স্বপ্নে আযান, মহররম, ভূমিকম্প দেখার অর্থ কী?
Faith and Belief · Hanafi
Question
গতরাতে আমি স্বপ্নে দেখেছি আমি, আমার মা, খালা ও ভাগ্নেকে নিয়ে রান্নাঘরে দাড়িয়ে কোনো কিছু করছিলাম। লাইট অফ ছিল এবং রাত ছিল। তখন হঠাৎ একসাথে অনেকগুলো আযান শুরু হয়ে গেল। স্বপ্নে বুঝতে পারছিলাম যে এটা আযানের টাইম না আর মসজিদ থেকে হচ্ছে আযান। আমি তখন কারণ কি আমার মা থেকে জানতে চাইলাম তখন আম্মা বললেন যে মহররম শুরু হয়ে গেছে তাই আযান হচ্ছে মসজিদে। আমি বললাম যে এখনো মহররম মাস আসেনি। তখন খালা বললেন যে আশুরার সময় এমনই হয়। আমি উনাদের সাথে তর্ক করছিলাম যে এমন কখনো শুনিনি। হঠাৎ আমার মনে হলো হয়তো ভূমিকম্প হচ্ছে তাই আযান হচ্ছে। যদিও ভূমিকম্পের কোনো আলামত ছিল না৷ আমি তখন আমার ভাগ্নেকে কোলে নিয়ে নিলাম। ও মোটে হাটা শিখছে এখন। অনেক ছোট কিন্তু কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না ও পড়ে যায় কিনা বা ব্যথা পায় কিনা এটা নিয়ে। আমার অনেক বিরক্ত লাগছিল এটা নিয়ে এরপর ঘুম ভেঙে গেছে।
এই স্বপ্নের কোনো মানে আছে? নাকি এমনি স্বপ্ন?
জাযাকুমুল্লাহু খয়রান ফিদ্দুনইয়া ওয়াল আখিরাহ।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনার স্বপ্নটি বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। ইসলামের দৃষ্টিতে স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ বা সতর্কবাণী, (২) শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শন বা মনকে বিপর্যস্ত করা, এবং (৩) নিজের মনের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন (যাকে ‘হাদীছুন নাফস’ বলে)। আপনার বর্ণিত স্বপ্নটি দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রকারের হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ স্বপ্নে আপনি যা দেখেছেন—আযানের অসময়ে আযান, মা-খালার অমূলক কথা, ভূমিকম্পের আশঙ্কা—এসব বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এবং এতে উদ্বেগ ও বিরক্তির সৃষ্টি হয়েছে।
হানাফি ফিকহ ও ফতোয়ার আলোকে নির্দেশনা:
-
স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়া সাধারণের কাজ নয়:
বড় বড় উলামায়ে কেরাম (যেমন ইবনে আবেদীন, ইমদাদুল ফতোয়া, ফতোয়া উসমানি) স্বপ্নের ব্যাখ্যাকে বিশেষ ইলম বলে গণ্য করেছেন। সাধারণ মানুষের উচিত স্বপ্ন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করা, বিশেষত যদি এটি অশুভ বা বিভ্রান্তিকর হয়। (রদ্দুল মুহতার, ১/২৮; ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/৪৯০) -
শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচার দোয়া:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যদি কেউ এমন স্বপ্ন দেখে যা তার অপছন্দনীয়, তবে সে যেন বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে (আদা করে ফুঁকে) এবং তিনবার ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শয়তানির রাজীম’ পড়ে, আর এ স্বপ্ন কারো কাছে না বলে। তাহলে এটি তার কোনো ক্ষতি করবে না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭০৪২; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৬২) -
স্বপ্নের কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই:
আপনার স্বপ্নে আযান, মহররম, আশুরা, ভূমিকম্প ইত্যাদির উল্লেখ থাকলেও এটি বাস্তব ভবিষ্যদ্বাণী নয়। বরং এটি আপনার মনের অবচেতন চিন্তা বা শয়তানের প্রভাব হতে পারে। বিশেষত আপনি লিখেছেন যে স্বপ্নে আপনি বিরক্ত বোধ করছিলেন—এটি শয়তানের পক্ষ থেকে আসা স্বপ্নের লক্ষণ। হাদিসে এসেছে, “শয়তান মানুষের মনে ভীতি সঞ্চার করে এবং বিভ্রান্তিকর স্বপ্ন দেখায়।” (মুসলিম, হাদিস: ২২৬২) -
আমল ও সতর্কতা:
- স্বপ্ন দেখার পর ঘুম থেকে উঠে ‘সুবহানাল্লাহ’ পড়া এবং ডান কাত হয়ে শোয়া।
- মনে কোনো সংশয় আসলে বেশি বেশি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ও দরুদ শরিফ পড়া।
- ফজরের নামাজের পর এ স্বপ্নের কথা আল্লাহর কাছে বললেও বলা যায়, কিন্তু কারো কাছে অর্থ জানতে চাওয়ার প্রয়োজন নেই।
- যে স্বপ্ন দ্বীন বা দুনিয়ায় কোনো কল্যাণের ইঙ্গিত দেয় না, তা উপেক্ষা করাই উত্তম। (বাহিশতি জেওর, ৯/১২)
উপসংহার:
আপনার স্বপ্নের কোনো বাস্তব তাৎপর্য নেই। এটি শয়তানের প্ররোচনা বা নিজের মনের উদ্বেগের ফল। তাই এ নিয়ে চিন্তা না করে আল্লাহর কাছে হেফাজত প্রার্থনা করুন এবং দ্বীনের কাজে মনোযোগী হোন। ‘জাযাকুমুল্লাহু খইরান’।
সূত্র:
- সহিহ বুখারি, কিতাবুত তাবির
- সহিহ মুসলিম, কিতাবুর রুইয়া
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন), ১/২৮
- ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী), ৪/৪৯০
- ফতোয়া উসমানি (মুফতি তকি উসমানি), ৯/৩৫৭
- বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী), ৯/১২
- শরহে মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবী), ৪/২৮০
والله أعلم بالصواب