ইসলামে পাপী ব্যক্তিকে স্বামী হিসেবে দোয়ায় চাওয়ার বিধান, দোয়ার পদ্ধতি ও তাকদির পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে চাই।

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 1520
Questioner: Bibi Aysha
Question Asked: 11 Jun 2026, 10:46 PM
Reviewed & Published: 11 Jun 2026, 11:00 PM
Views: 52
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।

আল্লাহ তো দোয়ার মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেন।

এখন আমি যদি এমন একজনকে নিজের স্বামি হিসেবে দোয়াতে চাই যে সিগারেট খায়, নন মাহরাম একটা মেয়ের সাথে ঘুরে, অন্য নন মাহরাম মেয়ের সাথেও কথা বলে, আল্লাহর থেকে অনেক দূরে আছে।

এখন আমি এই সব জেনেও যদি আমার ওর প্রতি অনুভূতির কারনে ওকে আল্লাহর কাছ থেকে চাই কারন আল্লাহ তো হেদায়েত দিয়ে ওকে আমার জন্য হালাল করে দিতে পারেন।।

তবে অনেক জায়গায় দেখলাম এভাবে চাওয়া ঠিক না আবার অনেক জায়গায় দেখি যে আল্লাহ বান্দার নিয়ত অনুযায়ী কবুল করেন, আমি যদি ১০০% ধরে নি যে আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করবেন/করেছেন তাহলে আল্লাহ অবশ্যই কবুল করেন। আমি যদি এভাবে দোয়া করি যে "আল্লাহ আপনি দোয়ার মাধ্যমে তাকদির পরিবর্তন করতে পারেন, আপনি উত্তমকে সর্বোত্তম বানানোর মালিক, অকল্যাণকরককে কল্যাণকর বানানোর মালিক আপনি ওকে আমার জন্য আপনার রহমত দিয়ে সব অকল্যাণ, অসম্ভব দূর করে দিয়ে দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য আমার স্বামী হিসেবে উত্তম এবং কল্যাণকর করে আমার তাকদিরে লিখে দিন।"
এভাবে দোয়া করা কি ঠিক হবে?
আর তা না হলে কিভাবে দোয়া করলে শরীয়তসম্মত হবে?

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নটির মূল বিষয় হলো—একজন পাপী ও দূরে থাকা ব্যক্তিকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার জন্য দোয়া করা এবং দোয়ার পদ্ধতি কী হওয়া উচিত। নিচে হানাফি ফিকহ ও কুরআন-হাদিসের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।


১. দোয়া ও তাকদির সম্পর্কে সাধারণ নীতি

দোয়া একটি শক্তিশালী ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” (সূরা গাফির: ৬০)

হাদিসে এসেছে—
“দোয়া ছাড়া আর কিছুই তাকদির পরিবর্তন করতে পারে না।” (সুনান তিরমিজি: ২১৩৯)

অর্থাৎ দোয়া দ্বারা আল্লাহ তাকদির পরিবর্তন করতে পারেন। তবে তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন, বান্দার ১০০% নিশ্চয়তার ওপর ভিত্তি করে নয়। কেননা দোয়া কবুলের শর্ত হলো—আল্লাহর ওপর সুধারণা রাখা (হাদিস: মুসনাদে আহমাদ, ১২৬২৭), কিন্তু আল্লাহকে বাধ্য করে দেওয়া বান্দার কাজ নয়।

হানাফি ফকিহগণ বলেন—
দোয়া কবুল হওয়ার জন্য বান্দার ইখলাস (একাগ্রতা)ইয়াকিন (দৃঢ় বিশ্বাস) থাকা জরুরি। তবে এ বিশ্বাস এমন হওয়া উচিত যে, “আমি জানি না, আল্লাহ কী করবেন; কিন্তু আমি তাঁর রহমতের ওপর ভরসা রাখি।” বান্দার উচিত নয় বলা যে “আমি ১০০% নিশ্চিত যে, আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করবেনই।” কেননা এটি আল্লাহর ইচ্ছার ওপর অহংকার বলে গণ্য হতে পারে। (আল-হিদায়া, বাবুদ দোয়া; ফাতাওয়া উসমানি, ১/২৮০)


