জীনের সাহায্য নিলে ঈমান কি থাকবে
Faith and Belief · Hanafi
Question
২।কিভাবে বুঝবো সে সঠিক উপায়ে জীন শয়তান তাড়াচ্ছে?
৩।আবার অনেক হুজুর তুলা রাশির লোক খুঁজে তারা কি সঠিক?
এসব রাশি দিয়ে কি হয়?
Answer
জীনের সাহায্য নেওয়া ও ঈমানের প্রশ্ন: ইসলামী দৃষ্টিকোণ
প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার
উপরোক্ত প্রশ্নে তিনটি বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে:
- জীন-শয়তান ছাড়ানোর জন্য যেসব "হুজুর" জীনের সাহায্য নেন, তাদের কাছে গেলে ঈমানের কী অবস্থা হবে?
- কীভাবে বোঝা যাবে যে কেউ সঠিক ইসলামী পদ্ধতিতে জীন-শয়তান তাড়াচ্ছে?
- "তুলা রাশির লোক" খোঁজা এবং রাশি দেখা কি সঠিক?
১. জীনের সাহায্য নেওয়ার মাধ্যমে ঈমানের অবস্থা
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
জীন ও শয়তানের সাহায্য নেওয়া ইসলামী আকীদার সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর যেদিন তিনি তাদের সকলকে একত্র করবেন, (বলবেন) হে জীন সম্প্রদায়! তোমরা মানুষদের অনেককে পথভ্রষ্ট করেছিলে। আর মানুষের মধ্য থেকে তাদের বন্ধুরা বলবে, হে আমাদের রব! আমরা একে অপরের দ্বারা লাভবান হয়েছি..." (সূরা আল-আনআম: ১২৮)
আল্লাহ আরও বলেন:
"আর নিশ্চয়ই কিছু সংখ্যক মানুষ কিছু সংখ্যক জীনের আশ্রয় নিত, ফলে তারা জীনদের অহংকার বাড়িয়ে দিত।" (সূরা আল-জীন: ৬)
হানাফী ফকীহদের মতামত
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, জীনের সাহায্য নেওয়া বা জীনের মাধ্যমে কোনো কাজ করানো নাজায়েয এবং এটি শিরকের পর্যায়ভুক্ত। কারণ এতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো প্রতি নির্ভর করা হয় এবং তাদেরকে ক্ষমতাশালী মনে করা হয়। (কিতাবুল আশবাহ ওয়ান নাযাইর, ইবনে নুজাইম)
ইবনে আবিদীন (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ বলেন:
"যে ব্যক্তি জীন বা শয়তানের সাহায্য গ্রহণ করে কোনো রোগ নিরাময়ের জন্য বা কোনো কাজ সম্পাদনের জন্য, সে শিরক করে। কারণ সে আল্লাহর পরিবর্তে অন্য সৃষ্টিকে ক্ষমতার অধিকারী মনে করে।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭১)
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী)-তে উল্লেখ আছে:
"যে ব্যক্তি জীন বা শয়তানের সাহায্যে রোগ নিরাময় করে বা কোনো কাজ করে, তার ঈমান বিপন্ন হয়। যদি সে জীনকে সিজদা করে বা তাদের প্রতি কোনো ধরনের ইবাদত করে, তাহলে সে কাফির হয়ে যায়। আর যদি শুধু তাদের সাহায্য নেয় কিন্তু তাদের ইবাদত না করে, তবুও এটি হারাম ও কবীরা গুনাহ।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৮)
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে বলেন:
"জীনের সাহায্য নেওয়া এবং জীনকে কোনো কাজে লাগানো নাজায়েয। কারণ এটি শিরকের সাথে জড়িত। বর্তমানে যারা এ ধরনের কাজ করে, তাদের থেকে দূরে থাকা wajib।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১৬৭)
মুফতী তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:
"জীনের সাহায্যে রোগ নিরাময় বা কোনো কাজ করানো জায়েয নয়। ইসলামী শরীয়তে শুধু কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে চিকিৎসা করার অনুমতি আছে।" (ফাতাওয়া উসমানী, ১/৪২৫)
সিদ্ধান্ত
যেসব "হুজুর" জীনের সাহায্যে রোগ নিরাময় করেন বা জীন তাড়ান, তাদের কাছে যাওয়া এবং তাদের উপর নির্ভর করা ঈমানের জন্য বিপজ্জনক। তবে প্রশ্নে বলা হয়েছে "তাদের কাছে যদি কেউ জীন তাড়ানোর জন্য যায়, তাহলে কি ঈমান থাকবে?" — এর উত্তর:
• যদি কেউ বিশ্বাস করে যে এই হুজুরের জীনের উপর ক্ষমতা আছে এবং সে জীনকে ডাকতে পারে, তাহলে এ বিশ্বাস শিরক হওয়ার কারণে তার ঈমান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে। • যদি কেউ শুধু চিকিৎসার নিয়তে যায় কিন্তু জীনের উপর বিশ্বাস না রাখে, তাহলে গুনাহ হবে কিন্তু ঈমান যাবে না। তবে এটি অত্যন্ত সতর্কতার বিষয়।
২. সঠিক ও ভুল পদ্ধতি চিহ্নিত করার উপায়
কিভাবে বুঝবেন যে কেউ সঠিক ইসলামী পদ্ধতিতে জীন-শয়তান তাড়াচ্ছে?
