ইসলামের দৃষ্টিতে শ্বশুরবাড়িতে “উত্তম” হওয়ার সঠিক পদ্ধতি কী?
Family Life · Hanafi
Question
হাদীসে আছে সেই ব্যক্তি উত্তম যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।শ্বশুরবাড়িতে তো কোন বউ হিসেবে উত্তম হতে পারিনা।তাদের কাছে উত্তম হতে হলে তাদের বাড়িতে থেকে তাদের সব কাজকর্ম করতে হবে,নিজের সাধ্যের বাহিরে গিয়ে সব করতে হবে,মাঝেমধ্যে না করলে আবার দোষ হয়ে যায়,আমাদেরকে বিভিন্ন কটু কথা শুনাবে, সেগুলো হজম করে আবার তাদের সাথে বসে বসে আড্ডা দিতে হবে,জড়াই ধরে ভালোবাসা দেখাতে হবে না হলে ভালো বলবেনা।আবার রাগ করে নিজেরাই ব্লক করে দেয়,সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়,তখনো নিজ থেকেই তাদের সাথে সম্পর্ক জুড়্র দিই।তাহলে এভাবে নিজের অনুভূতির কোন মূল্য নাই?অন্যের কাছে ভালো হওয়ার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিলেই উত্তম?আমার কি কষ্ট,রাগ,অভিমান কিছু হবেনা?
এটাই ইসলাম বলে?
আমি জানতে চাই ইসলামের দৃষ্টিতে কিভাবে উত্তম হবো শ্বশুরবাড়িতে?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী বোন, আপনার অনুভূতি ও কষ্ট আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারছি। ইসলাম আপনাকে আত্মত্যাগের নামে অবিচার সহ্য করতে বলেনি, বরং আপনার অধিকার, মর্যাদা ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। নিচে ইসলামের দৃষ্টিতে শ্বশুরবাড়িতে “উত্তম” হওয়ার সঠিক পদ্ধতি তুলে ধরা হলো।
১. “উত্তম ব্যক্তি সেই, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম” – হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম那人 যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।”
(তিরমিযী, হাদীস: ৩৮৯৫; ইবনু মাজাহ, হাদীস: ১৯৭৭; দারিমী, হাদীস: ২২৫৫)
এই হাদীসে “আহল” (পরিবার) বলতে মূলত স্ত্রী ও সন্তানদের বোঝানো হয়েছে। ইমাম তিরমিযী ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ এটিকে স্ত্রীর প্রতি সদয় হওয়ার প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তবে সাধারণভাবে পরিবারের সকল সদস্যের প্রতি সদয় হওয়াও উত্তম কাজ। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, নিজের অধিকার ও মানসিক স্বাস্থ্য বিসর্জন দিয়ে অন্যকে খুশি করতে হবে।
২. শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রীর কর্তব্য ও সীমারেখা
ইসলাম স্ত্রীকে শ্বশুর-শাশুড়ি বা দেবর-ননদের সেবা-যত্নের জন্য বাধ্য করেনি। স্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব হলো স্বামীর প্রতি আনুগত্য, সংসারের যৌক্তিক কাজ করা এবং নিজের ইবাদত-বন্দেগী করা। শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সাথে সদাচরণ সুপারিশকৃত, তবে তা সাধ্যের বাইরে বা অপমান ও কষ্ট সহ্য করে করতে হবে না।
-
কোরআনে এসেছে:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদয়ভাবে জীবনযাপন করো।”
(সূরা নিসা, ৪:১৯) -
হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন:
لاَ تُضَارَّ وَلاَ ضِرَارَ
“কারো ক্ষতি করা যাবে না, আর কারো প্রতিশোধে ক্ষতি করা যাবে না।”
(ইবনু মাজাহ, হাদীস: ২৩৪১; মুওয়াত্তা মালিক, হাদীস: ১৪৩৫)
অর্থাৎ, আপনি যদি কারো কাজ করে দেন বা ভালোবাসা দেখান, তা যেন আপনার জন্য ক্ষতির কারণ না হয়। যদি শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আপনার প্রতি অন্যায় আচরণ করে, তাহলে তাদের খুশি করার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়।
৩. আপনার অনুভূতি, কষ্ট ও অভিমানের মূল্য আছে
ইসলাম আপনার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেয়। রাসূল ﷺ নিজে স্ত্রীদের আবেগ-অনুভূতির খেয়াল রাখতেন। একবার তিনি বলেন:
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ أَغْضَبُ كَمَا تَغْضَبُونَ
“আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ, তোমরা যেমন রাগ করো, আমিও তেমন রাগ করি।”
(বুখারী, হাদীস: ৬১১৪; মুসলিম, হাদীস: ২৩১৫)
কষ্ট, রাগ, অভিমান – এগুলো স্বাভাবিক মানবিক আবেগ। ইসলাম এসব দমন করতে বলেনি, বরং তা নিয়ন্ত্রণ ও সঠিকভাবে প্রকাশ করতে শিখিয়েছে। আপনি যদি অন্যায় সহ্য করে নিজের অনুভূতি চেপে যান, তবে তা আপনার ঈমান ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
৪. শ্বশুরবাড়িতে উত্তম হওয়ার ইসলামী পদ্ধতি
