মা ও স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং স্ত্রীর প্রতি মায়ের অন্যায় আচরণ নিয়ে ইসলামী সমাধান।

Family Life · Hanafi

Question No: 1556
Questioner: MD Rafiul Karim Miad
Question Asked: 13 Jun 2026, 12:53 AM
Reviewed & Published: 13 Jun 2026, 03:49 AM
Views: 73
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

আমার মা সব সময়ই আমার স্ত্রীর ভুল ধরতে ব্যস্ত থাকে। বিষয়টা শুরু হয়েছে আমার বিয়ের ৬ মাস পর হতেই। এবং আমি বিষয়টি খেয়াল করার পর। নিজের খুব খারাপ লাগে যে আমার মা এরকম কিভাবে করতে পারে? আমার মা আমার স্ত্রীর প্রতিটা পদক্ষেপেই ভুল ধরতে থাকে। এবং নিজের ইচ্ছাগুলোকে জোর করে চাপায় আমার স্ত্রীর উপর।
আমি চাই আমার স্ত্রী একভাবে চলুক। কিন্তু আমার মা চায় সে অন্যভাবে চলুক। এখানে আমার স্ত্রী পরে যায় বিপাকে। আমি আমার মা কে বোঝাতে গেলে তিনি গালাগাল দেন এবং আজব ও অস্লীল কথা বলেন।

বলে রাখা ভাল, আমার মা এর ওসিডি আছে। বয়সের সাথে সেটা তীব্র হয়েছে। উনি নিজের শরীর সামর্থ না থাকলেও অন্য কারো কাজ পছন্দ করেন না।

সব্দিক বিবেচনায় আমার স্ত্রী আমার মায়ের সাথে কথা বন্ধ করে দিয়েছে। সে আমার মা থেকে অনেক কষ্ট পেয়েছে মায়ের মুখের কথার দারা। অনেক অপমান করেছে আমার মা।

আমি বিষয়টায় নিরুপায়। আমি এখন কি করবো? বুঝতে পারছি না।

Answer

উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আলহামদুলিল্লাহ ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ

প্রথমত, আপনার পারিবারিক সমস্যার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। ইসলামে মা-বাবার সম্মান ও আনুগত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে অন্যদিকে স্ত্রীর অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। আপনার পরিস্থিতি জটিল, কারণ আপনার মা মানসিক সমস্যা (ওসিডি) তে ভুগছেন এবং তার আচরণ ছেলের স্ত্রীর প্রতি অত্যন্ত কঠোর ও অন্যায্য।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে নির্দেশনা:

১. মা-বাবার আনুগত্যের সীমা:
আল্লাহ তাআলা বলেন:

“আর যদি তারা তোমার সাথে জোর করে যেন তুমি আমার সাথে শিরক কর, যার জ্ঞান তোমার নেই, তবে তাদের কথা মানবে না। আর দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করো।”
(সূরা লুকমান: ১৫)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, মা-বাবার আনুগত্য শুধু তাদের বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত নির্দেশের ক্ষেত্রে। যদি তারা অন্যায় বা জুলুম করেন, তবে তাদের কথা মানা জায়েজ নয়। এমনকি তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা যাবে না।

২. স্বামীর দায়িত্ব স্ত্রীর প্রতি ন্যায়বিচার:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোত্তম ব্যক্তি, যে নিজ স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।”
(তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)

আপনার প্রতি আপনার স্ত্রীর অধিকার হলো আপনি তাকে জুলুম থেকে রক্ষা করবেন। যদি আপনার মা অন্যায়ভাবে তাকে গালাগাল দেন, অপমান করেন এবং নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেন, তবে আপনার কর্তব্য হলো স্ত্রীর পক্ষ নেওয়া, যদিও তা মায়ের কাছে অপ্রিয় হয়।

৩. ঝগড়া ও কলহ এড়ানো:
ইসলাম সম্পর্কচ্ছেদের (নিজের স্ত্রীকে মায়ের থেকে আলাদা করে দেওয়া) অনুমতি দেয় যদি তা পরিবারের শান্তি রক্ষার জন্য প্রয়োজন হয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, স্বামী চাইলে স্ত্রীকে পৃথকভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করতে পারেন, বিশেষ করে যদি শাশুড়ির অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে যায়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬৪)

