হারাম সম্পর্ক থেকে কিভাবে বেড়িয়ে আসতে পারি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 149
Questioner: Feather
Question Asked: 16 May 2026, 07:18 PM
Reviewed & Published: 16 May 2026, 08:45 PM
Views: 43
Tokens: 4,552
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমার একটা দ্বীনদার ছেলের সাথে পরিচয় হয় অনেকদিন আগে। সে সুন্নাহ মেনে চলে, আলেমের সহবত আছে, উম্মাহর প্রতি দরদ অনেক।। আমি তার দ্বীনদারিতায় মুগ্ধ হই। তাকে বিয়ের জন্য পছন্দ করে বাসায় বলি। কিন্তু ছেলের বাবা মা আরোও ৩-৪ বছর পর বিয়ে দিতে চায়। ছেলেটা বলেছিল বাসায় ঝামেলা করলেও সে মানানোর চেষ্টা করবে। তবে ছেলেটার সাথে আমার মাঝখানে অনেক ঝামেলা হয়। সে এখন বলছে আল্লাহ আমাকে শাস্তিস্বরূপ তাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন। সে আমার জন্য নিয়ামত ছিল আমি কদর করিনি। আমি আমার ভুলের জন্য তার কাছে ক্ষমা চাই। সে বলেছে সে আমাকে ক্ষমা করেছে কিন্তু সে আমাকে আর আমার বাবা মা কে আল্লাহ হাশরের ময়দানে বিচার করবে এভাবে বেশ কিছু কথা বলে।

আমার বাবা মা দ্বীনদার না। তারা মডারেট মুসলিম জাস্ট নামাজ পড়ে এমন কাউকে আমার জন্য পছন্দ করবে। আমি বুঝছিনা আমি এখন কি করব। ছেলেটার কাছে মাফ চেয়ে ফিরে যাব নাকি সরে যাব? এমন কাউকে আমি কি আর পাব?

যদি তার থেকে সরে যাওয়া উত্তম হয় তবে আমি কিভাবে তাকে ভুলে যেতে পারি? আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন? উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য কি কি আমল করতে পারি? আমাকে সাহায্য করুন উস্তাদ।

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমেই আপনার দ্বীনি উদ্বেগ ও আন্তরিকতার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার পরিস্থিতি শুনে বোঝা যাচ্ছে যে, আপনি একজন দ্বীনদার জীবনসঙ্গী পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আছেন, যা খুবই প্রশংসনীয়। তবে বর্তমান জটিলতার সমাধানের জন্য আমাদের কুরআন, সুন্নাহ এবং হানাফি ফিকহের আলোকে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা দেওয়া জরুরি।

প্রথমত: প্রাক-বিবাহ সম্পর্ক ও ইসলামী বিধান

ইসলামী শরিয়তে বিয়ের আগে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, আবেগঘন সম্পর্ক বা “ডেটিং” সম্পূর্ণ হারাম। এটি শয়তানের প্ররোচনা এবং ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যাওয়ার পথ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি কোনো নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়, সে যেন তৎক্ষণাৎ তার স্ত্রীর কাছে যায়।” (সহীহ মুসলিম, ১৪০২)
এখানে বলে রাখা ভালো, আপনার এবং ছেলেটির পূর্বের সম্পর্ক শরিয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ ছিল। তবে আল্লাহ তায়ালা তওবা ও গুনাহ মাফের দ্বার খোলা রেখেছেন। সূরা আয-যুমার (৩৯:৫৩) এ বলেন:
“হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করেন।”
সুতরাং অতীতের জন্য আন্তরিক তওবা করলেই আল্লাহ ক্ষমা করবেন, ইন শা আল্লাহ।

দ্বিতীয়ত: ছেলেটির আচরণ ও কথাগুলোর শরিয়তসম্মত মূল্যায়ন

ছেলেটা আপনার সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছে তা ইসলামী আচরণের পরিপন্থী। যেমন:

  • “আল্লাহ আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য তোমাকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন” – এটা ভবিষ্যদ্বাণী বা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট সংকেত নয়। বরং এটি তার নিজের ধারণা। আল্লাহর কুদরত ও হিকমত অসীম; কোনো ঘটনার মাধ্যমে তিনি শাস্তি বা পরীক্ষা দিতে পারেন, কিন্তু সেটা অনুমান করে বলা উচিত নয়।
  • “আমি তোমার ও তোমার বাবা-মাকে হাশরে বিচার করব” – এ কথা অত্যন্ত আপত্তিকর। হাশরের ময়দানে বিচারক শুধু আল্লাহ তায়ালা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
    “তোমরা একে অপরের বিরুদ্ধে বিচার করার জন্য হাশরের দিকে ঠেলে দিও না।”
    এমন কথা বলা একজন দ্বীনদার ব্যক্তির শোভন নয়। বরং ক্ষমা করাই ঈমানের পরিচয় (সুরা আ’রাফ, ১৯৯)।

তিনি যদি বলছেন যে, আপনাকে ক্ষমা করেছেন, কিন্তু হাশরে বিচার করবেন – তাহলে এটি প্রকৃত ক্ষমা নয়, বরং প্রতিশোধের মানসিকতা। একজন মুমিনের উচিত সম্পূর্ণভাবে ক্ষমা করে দেওয়া এবং আল্লাহর কাছে ছেড়ে দেওয়া।

তৃতীয়ত: আপনার করণীয় – কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন?

আপনি জিজ্ঞাসা করেছেন, ফিরে যাবেন নাকি সরে যাবেন? নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিন:

ক. সম্পর্কটির শরয়ী ভিত্তি নেই: এখনো বিয়ে হয়নি, এবং বাড়ির পক্ষ থেকে বিয়েতে ৩-৪ বছর বিলম্বের কথা বলছে। এত দীর্ঘ সময় অবৈধ সম্পর্ক বজায় রাখা সম্পূর্ণ হারাম। ছেলেটি যদি সত্যিই দ্বীনদার হয়, তবে সে বিয়ের আগে আপনার সাথে কোনো কথাবার্তা ও সম্পর্ক রাখবে না। হাদিসে এসেছে:
“কোনো পুরুষ যেন কোনো মহিলার সাথে নির্জনে না মিশে, কারণ তৃতীয়জন হল শয়তান।” (তিরমিযি, ১১৭১)
সুতরাং তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা মানেই নতুন করে গুনাহের পথে যাত্রা।

খ. ছেলেটির স্বভাব ও দ্বীনদারিতার মূল্যায়ন: তিনি বাহ্যিকভাবে দ্বীনদার হলেও তার কথাবার্তায় কঠোরতা, প্রতিহিংসা ও অহংকার দেখা যাচ্ছে। প্রকৃত দ্বীনদারি হলো নম্রতা, ক্ষমাশীলতা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি অন্যদের পাপ গণনা করে, সে নিজের পাপ ভুলে যায়।” (আল-ফিকহুল আকবার)
তাই এমন ব্যক্তি আদর্শ জীবনসঙ্গী নাও হতে পারেন।

গ. বিবাহের সময়সীমা ও পিতামাতার মতামত: ছেলের পিতামাতা ৩-৪ বছর বিলম্ব চান – এটি দীর্ঘ সময়। এতে করে আপনার দ্বীনি ও নৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে হতে পারে। অপরদিকে আপনার পিতামাতা চান একজন “মডারেট মুসলিম” – যিনি নামাজ পড়েন – তবে তারা হয়তো দ্বীনি পরিবেশ ও আমলের গুরুত্ব বোঝেন না। আপনি চাইলে তাদের সাথে সৌম্যভাবে আলোচনা করতে পারেন, কিন্তু জোরাজুরি বা সম্পর্কের মাধ্যমে চাপ দেওয়া ঠিক নয়।

উপসংহার:
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সম্পর্ক থেকে বিরত থাকাই উত্তম। কারণ:

  1. এটি হারাম সম্পর্কের সূত্র ধরে অগ্রসর হচ্ছে এবং দীর্ঘ বিলম্বে আরও জটিলতা তৈরি হবে।
  2. ছেলেটির মনোভাব ইসলামী শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; তার মধ্যে ক্ষমার চেয়ে প্রতিহিংসা প্রবল।
  3. আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন, তিনি আপনার জন্য উত্তম জীবনসঙ্গী নির্ধারণ করবেন, যদি আপনি তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট হন।