২. পাপী ব্যক্তিকে স্বামী হিসেবে দোয়ায় চাওয়ার বিধান

আপনি যে ব্যক্তিকে চাচ্ছেন, তিনি সিগারেট সেবন, নন-মাহরাম মেয়ের সাথে ঘোরাফেরা, আল্লাহ থেকে দূরে থাকা—এগুলো কবিরা গুনাহ। ইসলামে বলেছে—
“মুমিন ব্যক্তি মুমিন নারীর জন্য উপযুক্ত স্বামী, আর পাপী ব্যক্তি পাপী নারীর জন্য উপযুক্ত।” (সূরা আন-নূর: ২৬)

তাই গুনাহগার ব্যক্তির সাথে বিবাহ করা মাকরুহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি)। হানাফি ফিকহে লেখা—
“ফাসিক ব্যক্তির সাথে মেয়ের বিবাহ দেওয়া মাকরুহ, যদি তাকে বাধ্য করা হয় তাহলে বিবাহ ভঙ্গ করার অধিকারও থাকে।” (রদ্দুল মুহতার, ৩/৩৮)

তবে—যদি আপনি দোয়া করেন তার হেদায়েতের জন্য, এবং পরে সে তওবা করে সোজা পথে আসে, তাহলে সে আপনার জন্য হালাল হতে পারে। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় তাকে স্বামী হিসেবে দাবি করা উচিত নয়।

আপনি লিখেছেন—“আল্লাহ তাকে হেদায়েত দিয়ে আমার জন্য হালাল করে দিতে পারেন”—এই বিশ্বাস সঠিক। কিন্তু দোয়া করার সময় তাকে সরাসরি স্বামী হিসেবে চাওয়ার পরিবর্তে প্রথমে তার হেদায়েত ও তওবার জন্য দোয়া করা জরুরি


৩. আপনার উল্লেখিত দোয়ার বাক্যটি বিশ্লেষণ

আপনি বলতে চেয়েছেন—
“আল্লাহ আপনি দোয়ার মাধ্যমে তাকদির পরিবর্তন করতে পারেন, আপনি উত্তমকে সর্বোত্তম বানানোর মালিক, অকল্যাণকরককে কল্যাণকর বানানোর মালিক। আপনি ওকে আমার জন্য আপনার রহমত দিয়ে সব অকল্যাণ, অসম্ভব দূর করে দিয়ে দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য আমার স্বামী হিসেবে উত্তম এবং কল্যাণকর করে আমার তাকদিরে লিখে দিন।”

এ দোয়াটি ভাষাগতভাবে শিরক বা অন্য কোনো ত্রুটিপূর্ণ নয়, বরং আল্লাহর গুণাবলি (মালিকুল মুলক, মুকাল্লিবুল কুলুব) স্বীকার করে করা হয়েছে। তবে তিনটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে

ক. দোয়া বর্তমান অবস্থায় তাকে স্বামী হিসেবে চাওয়ার জন্য নয়, বরং তার হেদায়েত ও ভালোবাসাকে পবিত্র করার জন্য হওয়া উচিত।

খ. দোয়ায় “আমার তাকদিরে লিখে দিন” বলা—এটা জায়েজ, তবে শর্ত হলো এই দোয়া যদি আমার জন্য প্রকৃত কল্যাণকর হয়, তাহলে যেন তা কবুল হয়। কেননা অনেক সময় আমরা যা চাই তা আসলে আমাদের জন্য খারাপ হতে পারে। (সূরা বাকারা: ২১৬)

