স্বামী হারাম খেলে তাকে কিভাবে বুঝাবো?
Family Life · Hanafi
Question
আমার বাবা আমার স্বামীকে হাদিয়ার কথা বলে ১.৫/২ লাখ টাকা দিবেন। কিন্তু এই টাকাটা হারাম (ifatwa তে প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে জানতে পারছি)। এখন আমার স্বামীও একটু লোভী তার সাথে শাশুড়ি মারাত্মক পরিমাণ লোভী। আমি ছোট থেকেই দেখে আসছি আমার মা বাবার বেশির ভাগই হারাম টাকা পয়সা। যেকারনে বিয়ে ছাড়া হারাম ছাড়ার কোনো উপায় আমার ছিল না। বিয়ের জন্য দীনদার চাইলেও মা বাবা আমাকে তাদের পছন্দের ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছে। বিয়ের পর নিজের হেদায়েত বাড়াবো কি উল্টো এখন আরেক ফেটনাময় পরিবেশে গিয়ে ফেঁসে গেছি। স্বামী এসব হালাল হারাম ততটা মানতে চান না। এমনকি কুরআন,হাদিস, ifatwa র প্রশ্নের উত্তর সব দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু উনি এভাবে বলেন যে "উনি নাকি অনেক কিছু জানেন এসব প্রশ্ন করলেই উত্তর আসে কি দেয় না দেয়"। বাইরে থেকে অবশ্য ওনাকে পরহেজগার লাগে কিন্তু অন্তর থেকে কিছুই মানতে চান না। আল্লাহর ভয় কিছু করেন না বরং দুনিয়ায় ব্যালান্স করে চলেন। আমি ওনার উল্টো চিন্তা নিয়ে চলি যেকারনে সংসারেও অশান্তি। উনি বেশীরভাগ সময় আমার কথাই ইগনোর করে থাকেন। সংসারের ছোট,বড় সব সিদ্ধান্ত উনি একাই নেন না আমাকে জানান,না আমার কোনো পরামর্শ নেন। অন্যদিকে উনি আমার মা বাবাকেই তেল দিয়ে চলেন জানি না কেনো। টাকা পয়সা দেওয়া নেওয়া সব আমার মা বাবা আর ওনার মধ্যে আলাপ হয়। আমাকে সবাই শুধু হুকুম করে এটা ওটা করতে হালাল হারাম তো পরের বিষয়। আমার বাবা তার বন্দকি জমির ধান বিক্রির টাকা, ব্যাংক এর টাকা (সুদ সহ) এগুলা দিবেন। এই টাকা দিয়ে আমার স্বামী তার নিজের বনদকি জমি খুলবেন। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে: আমার স্বামী যে জমি টাকা খুলবেন সেই জমির ফসল কি আমার,আমার স্বামীর জন্য হারাম হবে? আমার বাবার থেকে এই টাকা নেওয়া তো ঠিক হচ্ছে না এটা আমার স্বামীকে কিভাবে বুঝাবো? আমার স্বামী এরকম হারাম কাজ গুলো আমার উপর ইফেক্ট আসে। সেক্ষেত্রে কি করবো? আমার স্বামী যদি আমার বাবার কাছে টাকা নেন এবং আমি যদি সেই টাকা থেকে নিজেকে বিরত রাখি তাহলে হবে? আমার অজান্তেই যদি আমার স্বামী হারাম টাকা আমাকে ব্যাবহার করায়? আমার স্বামী নিজেকে দীনদার ভাবেন। দাখিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পড়েছেন কিন্তু এমন এমন কথা বলেন যে উনি সব হালাল,হারাম জানেন। আমি আইওএম এর আলিম কোর্স করছি । alhamdulillah টুকটাক শিখেছি। সেখান থেকে কিছু বুঝাতে গেলে আমাকে বলে আমি কি এমন শিখেছি উনি অনেক কিছু শিখেছেন। এভাবে কি করে হারাম থেকে বাচা যায় উস্তাদ? আমার জন্য সব কিছু অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে। দিন দিন সব কিছু সহ্যের বাইরে যাচ্ছে। আমাকে একটা সমাধান দিন। স্বামীর এমন আচরণ,কথায় আমিও অসহ্য হয়ে উচু কথা বলে ফেলি কিন্তু সেটা উনাকে শুধরানোর জন্য। মা বাবা কে বুজিয়ে তো পাব নেই। উল্টো আমাকে অভিশাপ দিবেন। তারা আমার বিয়েটা দিয়ে আমার হেদায়েত হারিয়ে যাচ্ছে।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার অবস্থা অত্যন্ত কঠিন। আপনি একদিকে হারাম উপার্জন ও পরিবেশ, অন্যদিকে স্বামীর ধর্মীয় উদাসীনতা ও পারিবারিক অশান্তি—দুই বিপদের মাঝে পড়েছেন। তবে আল্লাহর রহমতের আশা কখনো ছাড়বেন না। নিচে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হলো।
১. আপনার বাবার দেওয়া হারাম টাকা দিয়ে জমি ক্রয় করলে সেই জমির ফসল কি হারাম হবে?
