হাসব্যান্ড নেশা করে আর খুব বদ মেজাজি নামাজ পরে না, খুবই উগ্র মেজাজের,তাহলে তালাক নেয়া যাবে?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
وعلیکم السلام ورحمۃ اللہ وبرکاتہ
আপনার দীর্ঘ ও কষ্টভরা প্রশ্নটি পড়ে আমরা অত্যন্ত ব্যথিত। আল্লাহ তাআলা আপনাকে ধৈর্য ও শক্তি দান করুন। নিচে ইসলামী নির্দেশনা ও হানাফী ফিকহের আলোকে প্রতিটি বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হলো।
১. স্বামীর নেশা, মেজাজ ও আচরণ
স্বামীর নেশা (যেকোনো ধরনের মাদক) ও ধূমপান (সিগারেট) হারাম ও কবিরা গুনাহ। তার উগ্র স্বভাব, মিথ্যা কথা, রাগ ও পরিবারের প্রতি দায়িত্বহীনতা গুরুতর অন্যায়। আপনার কর্তব্য:
- তাকে বারবার নাসীহত (উপদেশ) দেওয়া, তবে রাগের সময় নয়, বরং শান্তভাবে।
- আল্লাহর কাছে দোয়া করা।
- সম্ভব হলে আলেম বা সম্মানিত লোকের মাধ্যমে তাকে বোঝানো।
- যদি সে না মানে, তবে তাকে ইসলামী পরামর্শ ও চিকিৎসার জন্য উৎসাহিত করুন (নেশা ছাড়ার সেন্টার)।
২. স্বামীর আর্থিক দায়িত্ব ও আপনার করণীয়
স্বামীর ওপর স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ (খোরপোষ) ফরজ। সে যদি তা না দেয়, তবে শরীয়ত আপনাকে অনুমতি দিয়েছে:
-
আপনি তার অনুমতি ছাড়া তার সম্পদ থেকে প্রয়োজনীয় খরচ নিতে পারেন (যদি সে দিতে অস্বীকার করে)। তবে সতর্কতার সাথে নেবেন, অপচয় না করে।
দলিল: হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ হিন্দা (রা.)-কে তার স্বামীর সম্পদ থেকে সঙ্গতভাবে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন (বুখারী, মুসলিম)।
হানাফী ফিকহে বলা হয়েছে, স্ত্রী তার প্রয়োজনীয় খরচের জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার সম্পদ থেকে নিতে পারে যদি স্বামী না দেয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫০৭) -
আপনি নিজে কাজ করেন (আরবী পড়ানো) এবং মায়ের কাছ থেকে ধার নিচ্ছেন – এটি জায়েজ। তবে মায়ের টাকা হালাল কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত নন। সাধারণত সুদ ছাড়া অন্যত্র থেকে আসা টাকা হালাল। মা যদি সুদ না খান, তবে সেটা হালাল। আপনার মা সুদ খান কিনা – নিশ্চিত হওয়া জরুরি। যদি তিনি সুদের ব্যবসা বা সুদী ব্যাংকিং না করেন, তবে তার টাকা হালাল।
৩. তালাক (আলাদা হওয়া) কি করবেন?