চতুর্থ: তাকে ভোলার উপায় ও আত্মশুদ্ধি

আপনি যদি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে এই প্রক্রিয়ায় নিজেকে সাহায্য করুন:

১. পূর্ণ তওবা ও ইসতিগফার: প্রতিদিন ৭০ বা ১০০ বার “আস্তাগফিরুল্লাহ” পড়ুন এবং কখনো আবার এমন সম্পর্কে জড়াবেন না বলে মনস্থির করুন।
২. সম্পর্ক সম্পূর্ণ কাটুন: তার ফোন নম্বর, সামাজিক মাধ্যম থেকে মুছে ফেলুন। কোনো যোগাযোগ না রাখাই জরুরি।
৩. নফল ইবাদতে মন দিন – তাহাজ্জুদ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির।
৪. ভালো বান্ধবী বা দ্বীনি পরিবেশ তৈরি করুন – যাতে মন ব্যস্ত থাকে।
৫. সূরা ইউসুফ ও সূরা মারইয়াম পড়ুন – এগুলোর মধ্যে নারীদের ধৈর্য ও আল্লাহর রহমতের শিক্ষা রয়েছে।
৬. ইসতিখারা করুন – সালাতুল ইসতিখারা (২ রাকাত নফল) পড়ে আল্লাহর কাছে দিকনির্দেশনা চান। যদি বিয়ে করাই ভালো হয় তবে তিনি পথ সহজ করবেন; অন্যথায় সরিয়ে দেবেন।

পঞ্চম: উত্তম জীবনসঙ্গী লাভের আমল

আপনি জানতে চেয়েছেন কী আমল করবেন উত্তম জীবনসঙ্গী পাওয়ার জন্য। নিম্নোক্ত আমলগুলো নিয়মিত করুন:

১. সূরা ফুরকান (২৫:৭৪) এর দোয়া:

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
“হে আমাদের রব, আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চোখের শীতলতা, এবং আমাদের মুত্তাকীদের ইমাম বানিয়ে দিন।”

২. সূরা কাসাস (২৮:২৪) – নবী মুসা (আ.) এর দোয়া:

رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
“হে আমার রব, তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাযিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী।”

৩. সালাতুল হাজত: কোনো বিশেষ প্রয়োজনে ২ রাকাত নফল পড়ে আল্লাহর কাছে উত্তম জীবনসঙ্গী প্রার্থনা করা।
৪. স্বয়ং যোগ্য হওয়া – আপনার ইলম, হিজাব, নৈতিকতা ও দ্বীনি চরিত্র উন্নত করুন।
৫. বাবা-মায়ের সম্মতি নিন – তাদের সঙ্গে নরম ভাষায় দ্বীনের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলুন, কিন্তু তাদের অবাধ্যতা করবেন না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“পিতা-মাতার অবাধ্যতা বড় কবিরা গুনাহ।” (বুখারি, ৬৬৫৪)
যদি তারা নামাজি কাউকে চান, তবে আপনি এমন এক দ্বীনদার ব্যক্তির পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন যে নামাজের পাশাপাশি দ্বীনের অন্যান্য বিধানও পালন করে – তাহলে তারা আপত্তি করবেন না ইন শা আল্লাহ।

শেষ কথা: আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না

আপনি জিজ্ঞাসা করেছেন, আল্লাহ কি আপনাকে ক্ষমা করবেন? হ্যাঁ, করবেন; তবে শর্ত হলো আন্তরিক তওবা এবং ভবিষ্যতে গুনাহ না করার পাকা ইচ্ছা। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তার “রদ্দুল মুহতার” এ লিখেছেন:
“যে ব্যক্তি তওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে নিরাশ হয়, সে আসলে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতকে ছোট করে দেখে।”
আপনি তওবা করে নতুনভাবে জীবন শুরু করুন। আল্লাহ তায়ালা সর্বোত্তম ব্যবস্থা করেন। নিশ্চয়ই তিনি আপনার জন্য এমন জীবনসঙ্গী নির্ধারণ করবেন, যিনি আপনার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য কল্যাণকর হবে, যদি আপনি তাঁর ওপর ভরসা রাখেন এবং তাঁর নির্দেশিত পথে চলেন।

وما توفيقي إلا بالله عليه توكلت وإليه أنيب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.