নামাজে একটি আয়াত শেষ করতে কয়েকবার শ্বাস নেওয়া প্রসঙ্গে
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
নামাজে কুরআন তিলাওয়াতকালে একটি আয়াত শেষ করতে কয়েকবার শ্বাস নেওয়া বৈধ এবং এতে নামাজ কোনোভাবেই নষ্ট হয় না। তবে শ্বাস নেওয়ার জন্য যে বিরতি হয়, তা যেন আয়াতের অর্থগত ধারাবাহিকতা নষ্ট না করে এবং স্বাভাবিক তিলাওয়াতের নিয়মের মধ্যে থাকে। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা পেশ করা হলো।
১. মূলনীতি: নামাজে শ্বাস নেওয়া স্বাভাবিক কাজ
নামাজে তিলাওয়াতের সময় শ্বাস নেওয়া একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া। হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে, নামাজে কোনো ব্যক্তি যদি তিলাওয়াতের সময় শ্বাস নেওয়ার জন্য থামেন, তবে তা নামাজের বৈধতার উপর কোনো প্রভাব ফেলে না। বরং এটি মাকরূহও নয়; বরং জায়েয।
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) -এ উল্লেখ আছে:
"إذا قطع القراءة لتنفس أو سعال أو عطاس لا يضر، لأنه ضروري"
"যদি কেউ শ্বাস নেওয়া, কাশি বা হাঁচির জন্য তিলাওয়াত বন্ধ করে, তবে তাতে কোনো ক্ষতি নেই, কারণ এটি প্রয়োজনীয়।"
(রদ্দুল মুহতার, ১/৫৪১)
ফতোয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি) তেও বলা হয়েছে:
"ولو قطع القراءة لتنفس أو نحوه جاز، ولا يفسد بها الصلاة"
"যদি শ্বাস নেওয়া বা তদ্রূপ কোনো কারণে তিলাওয়াত বন্ধ করে, তবে জায়েয আছে এবং নামাজ নষ্ট হয় না।"
(ফতোয়া হিন্দিয়া, ১/১০৮)
২. এক আয়াত শেষ করতে একাধিক শ্বাস নেওয়া
একটি পূর্ণ আয়াত তিলাওয়াত করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে দুই বা ততোধিক শ্বাস নেওয়া কোনো নিষিদ্ধ কাজ নয়। বরং তিলাওয়াতের সৌন্দর্যের জন্য যেখানে শ্বাস নেওয়া দরকার, সেখানে তা করা যায়। তবে হানাফি ফিকহের ইমামগণ বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বনের কথা বলেছেন, যেমন—একটি আয়াতের মাঝে না থেমে অর্থসম্পূর্ণ হওয়ার পর থামা উত্তম। কিন্তু যদি আয়াতটি দীর্ঘ হয়, তাহলে মাঝে থেমে শ্বাস নেওয়ার অনুমতি আছে।
ফতোয়ায়ে উসমানি তে এসেছে:
"আয়াতের মাঝে শ্বাস নেওয়ার জন্য থামলে নামাজ নষ্ট হয় না, তবে আয়াতের অর্থ এমনভাবে ভাঙা উচিত নয় যাতে অর্থ বদলে যায়। যেমন 'بسم الله الرحمن الرحيم' পড়ার সময় 'الرحمن' এর পর শ্বাস নেওয়া ঠিক নয়, কারণ তাহলে 'الرحيم' আলাদা হয়ে যাবে। কিন্তু 'الرحمن الرحيم' সম্পূর্ণ করে থামা ভালো।"
(ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/২৫৩)
অতএব, কেউ যদি একটি দীর্ঘ আয়াত (যেমন সূরা বাকারার আয়াতে কুরসি বা সূরা মায়িদার শেষ আয়াত) তিলাওয়াত করে এবং স্বাভাবিক শ্বাসের প্রয়োজনে দুই-তিনবার বিরতি নেয়, তবে তা জায়েয এবং নামাজ সহীহ হবে।
৩. তিলাওয়াতের আদব ও পদ্ধতি
উত্তম হলো, যেখানে তিলাওয়াতের স্বভাবিক নিয়মে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ থাকে, সেখানে থামা। যেমন—আয়াতের শেষে বা অর্থপূর্ণ বিরতিতে। কিন্তু বাধ্য হয়ে মাঝখানে থামলেও নামাজের কোনো ক্ষতি নেই। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে আয়াতের অর্থ নষ্ট করে (যেমন 'আল্লাহ' শব্দের পর থেমে পরে 'রহমান' পড়া) তিলাওয়াত করা মাকরূহ। কিন্তু তাও নামাজ নষ্ট করে না; শুধু মাকরূহ তানজিহি (নিকটবর্তী মাকরূহ) হয়। (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৪৭)
৪. সারসংক্ষেপ
- নামাজ সহীহ হবে। একাধিক শ্বাস নেওয়া নামাজের কোনো ক্ষতি করে না।
- মাকরূহ নয় যদি স্বাভাবিক প্রয়োজন বা দীর্ঘ আয়াতের কারণে হয়।
- সতর্কতা: সম্ভব হলে আয়াতের শেষে বা অর্থপূর্ণ জায়গায় থামা উত্তম; তবে বাধ্য হলে মাঝখানেও থামা বৈধ।
উল্লেখযোগ্য হানাফি কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফতোয়া হিন্দিয়া
- ফতোয়ায়ে উসমানি
- বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- ইমদাদুল ফতোয়া
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।