ডাক্তারি চিকিৎসার পাশাপাশি ইসলামি আমল
Family Life · Hanafi
Question
আমরা প্রায় আড়াইবছর যাবৎ কনসিভের ট্রাই করছি। আমাদের ডাক্তার তেমন কোনো সমস্যা পায় নি। অভুলেশন এর সময় অর্থাৎ যে সময় সহবাস করলে সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ঐ সময়টায় আমাদের এ ব্যাপারে তেমন আগ্রহ কাজ করে না৷
গতকাল আমি স্বপ্নে দেখেছি -'এক মহিলার অভয়ব যাকে আমি স্বপ্নের মধ্যেই জ্বীন বলে সম্বোধন করেছিলাম।'
আজ সকালে ফজরের পর আমি ঘুমের মধ্যে অনুভব করলাম যে -'আমার স্বামী আমাকে এতো শক্ত করে ধরে শুয়ে আছে যে আমি ছুটতেই পারছি না। অনেক চেষ্টা করেও পারছি না। তার মধ্যে জ্বীন ভর করছে তাই এতো শক্তিতে ধরে রাখছে। '
এরকম স্বপ্ন দেখলাম। এখন আমার সন্দেহ হচ্ছে আসলে সন্তানের জন্য ডাক্তারি চিকিৎসার পাশাপাশি রুকইয়াহ করবো? এসব স্বপ্ন দেখা কি স্বাভাবিক?
Answer
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার স্বপ্ন ও সন্তান লাভের প্রচেষ্টা সম্পর্কিত যে দুশ্চিন্তা ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে, তা স্বাভাবিক। নিচে ইসলামি নির্দেশনা অনুযায়ী স্পষ্ট উত্তর দেওয়া হলো।
১. স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও প্রভাব
আপনার বর্ণিত স্বপ্নগুলো (জিন দ্বারা প্রভাবিত হওয়া, স্বামীকে শক্ত করে ধরে রাখা) সাধারণত শয়তানী খেয়াল বা শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শন বলে গণ্য হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) শয়তানের পক্ষ থেকে দুঃস্বপ্ন বা ভীতি, (৩) মনের কল্পনা (দৈনন্দিন চিন্তা)।" (সহীহ বুখারী: ৭০১৭, সহীহ মুসলিম: ২২৬৩)
যেহেতু আপনার স্বপ্নে ভীতি ও জিনের প্রভাব দেখা গেছে, এটি শয়তানের প্ররোচনা হতে পারে। ইসলামে স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, বরং আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতে হবে এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে সকাল-সন্ধ্যার দু‘আ, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস নিয়মিত পড়তে হবে।
২. রুকইয়াহ করানো কি জরুরি?
ডাক্তারি চিকিৎসার পাশাপাশি রুকইয়াহ করানো বৈধ ও সুন্নাহ সম্মত, যদি মনে করেন কোনো জিনিn অস্বাভাবিক প্রভাব (যেমন: অতিরিক্ত ভয়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের সমস্যা) দেখছেন। তবে শর্ত হলো:
- রুকইয়াহ শুধুমাত্র কুরআন, হাদিসের দু‘আ ও বৈধ পদ্ধতিতে হতে হবে (অশ্লীল বাক্য, অন্ধবিশ্বাস নয়)।
- কুরআন তিলাওয়াত, বিশেষ করে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, দুই কুল (সূরা ফালাক ও নাস) এবং সূরা বাকারার শেষ আয়াতগুলো পড়ে ঝাড়–ফুঁক করলে উপকার হবে।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"যদি কেউ জিন বা বদনজরের কারণে রোগগ্রস্ত হয়, তবে কুরআন ও হাদিসের দু‘আ দ্বারা চিকিৎসা করানো জায়েজ।" (রদ্দুল মুহতার: ৬/৩৬৩)
৩. চিকিৎসা ও রুকইয়াহ: কীভাবে এগোবেন?
- ডাক্তারি চিকিৎসা চালিয়ে যান - ইসলামে কারণ গ্রহণ করা ও চিকিৎসা করানো ফরজের কাছাকাছি স্তরের কাজ।
- রুকইয়াহ করান - একজন বিশ্বস্ত আলেম বা নিজেই পবিত্র অবস্থায় সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে স্বামী-স্ত্রীর ওপর ফুঁ দিতে পারেন।
- স্বামী-স্ত্রী উভয়ে নিয়মিত ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) ও দরুদ শরিফ পড়ুন। বিশেষ করে ফজর ও মাগরিবের পর ২৫ বার করে দরুদ ও ইস্তিগফার পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন বালা-মসিবত দূর করেন।
- **অভুলেশন টাইমে চেষ্টা করুন। হাদিসে এসেছে, সন্তান লাভের জন্য আল্লাহর কাছে দু‘আ করা ও বৈধ উপায় অবলম্বন করা সুন্নাহ।
৪. স্বপ্ন দেখা কি স্বাভাবিক?
হ্যাঁ, স্বপ্ন দেখা স্বাভাবিক। তবে যদি স্বপ্নে জিন, ভয়, বা অশ্লীলতা বারবার আসে, তবে তা শয়তানের পক্ষ থেকে হতে পারে। এই ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত আমলগুলো করবেন:
- শোয়ার আগে আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস তিনবার করে পড়ে ফুঁ দিন।
- ডান কাতে শোয়া এবং শোয়ার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ পড়া।
- ফজরের নামাজের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে থাকা ও তাসবিহ-তাহলিল করা (জালসায়ে বাআদাল ফজর)।
৫. নির্ভরযোগ্য হানাফি কিতাব থেকে নির্দেশনা
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): রুকইয়াহ ও বদনজরের চিকিৎসায় কুরআন তিলাওয়াত ও দু‘আর গুরুত্ব বর্ণিত আছে।
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): সন্তান লাভের জন্য আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি ধর্মীয় আমল করা জায়েজ ও উপকারী।
উপসংহার
আপনার স্বপ্নগুলো স্বাভাবিক নয় বরং শয়তানের প্রভাব হতে পারে। তবে এটি আপনার সন্তান লাভের প্রচেষ্টায় বাধা সৃষ্টির জন্য নয়, বরং আপনাকে সতর্ক করতে এসেছে। তাই:
- ডাক্তারি চিকিৎসা চালিয়ে যান।
- নিয়মিত কুরআন-হাদিসের আমল করুন (সকাল-সন্ধ্যার দু‘আ, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক ও নাস)।
- প্রয়োজনে একজন বিশ্বস্ত আলেমের মাধ্যমে রুকইয়াহ করান।
- স্বপ্ন দেখে ভয় না পেয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। আল্লাহ বলেন: "নিশ্চয়ই শয়তানের কুমন্ত্রণা দুর্বল।" (সূরা আন-নিসা: ৭৬)
আল্লাহ আপনাকে সন্তান দান করুন এবং আপনার উদ্বেগ দূর করুন। আমিন।