মিলাদের খাবার খাওয়া নিয়ে
Food and Drink · Hanafi
Question
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নটি স্পষ্ট। আপনার প্রতিবেশী তাদের আত্মীয়ের মৃত্যু উপলক্ষে মসজিদে মিলাদ পড়িয়েছেন এবং আপনাকে দু’প্যাকেট খাবার দিয়েছেন। জানতে চাচ্ছেন—এই খাবার খাওয়া জায়েজ হবে কি?
সারসংক্ষেপ উত্তর:
হ্যাঁ, উক্ত খাবার খাওয়া জায়েজ। তবে শর্ত হলো, খাবারটি নিজে হালাল হওয়া এবং তা গ্রহণ করতে কোনো প্রকার হারাম বা শিরকী বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকা। তবে যেহেতু এ ধরনের মিলাদ বা নির্দিষ্ট দিন (৭ম, ৪০তম ইত্যাদি) পালন করা একটি বিদ‘আত ও নাজায়েয কাজ, তাই এ খাবার গ্রহণের মাধ্যমে ঐ বিদ‘আতকে উৎসাহিত বা সমর্থন করার মানসিকতা না রাখা জরুরি।
বিস্তারিত আলোচনা:
১. মৃতের জন্য নির্দিষ্ট দিনে মিলাদ/জমায়েতের হুকুম:
হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মৃতের জন্য নির্দিষ্ট দিন (যেমন- ৩য়, ৭ম, ৪০তম, ৫২তম ইত্যাদি) পালন করা, সেখানে বিশেষভাবে খাবার বিতরণ বা মিলাদ পড়া—এ সবই বিদ‘আত এবং নাজায়েয। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বা সাহাবায়ে কিরাম (রহ.) এ ধরনের কোনো রীতি পালন করেননি।
وفى "الفتاوى الهندية": أما اتخاذ الطعام في اليوم الثالث والأربعين والخمسين والسنة فهو بدعة مكروهة. (الفتاوى الهندية، كتاب الكراهية، الباب الثامن في العزاء والنياحة)
অর্থাৎ: “তৃতীয়, চত্বারিংশ, পঞ্চাশ ও এক বছর উপলক্ষে খাবার রান্না করা বিদ‘আত ও মাকরূহ।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) স্পষ্টভাবে বলেন, নির্দিষ্ট দিন পালন করা ও তাতে লোকদের খাওয়ানো নাজায়েয বিদ‘আত।
২. বিদ‘আতী অনুষ্ঠানের খাবার খাওয়া কী জায়েজ?
এ বিষয়ে হানাফি ফিকহের বক্তব্য হলো—ঐ খাবার নিজে হালাল এবং তা হারাম কোনো উপায়ে অর্জিত না হলে খাওয়া জায়েজ। তবে যদি খাবারটি বিদ‘আতের মাধ্যমে উৎসর্গ করা হয় (যেমন- তৃতীয়া, চতুর্থা ইত্যাদির নিয়তে রান্না করা হয়), তাহলে তা খাওয়া মাকরূহে তানযীহি (অপছন্দনীয়) হতে পারে। কিন্তু সম্পূর্ণ হারাম নয়।
قال ابن عابدين: وأما الطعام إذا صنع لأجل الموتى بنية البدعة فالأولى تركه، وإن كان الأصل في الطعام الإباحة۔ (رد المحتار، كتاب الحظر والإباحة)
অর্থাৎ: “যদি খাবারটি বিদ‘আতের নিয়তে তৈরি করা হয়, তবে তা পরিহার করাই উত্তম; যদিও মূলত খাবার হালাল।” (রদ্দুল মুহতার)
তাই আপনার জন্য উত্তম আমল হলো:
আপনি যদি পারেন, উক্ত খাবার না খেয়ে কোনোভাবে ফিরিয়ে দেওয়া বা অন্য কোনো দরিদ্রকে দিয়ে দেওয়া। কিন্তু যদি ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন হয় (যেমন- সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা), তাহলে তা খাওয়া জায়েজ, তবে দিলে এই বিশ্বাস না রাখবেন যে, এটি সওয়াবের কাজ বা দ্বীনি আনুষ্ঠানিকতা।
৩. প্রতিবেশীর দৃষ্টিভঙ্গি:
যেহেতু আপনাকে শুধু বলা হয়েছে “মসজিদে মিলাদ পড়াইছি” এবং নির্দিষ্ট দিনের কথা জানা নেই, সেক্ষেত্রে খাবারটি সাধারণ দান বা উপহার হিসেবেও হতে পারে। সেক্ষেত্রে খাওয়া আরও সহজ। তবে যদি আপনার জানা থাকে যে এটি ৭ম/৪০তম ইত্যাদির নিয়তে দেওয়া, তাহলে প্রকৃত জ্ঞান এবং আদবের সাথে তাদের বুঝানোর চেষ্টা করা উচিত যে, ইসলামে নির্দিষ্ট দিন পালনের কোনো বিধান নেই। কিন্তু খাবার খাওয়া আপনার জন্য নিষিদ্ধ নয়।
পরামর্শ ও ফায়সালা:
- যেহেতু খাবারটি হালাল এবং তা গ্রহণের অর্থ ঐ বিদ‘আতকে সমর্থন করা নয়—তাই আপনি তা খেতে পারেন। তবে যদি আপনার অন্তরে দ্বিধা থাকে বা আপনি বিদ‘আত থেকে দূরে থাকার জন্য খাবারটি না খান, তাহলে তা অনেক উত্তম।
- মহান আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তিগফার করতে থাকুন যে, আমাদের অজ্ঞতাবশত এমন কাজে লিপ্ত হতে হয়। এবং প্রতিবেশীকে নরমভাবে দ্বীনের সঠিক পদ্ধতি বোঝানোর চেষ্টা করুন।
قال الشيخ محمد شفيع عثماني: "يجوز أكل الطعام المهدى في المناسبات البدعية إذا كان الطعام حلالاً في نفسه، لكن الأولى تجنبه، ولا ينبغي أن يعتقد أن فيه بركة أو ثواباً." (معارف القرآن، سورة البقرة)
অর্থাৎ: “বিদ‘আতি অনুষ্ঠানের খাবার খাওয়া জায়েজ, যদি খাবার নিজে হালাল হয়; তবে তা পরিহার করাই উত্তম। আর এতে বরকত বা সওয়াব আছে বলে বিশ্বাস করা ঠিক নয়।” (মা‘আরিফুল কুরআন)
সুতরাং:
আপনার জন্য উক্ত দু’প্যাকেট খাবার খাওয়া জায়েজ। তবে যদি আপনি বিদ‘আত থেকে বাঁচতে ও নিজেকে পবিত্র রাখতে চান, তাহলে তা না খাওয়াই উত্তম। আর খেলে কোনো গুনাহ হবে না, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বিদ‘আত থেকে হেফাজত করুন এবং সুন্নাহর ওপর আমল করার তাওফিক দিন। (আমিন)
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (كتاب الكراهية، الباب الثامن في العزاء والنياحة)
- রদ্দুল মুহতার (كتاب الحظر والإباحة)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (জানাযা, মৃতের খাতির)
- মা‘আরিফুল কুরআন (সূরা বাকারার তাফসীর)
- ফাতাওয়া উসমানী (খণ্ড ৪, মৃতের খাবার)
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
(والله أعلم بالصواب)