্থতার কারণে যদি তার অধিকার আদায়ে অক্ষম হন, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং তিনি যেন আপনাকে আরোগ্য দেন সেই দোয়া করুন।
৬. উপসংহার:
আপনার স্বামীর কথাকে অমান্য করার কারণে যদি আপনার সত্যিই বৈধ ওজর থাকে (যেমন: শারীরিক অসুস্থতা), তাহলে আপনি গুনাহগার হবেন না। তবে স্বামীর অসন্তুষ্টি থাকলে তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা আপনার কর্তব্য।
আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন এবং আপনার বৈবাহিক জীবনে শান্তি নাজিল করুন। আমিন।
রেফারেন্স:
- সহিহ বুখারি: ৬১০৫
- আবু দাউদ: ২১৪০
- মাজমুঊল ফাতাওয়া (ইবনে তাইমিয়্যাহ): ২১/৬৩
- শারহুল মুমতি' (ইবনে উসাইমীন): ১২/৩৩৯