নামাজ ও কোরআন তেলাওয়াতে দুনিয়াবি কষ্টের কারণে কান্না করলে নামাজ ভঙ্গ হয় কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
"1)দুনিয়াবি কষ্টের কারণে ফরজ নামাজ বা নফল নামাজের পুরোটা সময় অথবা শুধু সেজদাহ্ তে গিয়ে শব্দ করে কান্না করা বা সামান্য শব্দ করে কান্না করলে কি তার নামাজ ভেঙে যাবে? "
2) কোরআন তেলাওয়াত করার সময় যদি দুনিয়াবি কষ্টের কারণে কোন আয়াতের মাঝখানে এসে কান্না করার কারণে চোখ ঝাপসা হয়ে যায়, আর তখন কোরান তেলাওয়াত বিঘ্ন ঘটে (যদিও অনিচ্ছাকৃত) তাহলে কি পাপ হবে?
3) আল্লাহর ভয়ে+ দুনিয়াবি এই দুটি কারণ একসাথে হলে,যেকোন নামাজ অথবা কোরান তেলাওয়াত করার সময় কান্না আসলে যদি নামাজে ও তেলাওয়াত করার সময় সামান্য বিঘ্ন ঘটে তাহলে কি গোনাহ হবে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, নামাজ ও কোরআন তেলাওয়াত উভয়ই ইবাদত। ইবাদতের সময় কোনো কিছু যদি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয় বা ইবাদতের আদবের পরিপন্থী হয়, তাহলে সেটি সমস্যার সৃষ্টি করে। তবে অনিচ্ছাকৃত বা স্বাভাবিক কারণে কিছু ঘটলে তা সাধারণত ক্ষমার যোগ্য।
নিচে আপনার তিনটি প্রশ্নের উত্তর হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে পেশ করা হলো:
১) নামাজে দুনিয়াবি কষ্টের কারণে কান্না করা ও নামাজ ভঙ্গ হওয়ার বিধান
নামাজের মধ্যে কান্না করা দুই প্রকার:
ক) আল্লাহর ভয়ে কান্না:
যদি কেউ আল্লাহর ভয়ে বা জান্নাত-জাহান্নামের চিন্তায় কান্না করে, তাহলে তা নামাজের জন্য প্রশংসনীয় এবং নামাজ ভঙ্গ হয় না। এমনকি যদি সামান্য শব্দও বের হয়, তাতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ এটা ইবাদতের সৌন্দর্য ও নম্রতার পরিচায়ক।
খ) দুনিয়াবি কষ্টের কারণে কান্না:
হানাফি ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রাদ্দুল মুহতার’ (১/৬২৪) ও ‘ফাতাওয়া হিন্দিয়া’ (১/১০৭)-তে বর্ণিত আছে, নামাজে যদি দুনিয়াবি কোনো কষ্ট বা বেদনার কারণে কান্না আসে এবং তা থেকে ‘আহ’, ‘ওহ’, ‘উহ’ ইত্যাদি স্পষ্ট শব্দ বের হয় যা দুটি হরফ বিশিষ্ট হয়, তাহলে সেই শব্দ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বের করা হয়, তবে নামাজ ভেঙে যাবে। আর যদি অনিচ্ছাকৃত হয়, তবে নামাজ ভঙ্গ হবে না, তবে আদবের খেলাফ হবে।
সারসংক্ষেপ:
- শুধু সেজদায় গিয়ে বা নামাজের যেকোনো অংশে যদি দুনিয়াবি কষ্টের কারণে ‘আহ’, ‘ওহ’ ইত্যাদি উচ্চারিত হয় এবং তা দুই হরফ পরিমাণ হয়, তাহলে নামাজ ভেঙে যাবে (যদি ইচ্ছাকৃত হয়)।
- আর যদি কান্না হয় শুধু চোখের পানি ঝরানো বা নিঃশব্দে কান্না, তাহলে নামাজ ভঙ্গ হবে না।
রেফারেন্স:
- “আল-হিদায়া”: নামাজে কান্না করলে যদি ‘হা’, ‘আহ’ শব্দ বের হয়, তাহলে ‘ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে নামাজ ভেঙে যায়’ (ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মতে ভঙ্গ হয় না, কিন্তু হানাফি ফিকহে অধিক প্রচলিত মত হলো ইমাম আবু হানিফার মত)।
- “ফাতাওয়া উসমানি” (২/২৮৬): দুনিয়াবি কষ্টের কারণে কান্নার শব্দ বের হলে নামাজ ভঙ্গ হবে।
২) কোরআন তেলাওয়াতের সময় দুনিয়াবি কষ্টের কারণে কান্না করে চোখ ঝাপসা হয়ে গেলে তেলাওয়াতে বিঘ্ন ঘটার বিধান
কোরআন তেলাওয়াতের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে যদি কান্নার কারণে চোখ ঝাপসা হয় এবং তেলাওয়াত কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে, তাহলে কোনো পাপ হবে না। কারণ এটি অনিচ্ছাকৃত। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” (সূরা বাকারা, ২:২৮৬)
তবে ইচ্ছাকৃতভাবে যদি কান্না করে তেলাওয়াত বন্ধ রাখা হয়, তাহলে আদবের পরিপন্থী হবে এবং এর জন্য তাওবা করা উচিত।
মা‘আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.))-এ তেলাওয়াতের আদব সম্পর্কে বলা হয়েছে, তেলাওয়াতের সময় কান্না আসা প্রশংসনীয়, কিন্তু ইবাদতের ধারাবাহিকতা ভঙ্গ করা উচিত নয়।
৩) আল্লাহর ভয় ও দুনিয়াবি কষ্ট উভয় কারণ একসাথে হলে নামাজে বিঘ্ন ঘটলে গুনাহ হবে কি?
