ওয়ারিশদের মাঝে বন্টন বিষয়ক
Family Life · Hanafi
Question
এই টাকায় কি সন্তানদের অধিকার আছে? যদি থেকে থাকে তাহলে আমার( আমি বিবাহিত), আমার ভাই এবং আমার মায়ের মাঝে টাকাটা কিভাবে বন্টন করা শরিয়ত সম্মত হবে? বন্টনের নিয়ম জানতে চাচ্ছি।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে উল্লেখিত টাকাটি আপনার মৃত পিতার পেনশনের অর্থ। শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি পিতার সম্পত্তি এবং তার মৃত্যুর পর তা ওয়ারিসদের মধ্যে ইসলামী উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বণ্টন করা আবশ্যক। ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের নমিনেশন দেওয়ার মাধ্যমে প্রকৃত ওয়ারিসদের অংশ পরিবর্তন হয় না। নমিনিরা কেবল টাকা গ্রহণের মাধ্যম, প্রকৃত মালিক নন; তারা ওয়ারিসদের প্রতিনিধি হিসেবে টাকা গ্রহণ করেন এবং তা সঠিক ওয়ারিসদের মধ্যে বণ্টন করতে বাধ্য।
১. টাকার উপর সন্তানদের অধিকার
হ্যাঁ, আপনার (বিবাহিত কন্যা) এবং আপনার ভাইয়ের (পুত্র) উভয়েরই এই টাকার উপর অধিকার আছে। কারণ আপনারা পিতার বৈধ ওয়ারিস। আপনার মাও ওয়ারিস। তাই পুরো টাকা এককভাবে মায়ের জন্য নির্ধারিত নয়।
২. শরিয়তসম্মত বণ্টনের নিয়ম
পিতার ওয়ারিসদের মধ্যে (যদি পিতামাতা জীবিত না থাকে অথবা অন্য কোনো ওয়ারিস না থাকে) নিম্নরূপ বণ্টন হবে:
- স্ত্রী (মা) পাবেন ১/৮ (১/৮ ভাগ)
- অবশিষ্ট ৭/৮ অংশ পুত্র ও কন্যার মধ্যে এমনভাবে বণ্টন হবে যে, পুত্র কন্যার দ্বিগুণ পাবে।
গণনার নিয়ম:
মনে করি, মোট সম্পত্তি = ৫,০০,০০০ টাকা (এবং ব্যবসায় লাভ হলেও তার সঙ্গে মূলধন মিলিয়ে বণ্টন হবে)
- মায়ের অংশ = ৫,০০,০০০ ÷ ৮ = ৬২,৫০০ টাকা
- অবশিষ্ট = ৫,০০,০০০ - ৬২,৫০০ = ৪,৩৭,৫০০ টাকা
- এখন পুত্র : কন্যা = ২ : ১ অনুপাতে বণ্টন
- পুত্র পাবেন (৪,৩৭,৫০০ ÷ ৩) × ২ = ২,৯১,৬৬৬.৬৭ টাকা
- কন্যা পাবেন (৪,৩৭,৫০০ ÷ ৩) × ১ = ১,৪৫,৮৩৩.৩৩ টাকা
এটি পিতার মৃত্যুর সময় প্রাপ্ত মূল টাকার হিসাব। এরপর আপনি ও আপনার ভাই সম্মত হয়ে পুরো টাকা মায়ের কাছে ব্যবসার জন্য দিয়েছেন। এটি একটি আমানত বা হিবা (দান) হিসেবে গণ্য হতে পারে:
-
যদি হিবা (দান) হয়ে থাকে: অর্থাৎ আপনারা নিঃশর্তভাবে মাকে পুরো টাকা দান করে দিয়েছেন, তাহলে মা এর মালিক হয়ে গেছেন। এখন তিনি ইচ্ছা করলে নিজের বিবেচনায় তা আপনাদের মধ্যে ভাগ করে দিতে পারেন। তবে শরিয়তে সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য না করার জন্য নির্দেশ রয়েছে (সহীহ হাদিস: "তোমরা সন্তানদের মধ্যে সমানভাবে দান করো")। তাই তিনি সবাইকে সমান দিতে পারেন অথবা ইসলামী অংশ অনুযায়ী দিতে পারেন।
