ভাই না থাকলে,২ বোনেকে সবসম্পদ দিবে কিভাবে?
Family Life · Hanafi
Question
ফ্যামিলিতে বাবা, মা,আমি (বড় মেয়ে),ছোটো বোন;ভাই নেই।
আমার দাদা-দাদি,নানা- নানি জীবিত।
আম্মুর ফ্যামিলিতে-
ভাই = ২জন(জীবিত),
বোন=৩জন(জীবিত)
(আম্মু সহ ৪বোন আরকি)
আব্বুর ফ্যামিলিতে-
ভাই=২জন(বড়জন মৃত ;তার ১ছেলে আছে....ছোটো জন জীবিত তার ২ছেলে...আব্বু মেঝো ছেলে)
বোন=৫জন(জীবিত সবাই)
এখন আমার বাবা মা চায়= ''তাদের জমি + জমানো টাকা+ঘর(দাদার বাড়িতে যা আব্বুর টাকায় বানানো) + ঘরের আসবাবপত্র'' সব কিছু তাদের মৃত্যুর পর যেন আমরা ২বোন পাই।আর যেন কেউ না পায়।
আমার বাবা মা ২জন জীবিত তাদের ২জনেরই এইটা চাওয়া। এখন আল্লাহ না করুক তারা মারা গেলে অনেকে ওয়ারিস হয়ে যায় যদিও এইটা এখন খুব কম মানুষ ভাবে। এমনিতেও তখন ঘরের জিনিস + টাকা কেউ দখল করতে চায়না কিন্তু আমরা জানি মারা গেলে সব সম্পদ ওয়ারিস দের নাম এ চলে যায়। আমি চাইনা কারোর হক নষ্ট হোক।
প্রশ্ন::::শরিয়া অনুযায়ী কি এইটা সম্ভব যে জীবিত অবস্থায় আমার আর আমার বোনকে দিতে পারবে সব কিছু এমন নিয়মে যেটা ইসলামে জায়েজ। বা কোন কোন সম্পদ আমাদের ২বোনকে ভাগ করে দেয়া যাবে না, এই সম্পদ ওয়ারিসদের দিতেই হবে তা নিয়ে একটু বিস্তারিত জানাবেন প্লিজ।যেটা তাদের দিতে হবে সেগুলো একটু বুঝিয়ে বলবেন কাকে কাকে দিতে হবে কত% দিতে হবে।আর দাদার জমিতে যেখানে আমার বাবা ঘর করেছে সেখানে কি আমাদের হক নেই? যেহেতু আমাদের ভাই নেই।এইগুলো কি কাকার ছেলেরা পাবে?আমার প্রশ্ন এলোমেলো আপনি আপনার মন মতন উত্তর দিবেন। কিছু মনে করবেন না প্লিজ। আফওয়ান।
আমি চ্যাট জিটিপিতে দেখেছিলাম সেখানে সব কিছু বুঝা যায়না।বলে সাক্ষ্যি রেখে ভাগ করে দিতে। আমাকে প্লিজ জানাবেন সঠিকটা।
আম্মুর সম্পদ- এইগুলো আব্বুর কিনে দেয়া কিন্তু আম্মুর নামে কিছু জমি (১.৫কাঠা)
আব্বুর সম্পদ-আব্বুর নামে কোনো জমি নেই।টাকা আছে ৪লাখের মতন।আর দাদার জায়গায় ঘর করেছেন ২টা রুম।ঘরের সব জিনিস আব্বুর টাকায় কিনা। দাদা এখনো জমি ভাগ করে দেন নি। কাকারা আর আব্বু নিজেদের অনুমান জায়গা মতন ঘর করে নিয়েছে।
আর আমাদের সব টাকা একদম হালাল আলহামদুলিল্লাহ। তাই আব্বু অনেক কষ্ট করে ইনকাম করেছেন, তাই আব্বু আম্মু চান এই টাকা যতটা আমাদের দেয়া যায় সেটা দিতে।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই বলে রাখি, ইসলামের ওয়ারিসত ব্যবস্থা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। তাই জীবিত অবস্থায় নিজের সম্পদ যেভাবে ইচ্ছা ব্যয় বা দান করা জায়েজ। কিন্তু মৃত্যুর পর সম্পদ বণ্টন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কুরআন-সুন্নাহর নির্ধারিত নিয়মে হবে। আপনার বাবা-মা চাইলে জীবিত অবস্থায় তাদের সঞ্চিত ও মালিকানাধীন সম্পদ হিবা (দান) হিসেবে আপনাদের দুই বোনকে দিয়ে দিতে পারেন। এটি সম্পূর্ণ জায়েজ। তবে এতে কিছু শর্ত আছে:
১. জীবিত অবস্থায় সম্পদ দান (হিবা) করা
-
শরয়ী বিধান:
যে কোনো মুসলিম নিজের বৈধ সম্পদ জীবিত অবস্থায় ইচ্ছামতো দান করতে পারেন। [সূরা আল-বাকারা: ২৬৭] -
শর্ত:
- দানটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় হতে হবে, কোনো প্রকার জবরদস্তি বা ধোঁকা ছাড়া।
- দানকৃত বস্তু বা অর্থের দখল (কবজা) গ্রহীতাকে দিয়ে দিতে হবে। শুধু মুখে বললে চলবে না।