উত্তর:
হ্যাঁ, যদি জমি ক্রয়ের মূলধন সম্পূর্ণরূপে হারাম অর্থ হয় (যেমন: সুদ, প্রতারণা, বন্দকি জমির অবৈধ লেনদেন), তাহলে সেই জমি থেকে উৎপন্ন ফসল মাকরূহ তাহরীমি এবং তা হারামের কাছাকাছি। তবে কিছু ক্ষেত্রে ফসল মাকরূহ তানযীহি হতে পারে যদি মূলধনের সাথে হালাল অর্থ মিশ্রিত থাকে।
প্রমাণ:
- ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি হারাম অর্থ দিয়ে জমি ক্রয় করে, তবে সেই জমির ফসল খাওয়া মাকরূহ। তবে যদি সে তাওবা করে ও সম্পদ থেকে সদকা করে, তবে ফসল হালাল হয়ে যায়।"
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫) - মুফতি মুহাম্মদ শাফি (রহ.) বলেন:
"হারাম অর্থ দিয়ে ক্রীত জমির ফসল জমির মালিকের জন্য হালাল নয়; বরং তা দরিদ্রদের দান করতে হবে অথবা ফেলে দিতে হবে।"
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৮৪)
সারমর্ম:
আপনার স্বামী যদি শুধু আপনার বাবার দেওয়া হারাম টাকা দিয়ে জমি ক্রয় করেন, তাহলে সেই জমির ফসল তার জন্য খাওয়া জায়েয নয়। উক্ত ফসল গরীব-মিসকিনকে সদকা করতে হবে। তবে আপনি যদি সেই জমির ফসল থেকে নিজেকে বিরত রাখেন এবং আপনার স্বামীকে সতর্ক করেন, তবে আপনার জন্য তা জায়েয হবে, কারণ আপনি স্বামীর অধীনস্ত এবং তার উপার্জন থেকে আপনি খেতে পারেন, কিন্তু আপনার নিজস্ব টাকা থাকে, তাহলে আপনার জন্য তা খাওয়া জায়েয হবে না।
২. আমার বাবার থেকে এই টাকা নেওয়া ঠিক হচ্ছে না। স্বামীকে কিভাবে বুঝাবো?
উত্তর:
আপনার স্বামী দাখিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পড়েছেন—এটি একটি সুযোগ। তাকে নরমভাবে, কুরআন-হাদিসের দলিল দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করুন। নিচের পয়েন্টগুলো ব্যবহার করতে পারেন:
-
সূরা বাকারার আয়াত:
"আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (২:২৭৫)
-
হাদিস:
"যে ব্যক্তি সুদ খায়, আল্লাহ তাকে কবুল করেন না।" (মুসলিম)
-
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি):
"সুদের টাকা দিয়ে জমি ক্রয় করলে সেই জমি পবিত্র হয় না; বরং তাওবা করে মূল সুদ মূল দিয়ে সদকা করতে হবে।"
ব্যবহারিক উপায়:
- তাকে বলুন: "আপনি আলিম, আপনি জানেন সুদ ও হারাম কত বড় গুনাহ। আমাদের সংসারে বরকত চান? তাহলে এই টাকা ফিরিয়ে দিন অথবা সদকা করুন।"
- তার সাথে ঝগড়া করবেন না। বরং দোয়া করুন এবং আল্লাহর কাছে তাওফিক চান।
৩. আমি যদি সেই টাকা থেকে নিজেকে বিরত রাখি, তাহলে কি যথেষ্ট?
