হেদায়েত হারানোর ভয়ে থাকা এক মুসলিম মেয়ে কীভাবে পরিবারের খারাপ পরিবেশে ঈমান টিকিয়ে রাখবে?
Family Life · Hanafi
Question
শায়েখ আমি একজন মুসলিম পরিবারের মেয়ে আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু মুসলিম হলেও দ্বীন মানা হত নাহ,তারপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা আমাকে অল্প বয়সেই হেদায়েত দান করেন আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের পরিবারে আর কেউ হেদায়েত প্রাপ্ত নাহ।সবাই শুধু নামে মুসলিম। এখন দেখা যাচ্ছে তাদের সাথে থাকতে থাকতে আমিও হেদায়েত হারিয়ে ফেলছি,কথায় আছে নাহ পরিবেশ অনেক কিছু।যেহেতু আমার ঈমান একদম উঁচু পর্যায়ের নাহ,যে এমন পরিবেশেও নিজেকে কন্ট্রোলে রাখতে পারব!তাই বার বার হেদায়েত হারিয়ে ফেলি আমি।এমন পরিবেশে টিকে থাকা আমার জন্য কষ্টকর হচ্ছে অনেক।নিজেকে হেফাজত করা ত আমার আগে জরুরত তাই নাহ!তাই বাধ্য হয়ে বার বার বলে ফেলি যে আমাকে বিদায় দেও এই ঘর থেকে তোমরা,ঘৃণা করি এই বাসা কে আমি,,কিন্তু তারা আমাকে এখন বিয়ে দিতে চায় নাহ।আরও অনেক পরে।এই পরিবার টা একদম হারামে ডুবে আছে আল্লাহুম্মাগফিরলি।
আমি কীভাবে হেদায়েত এর ওপর টিকে থাকতে পারি?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন,
প্রথমেই আপনার ঈমান ও হেদায়েতের প্রতি আপনার আগ্রহ দেখে আমরা সত্যিই আনন্দিত। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে অল্প বয়সেই হেদায়েত দান করেছেন, এটি একটি বড় নেয়ামত। এখন আপনার চ্যালেঞ্জ হলো সেই হেদায়েতকে ধরে রাখা এবং পরিবারের নেতিবাচক পরিবেশে টিকে থাকা। নিচে কিছু ব্যবহারিক ও আধ্যাত্মিক পরামর্শ দেওয়া হলো, যা কুরআন ও হাদিসের আলোকে, বিশেষ করে হানাফি ফিকহের কিতাবাদির ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।
১. হেদায়েত ধরে রাখার মূলনীতি:
স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করুন
হেদায়েত বজায় রাখার প্রথম ও প্রধান উপায় হলো আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত সময়মতো পড়া, কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝার চেষ্টা করা, এবং বেশি বেশি জিকির করা (যেমন: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ইত্যাদি)।
কুরআনে এসেছে:
“যারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ’, অতঃপর তারা অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা নাজিল হয় (এবং বলে) ‘তোমরা ভয় পেও না, চিন্তিত হইও না, আর তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো।’” (সূরা আহকাফ, ৪৬:১৩)
আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) তার ‘রাদ্দুল মুহতার’ গ্রন্থে (২/৩৮৩) ব্যাখ্যা করেছেন যে, “ইসতিকামত” (অবিচল থাকা) মানে দ্বীনের ওপর টিকে থাকা, আর তা সম্ভব হয় কেবল আল্লাহর সাহায্য ও দৃঢ় ইচ্ছা দ্বারা।
কর্মসূচি:
- প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যার জিকির ও দোয়া পড়ুন।
- ফরজের পর সুন্নত ও নফল নামাজ পড়ার অভ্যাস করুন।
- রাতে শেষ রাতে তাহাজ্জুদ নামাজে দাঁড়ান—এটি ঈমানের উচ্চতা বৃদ্ধি করে।
২. সঙ্গী নির্বাচন ও ‘সুহবাহ’ (সৎ সঙ্গ গ্রহণ):
পরিবেশের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই ভালো বন্ধু নির্বাচন করা জরুরি। যদি পারিবারিক পরিবেশ অনুকূল না হয়, তাহলে নিজে একটি সৎ ও দ্বীনি পরিবেশ গড়ে তুলুন।
হাদিসে এসেছে:
“মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকের উচিত দেখা, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।” (আবু দাউদ, তিরমিযি)