আপনি শ্বশুরবাড়িতে উত্তম হবেন – মানে ইসলামসম্মতভাবে ভালো থাকবেন, নিজের অধিকার বজায় রেখে, খোদার সন্তুষ্টির জন্য। নিচের বিষয়গুলো মেনে চলুন:
ক. সুন্দর আচরণ ও ধৈর্য ধরুন, কিন্তু নিজের সীমা জানুন
-
কোরআনে আল্লাহ বলেছেন:
وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا أَصَابَكَ
“তোমাকে যা কষ্ট দেয়, তাতে ধৈর্য ধরো।”
(সূরা লুকমান, ৩১:১৭)
কিন্তু ধৈর্যের অর্থ অপমান সহ্য করা নয়; বরং প্রতিশোধ না নিয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। -
আপনি যদি সাধ্যের বাইরে কাজ করতে বাধ্য হন, তাহলে বিনয়ের সাথে অস্বীকার করতে পারেন। যেমন বলুন: “আমি এখন এতটুকুই পারব, আমার শারীরিক/মানসিক অবস্থা এর বেশি নিতে পারছে না।”
খ. স্বামীর সাথে পরামর্শ ও মধ্যস্থতা
- স্বামী আপনার সবচেয়ে কাছের আপনজন। তার সাথে আপনার কষ্টগুলো শেয়ার করুন। ইসলামে স্বামীর দায়িত্ব হলো স্ত্রীকে অন্যায় জুলুম থেকে রক্ষা করা।
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ
“পুরুষরা নারীর তত্ত্বাবধায়ক (এবং রক্ষক)।”
(সূরা নিসা, ৪:৩৪)
স্বামী যদি বুঝতে না চান, তবে তাকে হাদীসের আলোকে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
গ. সম্পর্ক ছিন্ন করলে নিজে উদ্যোগী হওয়ার প্রয়োজন নেই
- আপনি লিখেছেন, শ্বশুরবাড়ির লোকেরা রাগ করে ব্লক দেয়, সম্পর্ক ছিন্ন করে। তখন আপনি নিজেই আবার সম্পর্ক জোড়েন। ইসলাম সম্পর্ক জোড়ার জন্য উদ্যোগী হতে বললেও তা জোরপূর্বক বা অপমান সহ্য করে নয়।
لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثٍ
“কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইকে তিন দিনের বেশি সম্পর্কচ্ছিন্ন করে থাকা জায়েজ নয়।”
(বুখারী, হাদীস: ৬০৭৭; মুসলিম, হাদীস: ২৫৬০)
কিন্তু এই হাদীস উভয়পক্ষের জন্য। যদি তারা সম্পর্ক ছিন্ন করে, আপনার দায়িত্ব হলো তাদের প্রতি সুন্দর আচরণ বজায় রাখা, কিন্তু তাদের রাগাম্বিত আচরণ মেনে নেওয়া নয়। তারা যদি ফিরে আসতে চায়, তবে আপনি সাদরে গ্রহণ করবেন; কিন্তু যদি না চায়, তাহলে আপনি অপেক্ষা করতে পারেন বা স্বামীর মাধ্যমে সমাধান চান।
ঘ. ভালোবাসা জোর করে নয়, স্বাভাবিকভাবে
- আপনি জড়িয়ে ধরে ভালোবাসা দেখাতে বাধ্য হন – এটি জোরপূর্বক বা কপটতা হতে পারে। ইসলাম অন্তরে ভালোবাসা না থাকলে কৃত্রিমভাবে তা প্রকাশ করতে বলেনি। বরং ছোট ছোট সদাচরণ যথেষ্ট: হাসি, সালাম, সাহায্য (যদি ইচ্ছে হয়), দোয়া ইত্যাদি।
৫. ফিকহী দৃষ্টিকোণ – হানাফী মাযহাব
হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহে স্ত্রীর কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে:
- রদ্দুল মুহতার (২/৩৩৯): স্ত্রী শ্বশুরবাড়ির সেবা করতে বাধ্য নয়। শুধু স্বামীর সংসারের যৌক্তিক কাজ করাই তার দায়িত্ব।
- ফাতাওয়া উসমানী (২/২৮৭): শ্বশুর-শাশুড়িকে সম্মান করা উত্তম, কিন্তু তা স্ত্রীর উপর ফরজ নয়। যদি তারা অন্যায় আচরণ করে, তাহলে স্ত্রী তার অধিকার রক্ষা করতে পারে।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৩৪২): স্বামী যদি স্ত্রীকে তার পরিবারের সেবা করতে বাধ্য করে, তবে তা জায়েজ নয়; কারণ স্ত্রী শুধু স্বামীর সেবার জন্য দায়িত্বশীল।
অতএব, আপনি যদি নিজের ইচ্ছায় শ্বশুরবাড়ির কাজ করে দেন, তাহলে তা সওয়াবের কাজ। কিন্তু জোর করে বা অপমান সহ্য করে করলে তা আপনার জন্য বৈধ নয়; বরং আপনি অস্বীকার করতে পারেন।
৬. উপসংহার ও পরামর্শ
ইসলাম আপনার আত্মসম্মান ও অধিকার সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়। আপনি যেভাবে শ্বশুরবাড়িতে উত্তম হবেন:
- আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিন – মানুষের খুশির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি বড়।
- নিজের মানসিক ও শারীরিক সীমা জানুন – সাধ্যের বাইরে গিয়ে কাজ করা বা অপমান সহ্য করা ইসলামে উৎসাহিত নয়।
- স্বামীর সাথে সুসম্পর্ক ও খোলামেলা আলোচনা করুন – তিনিই আপনার প্রধান অভিভাবক।
- শ্বশুরবাড়ির সাথে সদাচরণ বজায় রাখুন, কিন্তু সীমালঙ্ঘন হলে বিনয়ের সাথে প্রতিবাদ করুন – চুপ করে থাকা জুলুম মেনে নেওয়ার নাম নয়।
- অন্যদের খুশি করতে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া নয় – হাদীসের “উত্তম” শব্দটি আপনার নিজের অধিকার ও মর্যাদা বজায় রেখেই অর্জন করতে হবে।
আপনার জন্য দোয়া করি, আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও সঠিক পথ দেখান। আমীন।