৪. মায়ের মানসিক রোগ (ওসিডি) বিবেচনায়:
আপনার মা যদি মানসিক রোগে ভুগে থাকেন, তবে তার দায়িত্ব কিছুটা হ্রাস পায়। তবে তার আচরণের কারণে আপনি স্ত্রীকে কষ্ট পেতে দিতে বাধ্য নন। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেছেন:

“পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির কথা-বার্তার জন্য শরিয়তে সাধারণত কোনো দায়িত্ব নেই, তবে তার আত্মীয়দের উচিত তাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্যদের ক্ষতি থেকে বিরত রাখা।”
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৪৫২)

তাই আপনার মায়ের ওসিডির কারণে যদি তার আচরণ অনিয়ন্ত্রিত হয়, তবে আপনার দায়িত্ব তাকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং স্ত্রীকে তার কবল থেকে রক্ষা করা।

হানাফি ফিকাহর বিশুদ্ধ মত:

  • স্ত্রীর অধিকার: স্ত্রী সম্মান ও নিরাপত্তার অধিকার রাখে। যদি শাশুড়ি তাকে অপমান করে এবং গালাগাল দেয়, তবে স্ত্রী তার সাথে কথা না বলতে পারেন, কারণ এটা আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা। এটি "হারাম" বা "গুণাহ" নয়, বরং জায়েজ। (ফাতাওয়া উসমানি, ৩/৫৪৭)
  • স্বামীর কর্তব্য: আপনি আপনার মাকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন, কিন্তু যদি তিনি না শোনেন এবং গালাগাল দেন, তবে আপনি তাকে বলতে পারেন যে, “আপনি যদি এভাবে আচরণ করেন, তবে আমি স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা থাকব।” এটি মায়ের প্রতি অবাধ্যতা নয়, বরং সংসারের শান্তি রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৪২)

ব্যবহারিক সমাধান:

১. মায়ের সাথে ভদ্রভাবে কথা বলুন:
তাকে বোঝান যে আপনি তাকে খুব ভালোবাসেন এবং সম্মান করেন, কিন্তু তার আচরণ আপনার স্ত্রীকে কষ্ট দিচ্ছে। তাকে বলুন, “আমি আপনার ছেলে, কিন্তু আমি আমার স্ত্রীর প্রতিও দায়বদ্ধ। আপনি যদি তাকে সম্মান না করেন, তাহলে আমাদের সংসার টিকবে না।”

২. চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন:
আপনার মায়ের ওসিডি চিকিৎসাযোগ্য। তাকে একজন ভালো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান এবং ওষুধ ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করুন।

৩. স্ত্রীকে সমর্থন দিন:
আপনার স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলুন যে আপনি তার পাশে আছেন। তিনি যদি মায়ের সাথে কথা না বলতে চান, তবে তা জায়েজ। তবে মায়ের সেবা-যত্নের দায়িত্ব আপনি নিজে পালন করবেন, স্ত্রীর উপর চাপ দেবেন না।

৪. আলাদা বসবাসের পরিকল্পনা:
যদি সম্ভব হয়, তাহলে আপনার স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা একটি বাসায় থাকুন। এটি মায়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়, বরং সংসারের শান্তি বজায় রাখা। মায়ের খোঁজ-খবর নেবেন, নিয়মিত তার সাথে দেখা করবেন, কিন্তু স্ত্রীকে তার নিয়ন্ত্রণ থেকে দূরে রাখুন।

৫. দোয়া ও ধৈর্য:
আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আপনার পরিবারে শান্তি দেন। ধৈর্য ধরুন, কারণ এটি একটি কঠিন পরীক্ষা।

উপসংহার:
আপনার মায়ের প্রতি অসম্মান বা অবাধ্যতা না করেই আপনি তার অন্যায় আচরণ থেকে স্ত্রীকে রক্ষা করতে বাধ্য। ইসলামে স্বামীকে স্ত্রীর অভিভাবক বানানো হয়েছে। আপনি যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তবে আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করবেন,ইনশাআল্লাহ ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথ দেখান। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.