- সন্তানদের মধ্যে ন্যায্যতা বজায় রাখা উত্তম। আপনার বাবা-মায়ের কেবলমাত্র দুই মেয়ে থাকায় তাদের উভয়কে সমান দিলেই ন্যায্যতা পূর্ণ হবে।
- হিবা করার পর সেই সম্পদ আর মৃতুকালীন সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে না; তাই ওয়ারিসদের কেউ তাতে দাবি করতে পারবে না।
-
হাদীসের নির্দেশনা:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:"তোমরা সন্তানদের মধ্যে সমানভাবে দান করো।" (বুখারী, মুসলিম)
এখানে সমান বলতে পুরুষ-নারী নির্বিশেষে বোঝানো হয়েছে। যেহেতু আপনাদের পরিবারে শুধু কন্যা আছে, তাই উভয়কে সমান দিলেই সুন্নত পালন হবে। -
উপদেশ:
হিবা লিখিতভাবে করে সাক্ষী রাখা ভালো। তবে মনে রাখবেন, দাদা-দাদি, নানা-নানি জীবিত থাকায় তাদের প্রতি আর্থিক দায়িত্ব থাকলে (যদি তারা অভাবী হন) তাদের জন্যও কিছু দান করা মুস্তাহাব। কিন্তু এটা বাধ্যতামূলক নয়; আপনি চাইলে শুধু কন্যাদের দান করতে পারেন।
২. মৃত্যুর পর শরয়ী বণ্টন (যদি হিবা না করা হয়)
আপনার বাবা-মা জীবিত থাকতে হিবা না করলে তাদের মৃত্যুর পর সম্পদ নিম্নোক্ত ওয়ারিসদের মধ্যে বণ্টিত হবে। নিচে উভয়ের পৃথক পৃথক ক্ষেত্র দেখানো হলো:
ক. আপনার বাবার সম্পদের ওয়ারিস ও প্রাপ্তি
| ওয়ারিস | প্রাপ্তি | কারণ | |--------|---------|------| | স্ত্রী (আপনার মা) | ১/৮ (১২.৫%) | সন্তান থাকায় [সূরা নিসা: ১২] | | ২ কন্যা (আপনি ও ছোট বোন) | ২/৩ (৬৬.৬৬%) অর্থাৎ প্রত্যেকে ১/৩ করে | সন্তান (পুত্র না থাকায়) [সূরা নিসা: ১১] | | বাবার মা (আপনার দাদী) | ১/৬ (১৬.৬৭%) | সন্তান থাকায় [সূরা নিসা: ১১] (তিনি মা হিসেবে গণ্য) | | বাবার বাবা (আপনার দাদা) | অবশিষ্টাংশ ১/২৪ (৪.১৭%) | আসাবা (বৈবাহিক) হিসেবে [আল-হিদায়া, রদ্দুল মুহতার] |
দ্রব্য ও নোট:
- বাবার ভাই (কাকা) ও বোন (ফুফু) এই সম্পদে কিছু পাবেন না, কারণ বাবার ইন্তেকালের সময় তার সন্তান ও পিতা-মাতা জীবিত থাকলে ভাইবোন বাদ পড়ে যায়। [ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৬/৪৪২]
- দাদা আসাবা হওয়ায় অবশিষ্ট অংশ তিনি পাবেন।
খ. আপনার মায়ের সম্পদের ওয়ারিস ও প্রাপ্তি
| ওয়ারিস | প্রাপ্তি | কারণ | |--------|---------|------| | স্বামী (আপনার বাবা) | ১/৮ (১২.৫%) | সন্তান থাকায় [সূরা নিসা: ১২] | | ২ কন্যা (আপনি ও ছোট বোন) | ২/৩ (৬৬.৬৬%) প্রত্যেকে ১/৩ | [সূরা নিসা: ১১] | | মায়ের মা (আপনার নানী) | ১/৬ (১৬.৬৭%) | মা হিসেবে [সূরা নিসা: ১১] | | মায়ের বাবা (আপনার নানা) | অবশিষ্টাংশ ১/২৪ (৪.১৭%) | আসাবা |
দ্রব্য:
- মায়ের ভাই (মামা) ও বোন (খালা) কিছু পাবেন না, কারণ মায়ের সন্তান ও পিতা-মাতা জীবিত থাকলে ভাইবোন বাদ পড়ে।
উল্লেখ্য:
- দাদা-দাদি, নানা-নানি জীবিত থাকায় তারা উপরোক্ত অংশ পাবেন। তাদের মৃত্যু হলে তাদের অংশ তাদের নিজ নিজ ওয়ারিসদের মধ্যে যাবে।
৩. দাদার জমিতে বাবার তৈরি ঘর ও তার বিধান
- ঘর: এটি আপনার বাবার নিজস্ব অর্থে নির্মিত, তাই এটি তার সম্পত্তি। বাবার মৃত্যুতে উপরোক্ত নিয়মে ঘরটির অংশ আপনার পরিবার, দাদা ও দাদি পাবেন।