সঠিক পদ্ধতি (শরীয়তসম্মত)
ইসলামী চিকিৎসা বা রূকইয়ার সঠিক পদ্ধতি হলো:
-
শুধুমাত্র কুরআনের আয়াত ও সুন্নাহর দোয়া ব্যবহার করা — যেমন সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস, এবং বিভিন্ন মাসনূন দোয়া।
-
আল্লাহর নামে শুরু করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা — চিকিৎসককে বিশ্বাস করতে হবে যে শুধুমাত্র আল্লাহই আরোগ্য দান করেন।
-
কোনো প্রকার তাবিজ-কবজ, রশি-দড়ি, লোহা-পাথর ব্যবহার না করা — এগুলো সবই শিরকের মাধ্যম।
-
জীন বা শয়তানের সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ না করা — তাদেরকে ডাকা, তাদের সাহায্য চাওয়া, তাদেরকে কিছু বলা এসবই নাজায়েয।
ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন:
"রূকইয়া (দোয়া দ্বারা চিকিৎসা) জায়েয, তবে শর্ত হলো তা কুরআন ও হাদীসের ভিত্তিতে হতে হবে এবং কোনো প্রকার শিরকের সাথে মিশ্রিত না হতে হবে।" (কিতাবুল আসার, ইমাম মুহাম্মদ)
ভুল পদ্ধতি (যা থেকে সাবধান থাকতে হবে)
নিম্নলিখিত বিষয়গুলো দেখলে বুঝবেন যে ব্যক্তি সঠিক পথে নেই:
-
জীনকে ডাকা বা জীনের সাথে কথা বলা — যদি কেউ জীনকে ডেকে বলে "আমাকে সাহায্য কর" বা "তুমি কোথা থেকে এসেছ" ইত্যাদি, এটি হারাম।
-
তাবিজ-কবজ, রশি-গিরা, বা অদ্ভুত বস্তু ব্যবহার করা — এগুলো শিরকের মাধ্যম।
-
রাশি, নক্ষত্র, বা জন্মতারিখের উপর নির্ভর করা — এটি জ্যোতিষশাস্ত্র, যা ইসলামে হারাম।
-
টাকার বিনিময়ে নিশ্চিত আরোগ্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া — এটি ধোঁকা ও প্রতারণা।
-
কোনো প্রকার জিনিস পোড়ানো, ধূপ দেওয়া, বা অদ্ভুত আচার-অনুষ্ঠান করা।
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ বলেন:
"শরীয়তসম্মত চিকিৎসার পদ্ধতি হলো কুরআন-হাদীসে বর্ণিত পদ্ধতি। এর বাইরে কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করা জায়েয নয়।" (মাআরিফুল কুরআন, ২/৪২)
৩. "তুলা রাশির লোক" খোঁজা ও রাশি ব্যবহার
রাশি ও জ্যোতিষশাস্ত্রের বিধান
রাশি (জ্যোতিষশাস্ত্র) দেখা এবং রাশি অনুসারে কাজ করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও কবীরা গুনাহ।
হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"যে ব্যক্তি কোনো জ্যোতিষীর কাছে যায় এবং সে যা বলে তা বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা অস্বীকার করে।" (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ)
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন:
"রাশি দেখা এবং নক্ষত্রের প্রভাবে ভাগ্য নির্ধারণ করা নাজায়েয। এটি জাহিলিয়াতের যুগের কাজ।" (শরহু মাআনিল আসার, ইমাম তাহাবী, ৪/২৩২)
"তুলা রাশির লোক" খোঁজার বিধান
• "তুলা রাশির লোক" খোঁজা মানে নির্দিষ্ট রাশির মানুষের সাথে বিবাহ বা ব্যবসা করা — এটি ইসলামে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কুসংস্কার।
• রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"রাশি, নক্ষত্র, অশুভ লক্ষণ ইত্যাদি সবই শয়তানের কাজ।" (বুখারী, ৫৭৭৫)
মুফতী তাকী উসমানী (দা.বা.) এ প্রসঙ্গে বলেন:
"বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে রাশি দেখার যে প্রথা প্রচলিত আছে, তা সম্পূর্ণ হারাম এবং ইসলামী আকীদার পরিপন্থী। মুসলমানদের এ থেকে বিরত থাকা wajib।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৪৭)
সিদ্ধান্ত
• রাশি দেখা, রাশির ভবিষ্যদ্বাণী করা, রাশি অনুসারে কাজ করা সবই হারাম। • "তুলা রাশির লোক" খোঁজা বা রাশির ভিত্তিতে বিবাহ ইত্যাদি ঠিক করা ইসলামে জায়েয নয়। • এগুলো জাহিলিয়াতের যুগের কাজ, যা ইসলামে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
উপসংহার ও পরামর্শ
-
জীনের সাহায্য নেওয়া — এটি শিরকের পর্যায়ে পড়ে। যে ব্যক্তি জীনের সাহায্যে চিকিৎসা করে বা জীন তাড়ায়, তার কাছে যাওয়া উচিত নয়। যদি কেউ জীনের সাহায্য গ্রহণে বিশ্বাস করে তার কাছে যায়, তাহলে তার ঈমান বিপন্ন হতে পারে।
-
সঠিক পদ্ধতি — শরীয়তসম্মত পদ্ধতি হলো শুধুমাত্র কুরআন ও হাদীসের দোয়া-আয়াত দ্বারা চিকিৎসা করা। যিনি এ কাজ করেন, তিনি আল্লাহর উপর ভরসা রাখবেন এবং কোনো প্রকার শিরক থেকে দূরে থাকবেন।
-
রাশি দেখা — এটি সম্পূর্ণ হারাম ও কবীরা গুনাহ। মুসলমানের উচিত এসব কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা।
সর্বোত্তম পদ্ধতি: কুরআন তিলাওয়াত, নিয়মিত নামাজ, জিকির-আযকার এবং ইস্তেগফার করা। বিশেষ করে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস নিয়মিত পড়া — এগুলো জীন-শয়তানের প্রভাব থেকে রক্ষা করে।
আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।