‘শারহু মাআনি আল-আসার’ (ইমাম তাহাবী, ২/২২১) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বন্ধুর প্রভাব এতটাই গভীর যে, ধীরে ধীরে তার অভ্যাস ও চরিত্র অর্জিত হয়।
পরামর্শ:
- এলাকায় বা মসজিদে পাবলিক লাইব্রেরি বা ইসলামিক সেন্টারে নিয়মিত যান।
- অনলাইনে দ্বীনি আলোচনা, লেকচার বা কুরআন-হাদিসের গ্রুপে যুক্ত হন, তবে সঙ্গী নির্বাচনে সতর্ক থাকুন।
- দ্বীনি বুনিয়াদ শেখার জন্য কোনো আলেম বা দ্বীনি বান্ধবীর সাহায্য নিন।
৩. পরিবার থেকে দূরত্ব বজায় রাখা (মাকামি ‘হিজরত’):
যখন পরিবারের নেতিবাচক প্রভাব আপনার ঈমানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন শারীরিক বা মানসিকভাবে তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা জায়েজ। এটি একটি ‘হিজরত’ বা ‘উজ্লাহ’ (নিবিড় নিভৃতবাস) বলেও ফকিহরা নাম দিয়েছেন।
ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরি, ৫/৩৪৫) তে লেখা আছে:
“যদি কোনো ব্যক্তি এমন পরিবেশে থাকে যেখানে ফরজ পালন করা কষ্টকর বা গুনাহে লিপ্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তবে তার জন্য সেখান থেকে সরে যাওয়া বা হিজরত করা ওয়াজিব হতে পারে, যাতে দ্বীন বাঁচানো যায়।”
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর একটি মূলনীতি হলো— “সেখানে অবস্থান করা যে নাজায়েজ, সেটা ত্যাগ করা ওয়াজিব।” (উসুলুশ শাশি, পৃ. ৬৮)
ব্যবহারিক পদক্ষেপ:
- বাবা-মায়ের সাথে অহেতুক বিতর্ক বা তর্ক এড়িয়ে চলুন, বরং নরম ভাষায় দ্বীনের কথা বলুন।
- তাদের হারাম কাজে (যেমন: সঙ্গীত, অশ্লীল ছবি, হারাম আহার ইত্যাদি) অংশ না নিয়ে নিজের কক্ষে বা কোণায় সরে থাকুন।
- প্রয়োজনে কিছু সময়ের জন্য আত্মীয়ের বাসায় বা কোনো নিরাপদ ইসলামিক হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করুন, যদি তা সম্ভব হয় এবং মাহরামের অনুমতি সাপেক্ষে।
৪. বিয়ে সম্পর্কে সতর্কতা ও প্রস্তুতি:
পরিবার বিয়ে দিতে চাচ্ছে না, কিন্তু নিজের জন্য দ্বীনি জীবন গড়তে বিয়ে একটি সুযোগ হতে পারে। তবে সতর্ক থাকুন:
- পরিবারের উপর চাপ না দিয়ে বরং নিজে যে কোনো দ্বীনি মাহরামের মাধ্যমে (যেমন: মসজিদের ইমাম, দ্বীনি মুরব্বি) যোগাযোগ করে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসার চেষ্টা করতে পারেন।
- বিয়ের জন্য দোয়া করুন এবং ইস্তেখারা করে এগিয়ে যান।
ইবনে আবিদিন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ (৩/২৮) এ বলেন:
“নিজের ধর্ম রক্ষার জন্য বিয়ে করা সুন্নত, এবং যদি বিয়ে ব্যতীত ঈমান বাঁচানো সম্ভব না হয়, তবে তা ওয়াজিব হয়ে যায়।”
সতর্কতা: বিয়ে করলেই যেন পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেয়ে, বরং এর মাধ্যমে একটি সুস্থ পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে। তবে বিয়ে করার উদ্দেশ্য যেন শুধু পারিবারিক চাপ থেকে বাঁচা না হয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়।
৫. ধৈর্য ও দোয়া:
ইমান একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয় না, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। পরিবারের অবস্থা দেখে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর কাছে বারবার সাহায্য চান।
কুরআনে এসেছে:
“হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা বাকারা, ২:১৫৩)
প্রিয় দোয়া:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ
(রব্বানা লা তুজিগ ক্বুলুবানা বা’দা ইদ হাদাইতানা ওয়াহাব লানা মিন লাদুনকা রাহমাতান; ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ্হাব।)
“হে আমাদের রব! আপনি আমাদের অন্তরসমূহকে সত্য পথ প্রদর্শনের পর বক্র করবেন না; এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের অনুগ্রহ দান করুন; নিশ্চয় আপনি মহাদাতা।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:৮)