এক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো গালিব (প্রধান) কারণ কী?
- যদি আল্লাহর ভয় প্রাধান্য পায় এবং কান্না আসে, তাহলে নামাজের মধ্যে সামান্য শব্দ হলেও তা ক্ষমার যোগ্য, বরং প্রশংসনীয়।
- যদি দুনিয়াবি কষ্ট প্রাধান্য পায় এবং তাতে দুই হরফ পরিমাণ শব্দ ইচ্ছাকৃতভাবে বের হয়, তাহলে নামাজ ভেঙে যাবে এবং তা গুনাহ হবে।
ফাতাওয়া হিন্দিয়া ও ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে এসেছে, নামাজে কান্নার বিধান নির্ভর করে উদ্দেশ্য ও কারণের ওপর। যদি ইচ্ছা দুনিয়ার জন্য হয়, তবে তা নিন্দনীয়; আর যদি আখিরাতের জন্য হয়, তবে প্রশংসনীয়।
সারমর্ম:
- নামাজে বা তেলাওয়াতে আল্লাহর ভয়ে কান্না এলে কোনো সমস্যা নেই, বরং সওয়াব আছে।
- দুনিয়াবি কারণে কান্না এলে এবং তা থেকে শব্দ বের হলে নামাজ ভঙ্গের আশঙ্কা থাকে।
- অনিচ্ছাকৃত কোনো কিছু হলে পাপ হবে না, কারণ আল্লাহ তায়ালা ভুল ও অনিচ্ছাকৃত কাজ ক্ষমা করেন।
- ইচ্ছাকৃতভাবে দুনিয়াবি কষ্টের কারণ দেখিয়ে ইবাদতে বিঘ্ন ঘটানো অনুচিত।
আপনার করণীয়:
আপনার কান্না যদি আল্লাহর ভয়ে হয়, তাহলে তা প্রশংসনীয়। আর যদি দুনিয়াবি কোনো কারণে হয়, তাহলে নামাজ অবস্থায় তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে নামাজের বাইরে গিয়ে কান্না করুন। আর অনিচ্ছাকৃত কিছু ঘটলে, তা আল্লাহর রহমতের ওপর ছেড়ে দিন এবং তাওবা করুন।
উপসংহার:
আপনার প্রশ্নগুলোর মূল উত্তর হলো—নামাজ ও কোরআন তেলাওয়াতের সময় যদি আল্লাহর ভয়ে কান্না আসে, তবে তা ইবাদতের পরিপূর্ণতা; আর দুনিয়াবি কারণে কান্নার শব্দ ইচ্ছাকৃতভাবে বের করলে নামাজ ভেঙে যেতে পারে এবং অনিচ্ছাকৃত হলে পাপ নেই।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ইবাদতে একাগ্রতা ও খুশু দান করুন। আমিন।
রেফারেন্স গ্রন্থ:
- রাদ্দুল মুহতার (১/৬২৪)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১০৭)
- ফাতাওয়া উসমানি (২/২৮৬)
- মা‘আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/২৫০)
- বেহেশতি জেওর (নামাজের মধ্যে কান্না সম্পর্কিত অংশ)