গ. দোয়ার মধ্যে শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন না করা—যেমন কাউকে জোর করে ভালোবাসা দেওয়া বা হারাম সম্পর্ককে হালাল বানানোর আবেদন—তা বৈধ নয়। বরং দোয়া হলো—“হে আল্লাহ! যদি এই ব্যক্তি আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তবে তাকে সৎ ও উত্তম করে তোলো এবং আমাদের বিবাহ দাও।”


৪. শরীয়তসম্মত দোয়ার পদ্ধতি

নিচের নিয়মগুলো মেনে দোয়া করুন—

প্রথমে তার জন্য হেদায়েতের দোয়া করুন:
“হে আল্লাহ! আপনি যাকে চান হেদায়েত দেন। আমার আকর্ষণ যার প্রতি আছে, তাকে সঠিক পথ দেখান। তাকে তওবা করার তাওফিক দিন এবং সব গুনাহ থেকে ফিরিয়ে নিন।”

দ্বিতীয়ত, কল্যাণ কামনা করে দোয়া করুন:
“হে আল্লাহ! যদি এই ব্যক্তি আমার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য ভালো হয়, তাহলে তাকে আমার জন্য নির্ধারণ করুন। আর যদি সে আমার জন্য খারাপ হয়, তাহলে তার প্রতি আমার মোহ দূর করে দিন এবং তার চেয়ে উত্তম কাউকে দিন।”

তৃতীয়ত, ইস্তিখারা করুন: ইস্তিখারা হলো—ভালো ও মন্দ নির্ধারণের জন্য নবীজির শেখানো বিশেষ দোয়া ও নামাজ। (সহিহ বুখারি: ১১৬২)

চতুর্থত, দোয়া কবুলের সময় ও উপায়: সাহরির সময়, সিজদায়, জুমার দিন, বৃষ্টির সময় দোয়া বেশি কবুল হয়। দোয়ার শুরুতে আলহামদু ও দরুদ পড়ুন, শেষেও দরুদ পড়ুন। (আবু দাউদ: ১৪৮১)


৫. সংক্ষিপ্ত ফতোয়া

  • দোয়া করা জায়েজ, তবে তার বর্তমান পাপাচারের অবস্থায় সরাসরি স্বামী হিসেবে চাওয়া মাকরুহ। প্রথমে হেদায়েতের দোয়া করুন।
  • আল্লাহর রহমতের ওপর সুধারণা রাখা ভালো, কিন্তু “আমি ১০০% জানি আমার দোয়া কবুল হবে” বলাটা উচিত নয়; বরং বলুন “আশা করি আল্লাহ কবুল করবেন”
  • দোয়ার ভাষা আপনার মতো বলতে পারেন, তবে শরয়ী সীমা মেনে—যেমন “যদি কল্যাণকর হয়, তবে কবুল করুন” বলা উত্তম।
  • ইস্তিখারাসবর করুন। আল্লাহ ভালো বান্দার জন্য ভালোই রাখেন।

উপসংহার: আপনি দোয়া করতে পারেন, তবে তার হেদায়েত ও তওবার জন্য দোয়া করুন। যদি সে হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়, তাহলে সে আপনার জন্য হালাল হবে। আর যদি না হয়, তবে আল্লাহ নিশ্চয়ই তার চেয়ে উত্তম কাউকে দেবেন।

والله أعلم بالصواب

রেফারেন্স:

  • কুরআন: সূরা গাফির ৬০, সূরা নূর ২৬, সূরা বাকারা ২১৬
  • সুনান তিরমিজি: ২১৩৯ (দোয়া তাকদির পরিবর্তন করে)
  • মুসনাদে আহমাদ: ১২৬২৭ (সুধারণা)
  • রদ্দুল মুহতার: ৩/৩৮ (ফাসিকের সাথে বিবাহ)
  • ফাতাওয়া উসমানি: ১/২৮০ (দোয়ার শর্ত)
  • আল-হিদায়া: বাবুদ দোয়া
  • বেহেশতি জেওর: দোয়া ও ইস্তিখারা

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.