- জমি: জমিটি দাদার মালিকানাধীন। এতে আপনার বাবার কোনো মালিকানা নেই। বাবার মৃত্যুর পর দাদার জমির উত্তরাধিকার দাদার মৃত্যুতে তার ওয়ারিসদের (যার মধ্যে আপনার বাবাও একজন) মধ্যে বণ্টিত হবে। আপনার বাবা মারা গেলে তার অংশ তার ওয়ারিসরা (আপনারা) পাবেন না, কারণ শরিয়তে মৃত ব্যক্তির পুত্রের স্থলাভিষিক্ত হয়ে তার সন্তানরা দাদার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না। [রদ্দুল মুহতার, ৬/৭৯০]
- অর্থাৎ: দাদা এখন জীবিত। তার মৃত্যুতে তার পুত্র (আপনার কাকারা) ও কন্যারা (ফুফুরা) এবং তার স্ত্রী (দাদি) ওয়ারিস হবেন। আপনার বাবা আগে মারা গেলে তার কোনো অংশ তার সন্তানরা (আপনারা) পাবেন না। শুধুমাত্র যদি দাদা আপনাদেরকে দান করে দেন, তাহলে পেতে পারেন।
- কাকার ছেলেরা: তারা দাদার সম্পত্তিতে আপনার বাবার স্থলাভিষিক্ত হবে না। তবে দাদার মৃত্যুতে যদি কাকারা বেঁচে থাকেন, তাহলে কাকারা অংশ পাবেন; কাকার ছেলেরা কেবল তাদের নিজ পিতার মৃত্যুতে সন্তান হিসেবে ওয়ারিস হবে।
উপদেশ:
- বাবার তৈরি ঘরটির জমি দাদার নামে থাকায়, উত্তম হবে দাদা জীবিত থাকতেই সেই নির্দিষ্ট জায়গাটি (যেখানে ঘর আছে) আপনার বাবা বা সরাসরি নাতনিদের (আপনাদের) নামে দান করে (হিবা) করে দেন। তাহলে ভবিষ্যতে জমি নিয়ে বিরোধ কমবে।
৪. আপনি কীভাবে বাবা-মাকে সাহায্য করতে পারেন?
তাদের ইচ্ছা (দুই বোনকে সব দেওয়া) শরিয়তের দৃষ্টিতে জীবিত অবস্থায় হিবা করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কিন্তু মৃত্যুর পর তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী বণ্টন জোর করে করানো যাবে না; আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মই কার্যকর হবে। তাই তাদের উচিত এখনই একটি লিখিত হিবানামা করে নেওয়া, যাতে সাক্ষী থাকে এবং সম্পদের দখল আপনাদের কাছে হস্তান্তর করে দেওয়া হয়।
তবে মনে রাখবেন, দাদা-দাদি, নানা-নানি জীবিত আছেন। যদিও শরিয়তে তাদের উপর আপনাদের অধিকার নেই, কিন্তু নৈতিকভাবে তাদের প্রতি সদ্ব্যহার করা ও প্রয়োজনীয় সাহায্য করা উত্তম। আপনি চাইলে বাবা-মাকে বলতে পারেন যেন তারা দাদা-দাদি, নানা-নানিকেও কিছু দান করেন, অথবা অন্তত তাদের খোঁজখবর রাখেন।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | জীবিত অবস্থায় আপনার বাবা আপনাদের দুই বোনকে সব সম্পদ দান করা জায়েজ, তবে দখল হস্তান্তর ও সমান বণ্টন শর্ত |
উল্লেখ্য, এক্ষেত্রে অন্যান্য ওয়ারিশদের সন্তুষ্টি নেয়ার পরামর্শ থাকবে। বিশেষ করে নিজ স্ত্রীকে ৮ ভাগের এক ভাগ সম্পদ দিতে হবে। তিনি নিতে না চেয়ে সব সম্পদ সন্তানদের দিতে চাইলে সেটিও জায়েজ।
| মৃত্যুর পর শুধু দুই বোনকে উত্তরাধিকারী করা | সম্ভব নয়; শরয়ি ওয়ারিসরা (দাদা-দাদি, নানা-নানি) অংশ পাবেন | | দাদার জমির ঘর | বাবার মালিকানাধীন, কিন্তু জমি দাদার। মৃত্যুতে ঘরের অংশ ওয়ারিসরা পাবেন, জমি নয় | | কাকার ছেলেরা দাদার জমি পাবে? | হ্যাঁ, দাদার মৃত্যুতে তারা তাদের বাবার মাধ্যমে আসাবা হতে পারে, কিন্তু আপনারা পাবেন না |
তথ্যসূত্র:
কুরআন: সূরা নিসা ৪:১১, ৪:১২, ৪:১৭৬
হাদীস: সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫৮৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬২৩
ফিকহী কিতাব: রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন), ৬/৭৯০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৬/৪৪২; আল-হিদায়া, ৪/৪৫১; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৪৫