ইসলামে তালাক অপছন্দনীয়, কিন্তু প্রয়োজনে জায়েজ। আপনার অবস্থা যদি অসহনীয় হয় – স্বামী নেশাগ্রস্ত, গালাগালি করে, খোরপোষ দেয় না, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে – তাহলে আপনি:
- প্রথমে পরিবার ও স্থানীয় আলেমের মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করুন।
- যদি তা না হয়, তাহলে খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক চাওয়া) করতে পারেন। এতে আপনাকে স্বামীকে কিছু সমঝোতা (মহর বা অন্য সম্পদ) ফিরিয়ে দিতে হতে পারে।
- আর যদি স্বামী তালাক দিতে অস্বীকার করে এবং আপনার ওপর জুলুম বাড়ায়, তাহলে ইসলামী আদালতের (বা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালত) মাধ্যমে ফাসখ (বিচ্ছেদ) নেওয়া যায়। অনেক আলেম বলেন, নেশাগ্রস্থ ও খোরপোষ না দেওয়া স্বামী থেকে বিচ্ছেদ পাওয়া স্ত্রীর জন্য বৈধ।
সন্তানদের বিষয়: হানাফী মতে, সন্তানদের হেফাজতের অধিকার (হিযানাহ) মায়ের। ছেলে ৭ বছর ও মেয়ে বয়োঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকে। তবে স্বামী যদি নেশাগ্রস্থ ও অযোগ্য হন, তাহলে আদালত সাধারণত মাকেই হেফাজত দেবে। আপনি আলাদা হলে স্বামী জোর করে সন্তান নিয়ে নিতে পারবেন না (ইসলামী ও আইনগতভাবে)।
৪. যাকাতের টাকা আপনি নিতে পারবেন কিনা
আপনার নিজের অবস্থা: আপনার কাছে কোনো সোনা নেই, আয় খুব কম (৪৫০০ টাকা মাসে + আরবী পড়ানোর বেতন) যা মাসিক খরচের তুলনায় অপ্রতুল। আপনি নিঃসন্দেহে যাকাতের হকদার (فقیر / مسکین)। ফলে অন্য কেউ যদি আপনাকে যাকাত দেয়, তা গ্রহণ করা জায়েজ ও উত্তম।
স্বামীর ‘জব জিবি ফান্ড’ (GPF) থেকে যাকাত: জব জিবি ফান্ড হলো সরকারি চাকরিজীবীদের বাধ্যতামূলক সঞ্চয় যা অবসর বা প্রস্থানের সময় পাওয়া যায়। হানাফী ফিকহে বর্তমান যুগের ফকীহদের মতে, এই ফান্ডের ওপর যাকাত ফরজ হয় না যতক্ষণ না তা হাতে আসে। কারণ যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত হলো সম্পদের ওপর পূর্ণ মালিকানা ও অধিকার (قبض)। GPF-এ টাকা জমা থাকলেও তা থেকে খরচ করার বা সম্পূর্ণ নিষ্পত্তির অধিকার নেই। তাই স্বামীর GPF-এর ওপর যাকাত ফরজ নয় (যদি না তিনি ইচ্ছা করলেও তা থেকে খরচ করতে পারেন, কিন্তু সরকারি নিয়মে তা সম্ভব নয়)।
তবে তার অন্যান্য সম্পদ (নগদ, ব্যাংক ব্যালেন্স, সোনা-রূপা ইত্যাদি) থাকলে তার ওপর যাকাত ফরজ হবে। আপনি বলেছেন তার অফিসের GPF ছাড়া অন্য কোনো সম্পদ সম্পর্কে জানেন না। সুতরাং তার ওপর যাকাত ফরজ কিনা নিশ্চিত নয়।
আপনার নিজের ওপর যাকাত ফরজ নয়, কারণ আপনার কাছে নেসাব (সাড়ে ৫২ তোলা রূপার মূল্য বা তার বেশি) সম্পদ নেই।
৫. আপনি কি যাকাত নিতে পারবেন?
হ্যাঁ, আপনি যাকাত নিতে পারবেন। আপনার কাছে মাসিক খরচের পর প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো সঞ্চয় নেই, বরং ঋণ ও কষ্টে আছেন। আপনি যদি যাকাত নেন, তাহলে তা দিয়ে চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা, ঘরভাড়া ইত্যাদি জায়েজ খাতে ব্যয় করতে পারেন।
৬. আপনার জন্য টিপস ও দোয়া
-
সবর ও দোয়া: নবী করীম ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করতে চায়, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন।” (বুখারী)
-
প্রতিদিন ফজরের পর ইস্তিগফার ও দরুদ পড়ুন।
-
সূরা বাকারা (২:২৮৬) “রَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا” দিয়ে দোয়া করুন।
-
পারিবারিকভাবে মধ্যস্থতা করুন। কোনো ইমাম বা স্থানীয় আলেমের মাধ্যমে স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
-
যদি সব চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং আপনার জীবন দুর্বিষহ হয়, তখন আইনগত ও শরীয়তসম্মত পন্থায় বিচ্ছেদের কথা চিন্তা করুন। তবে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথাও ভাববেন – আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন, তিনি উত্তম ব্যবস্থা করবেন।
উল্লেখিত ফিকহী কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (৩/৫০৭, ৫/২৩৭)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/১১২)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৩২৪)
- আল-হিদায়া (২/৪৮)
- আধুনিক ফাতাওয়ায়: মুফতি তাকী উসমানী, “বাহিশতী জেওর” (বিবাহ ও তালাক অধ্যায়), “যাকাতের বিধান” (GPF সম্পর্কে)
আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও শক্তি দিন, আপনার অবস্থার উত্তম সমাধান দিন। আমীন।
ইমেইলে বা পুনরায় প্রশ্ন থাকলে জানাবেন।