-
যদি আমানত (গচ্ছিত) বা ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব থাকে: অর্থাৎ আপনারা মাকে টাকা দিয়েছেন ব্যবসা করার জন্য এবং লাভ দিয়ে ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা করানোর শর্তে, তাহলে টাকার মালিকানা ওয়ারিসদেরই রইল। এখন ব্যবসায় লাভ হলে তা মূলধনের অনুপাতে ভাগ হবে। তারপর আপনার মা যখন টাকা ভাগ করতে চান, তখন তাকে অবশ্যই ইসলামী ওয়ারিসতের অংশ অনুযায়ী বণ্টন করতে হবে। অর্থাৎ মা নিজের অংশ (১/৮) এবং লভ্যাংশ থেকে নিজের অংশ নেবেন; বাকি অংশ পুত্র ও কন্যাকে (২:১ অনুপাতে) দেবেন।
উল্লেখ্য: আপনার ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার জন্য যে খরচ করা হয়েছে, তা যদি মা আপনার ও বড় ভাইয়ের সম্মতি নিয়ে করেন, তাহলে তা বৈধ। তবে পড়াশোনা শেষে অবশিষ্ট টাকা ও লাভ ওয়ারিসতের অংশ অনুযায়ী ভাগ হবে।
৩. বণ্টনের উপসংহার
শরিয়তের দৃষ্টিতে সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো:
১. প্রথমে পিতার মৃত্যুকালে প্রাপ্ত ৫,০০,০০০ টাকার ওয়ারিসত করবেন (মায়ের ১/৮, পুত্র ও কন্যার ২:১)।
২. এরপর যদি ব্যবসায় লাভ হয়, তাহলে সেই লাভ মূলধনের অংশ অনুপাতে ভাগ হবে।
৩. আপনার মা যদি ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার জন্য খরচ করতে চান, তিনি নিজের অংশ থেকে বা সন্তানদের অনুমতি নিয়ে তা করতে পারেন।
৪. শেষ পর্যন্ত বণ্টনের সময় মোট অর্থ (মূল + লাভ) থেকে মায়ের ১/৮ এবং অবশিষ্ট ৭/৮ পুত্র ও কন্যার মধ্যে ২:১ অনুপাতে বণ্টন করুন।
আপনি বিবাহিত কন্যা হওয়ার কারণে আপনার পিতার সম্পত্তিতে আপনার অংশ অপরিবর্তিত থাকবে। ইসলামে পুত্র ও কন্যার মধ্যে বৈষম্য করা জায়েজ নয়, তবে পুত্রের দ্বিগুণ পাওয়া আল্লাহর নির্ধারিত বিধান (সূরা নিসা ৪:১১)।
কিতাবের রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী, জিল্দ ২, সফহা ২১৬-২১৮ (ওয়ারিসত বণ্টন)
- রদ্দুল মুহতার, জিল্দ ৬, সফহা ৭৯০-৭৯২ (নমিনি ও ওয়ারিসত)
- ফাতাওয়া আলমগীরী, জিল্দ ৬, সফহা ৪৬২ (ওয়ারিসতের অধ্যায়)
- সূরা নিসা (৪:১১-১২) – ওয়ারিসতের আয়াত
পরামর্শ: যেহেতু বিষয়টি জটিল এবং ব্যবসায় লাভ-লোকসান ও সঠিক হিসাব প্রয়োজন, তাই আপনার এলাকার কোনো নির্ভরযোগ্য ইসলামি স্কলার বা মুফতির কাছে গিয়ে সম্পূর্ণ হিসাব করে বণ্টন করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।