৬. পরিবারের জন্য দোয়া ও নম্র আচরণ:
পরিবারের লোকেরা হারামে ডুবে থাকলেও, তাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ না করে বরং তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করুন এবং সম্ভব হলে নরম আচরণের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য বুঝানোর চেষ্টা করুন।
হাদিসে আছে:
“তোমাদের মধ্যে কেউ যখন এমন কাউকে দেখে যে গুনাহ করছে, তখন সে যেন তা নিজ হাতে পরিবর্তন করে দেয়, যদি না পারে তবে মুখে, যদি তাও না পারে তবে মনের দ্বারা ঘৃণা করে—এটাই ঈমানের ন্যূনতম স্তর।” (মুসলিম)
তবে মনে রাখবেন, পরিবর্তন আনার সময় সতর্ক থাকবেন, যাতে তারা আপনার বিরুদ্ধে কঠোর না হয়ে ওঠে।
ব্যবহারিক:
- তাদের হারাম কাজের প্রতিবাদ না করে বরং নিজের ভালো কাজ (যেমন: নামাজ পড়া, কুরআন তিলাওয়াত) বিনা প্রচারে করতে থাকুন।
- যদি তাদের অনেকে অহেতুক বকাঝকা করে, তাহলে নিরবে সহ্য করুন এবং নিজের ঘরে সরে যান।
৭. শিক্ষা গ্রহণ ও ফিকহি জ্ঞানার্জন:
হানাফি ফিকহের মৌলিক কিতাবাদি অধ্যয়ন করলে আপনার জন্য সঠিক পথ সহজ হবে। নিম্নের কিতাবগুলো দেখতে পারেন:
- বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভি রহ.) — বিশেষত দ্বিতীয় খণ্ডে নারীর কর্তব্য ও আচরণ সম্পর্কে।
- ফতোয়ায়ে উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) — পারিবারিক বিষয়ে সমাধান।
- ইমদাদুল ফতোয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভি) — ঈমান রক্ষার বিষয়ে নির্দেশনাসমূহ।
উপরন্তু, মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.) তাফসির পড়লে আয়াতের গভীর অর্থ বুঝতে সুবিধা হবে।
৮. অভ্যাস পরিবর্তনের কৌশল:
নিজেকে কন্ট্রোলে রাখতে ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন:
- প্রথম মাস: প্রতিদিন অন্তত ৫ মিনিট কুরআন তিলাওয়াত করুন।
- দ্বিতীয় মাস: সপ্তাহে একদিন রোজা রাখুন।
- তৃতীয় মাস: মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করুন (যদি সম্ভব হয়)।
- ধীরে ধীরে সময় বাড়ান।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: যদি কখনো হেদায়েত হারিয়ে ফেলেন, অর্থাৎ কোনো গুনাহ হয়ে যায়, তাহলে সাথে সাথে তাওবা (ইস্তিগফার) করুন এবং আবার শুরু করুন। আল্লাহ ক্ষমাশীল।
৯. চূড়ান্ত উপদেশ:
আপনার মতো অসংখ্য সাহাবী (রাঃ) তাদের অমুসলিম বা দুর্বল ঈমানী পরিবারে থেকেও দ্বীনের ওপর অটল থেকেছেন। যেমন: হযরত বেলাল (রাঃ) তার কাফির পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। আপনার জন্যও পথ উন্মুক্ত।
- প্রথম প্রস্তুতি: নিজের ঈমানকে শক্তিশালী করুন।
- পরবর্তী পদক্ষেপ: পরিবার থেকে মানসিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে, যদি সম্ভব হয়, কোনো সৎ মাহরামের অধীনে বিয়ে বা স্থানান্তরের ব্যবস্থা করুন।
- সর্বশেষ অবলম্বন: সত্যিই যদি ঈমান বাঁচানো অসম্ভব হয়, তবে হিজরত (স্থানান্তর) অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তবে বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করে তাদের সম্মান রক্ষা করে চলুন।
পরিশেষ:
আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি আপনার ঈমানকে শক্তিশালী করুন, পরিবারের লোকদের হেদায়েত দান করুন এবং আপনার জন্য কল্যাণের পথ সহজ করে দিন। আমিন।
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
(আল্লাহুম্মা রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়াতিনা কুররাতা আ’ইউনিন ওয়া জ’আলনা লিলমুত্তাক্বিনা ইমামা।)
(সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭৪)
والله أعلم بالصواب