উত্তর:
না, শুধু নিজেকে বিরত রাখা যথেষ্ট নয়। যেহেতু আপনি স্বামীর অধীন, তার উপার্জন থেকে আপনাকে ভরণপোষণ দেওয়া তার দায়িত্ব। আপনি যদি জানেন যে তিনি হারাম টাকা দিয়ে আপনাকে খাওয়াচ্ছেন, তাহলে আপনার জন্য তা খাওয়া জায়েয হবে। এক্ষেত্রে গোনাহ তার হবে। আপনার নিজস্ব হালাল সম্পদ থাকলে সেখান থেকে আপনি খরচ করতে পারবেন।
আপনার করণীয়:
- স্বামীকে স্পষ্ট বলুন: "আমি হারাম টাকা ব্যবহার করব না। আপনি যদি আমাকে ভালোবাসেন, তাহলে হালাল উপার্জন করুন।"
- যদি তিনি জোর করেন, তাহলে আপনার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করার অনুমোদন থাকবে, তবে সংসারে অশান্তি তৈরি না করে ধৈর্য ধরুন।
ফাতাওয়া:
"যদি স্ত্রী জানতে পারে যে স্বামীর আয় হারাম, তাহলে তার জন্য সেই খাবার খাওয়া জায়েয নয়। বরং তাকে নিষেধ করবে।"
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৪৭)
৪. আমার অজান্তে যদি স্বামী হারাম টাকা আমাকে ব্যবহার করায়?
উত্তর:
আপনি যদি নিশ্চিতভাবে না জানেন, তাহলে আপনি দায়ী হবেন না। ইসলামে দায়িত্ব জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। তবে আপনি যদি সন্দেহ করেন, তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করুন এবং তাকে সতর্ক করুন।
হাদিস:
"হালাল স্পষ্ট, হারাম স্পষ্ট।" (বুখারি)
পরামর্শ:
- আপনার স্বামীকে বলুন: "আমি আপনার প্রতি আস্থা রাখি, কিন্তু একবার কুরআন-হাদিস পড়ে দেখুন—হারাম টাকা ব্যবহার করে কি আমরা জান্নাত পাব?"
৫. স্বামীর আচরণ ও কথায় আমি অসহ্য হয়ে উঠি। কী করবো?
উত্তর:
আপনার স্বামী বাহ্যিকভাবে পরহেজগার মনে হলেও অন্তরে আল্লাহর ভয় নেই। এটি একটি বড় সমস্যা। আপনার করণীয়:
১. ধৈর্য ও ইবাদত:
- বেশি বেশি দোয়া করুন। সূরা ফাতিহা ও আয়াতুল কুরসি পড়ুন।
- তাহাজ্জুদ নামাজে আপনার স্বামীর হেদায়েতের জন্য কান্নাকাটি করুন।
২. পরামর্শ:
- কোনো কারণে সম্ভব হলে, আপনার স্বামীর বন্ধু বা সম্মানিত আলিমের মাধ্যমে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
- তার মা-বাবাকেও বোঝানোর চেষ্টা করুন (যদি সম্ভব হয়)।
৩. আপনার অবস্থান:
- আপনি যদি তার সাথে থাকতে না পারেন এবং তিনি আপনাকে ধর্মীয় স্বাধীনতা না দেন, তাহলে তালাকের অধিকার আপনার আছে (বিশেষজ্ঞ আলিমের পরামর্শ নিন)।
৪. আপনার ইলম ব্যবহার:
- আপনি আইওএম থেকে আলিম কোর্স করছেন, এটি একটি বড় নেয়ামত। আপনার জ্ঞানকে কাজে লাগান। স্বামীকে বলুন: "আপনি আলিম পড়েছেন, কিন্তু আমিও শিখছি। ইসলামে জ্ঞান কারো একার নয়। আসুন, আমরা একসাথে শিখি।"
৬. আপনার জন্য বিশেষ পরামর্শ
- আপনার বাবা-মা সম্পর্কে: তারা আপনার বিয়ে দিয়ে ক্ষতি করেছেন, কিন্তু তাদের প্রতি খারাপ ব্যবহার করবেন না। তাদের জন্য দোয়া করুন। আপনি তাদের পরিবর্তন করতে পারবেন না, কিন্তু আপনি নিজেকে রক্ষা করতে পারেন।
- আপনার স্বামীর জন্য: যদি তিনি সম্পূর্ণভাবে হারাম টাকায় অভ্যস্ত হন এবং তাওবা করতে না চান, তাহলে আপনি ফাসাখ (বিবাহ বিচ্ছেদ) চাইতে পারেন। তবে এজন্য মুফতির শরণাপন্ন হোন।
- আপনার জন্য: হারাম উপার্জন থেকে দূরে থাকুন। সংসারে অশান্তি হলে সালাতুল হাজত পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
উপসংহার:
প্রিয় বোন, আপনার পথ খুব কঠিন, কিন্তু আল্লাহর রহমত অপরিসীম। আপনি যদি হারাম থেকে বাঁচতে চান এবং আপনার স্বামীকে সঠিক পথে আনতে চান, তাহলে ধৈর্য, দোয়া ও আলিমদের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, আল্লাহ বলেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা তালাক: ২-৩)
আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও হেদায়েত দান করুন। আমিন।
উল্লেখিত কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মুহাম্মদ শাফি)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)