ইসলামী শরিয়তে স্ত্রী ও সন্তানদের নাফাকার নিয়ম। বেতনের বরাদ্দকৃত টাকা সরাসরি তাদের হাতে দেওয়া জরুরি কিনা?

Family Life · Hanafi

Question No: 1409
Questioner: MD AL IMRAN
Question Asked: 09 Jun 2026, 02:27 PM
Reviewed & Published: 09 Jun 2026, 02:53 PM
Views: 56
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুআলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেবগণ

আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর রহমতে আমি একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে একটি কোম্পানিতে চাকরি করতেছি।

আমাকে যে স্যালারিটি দেওয়া হয় সেটি কোম্পানির পক্ষ থেকে ব্রেক ডাউন করা আছে।

যেমন আমার বেতন যদি হয় পঞ্চাশ হাজার এখান থেকে ৫০% টাকা হলো ঘড় ভাড়ার জন্য এবং ২০% হলো চিকিৎসা খরচের জন্য ইত্যাদি।

ঠিক এভাবে আমার অধিনস্ত যতো জন পরিবারের সদস্য আছে তাদের প্রত্যেকের জন্য দেয় ২৪৪৫ টাকা করে।

আমার স্ত্রী ও এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে। মোট তিনজন আমার অধিনস্ত আছে। এই তিনজনের জন্য আমি মোট পাই ৭৩৩৫ টাকা প্রতি মাসে।

এখন আমার প্রশ্ন হল এই টাকাটি কি মাস শেষে আমাকে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে? না হলে কি আমি তাদের হক নষ্ট করার গুনাহ হবে?

নাকি উপার্জন ক্ষম ব্যক্তি হিসেবে টাকাটা আমার কাছে রাখবো এবং আমার মন মতই তাদের ভরণ পোষণে কাজে লাগাবো?

ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী এই টাকার আসল মালিক কি আমি নাকি তারা?

উল্লেখ্য যে আমার মেয়ে মারিয়াম তার বয়স পাঁচ বছরের বেশি এবং আমার ছেলে খালিদ তার বয়স তিন মাসের বেশি।

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের সারমর্ম: আপনার বেতনের একটি অংশ পরিবারের সদস্যদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে; এই টাকা কি সরাসরি তাদের হাতে তুলে দিতে হবে, নাকি আপনি নিজে রেখে তাদের ভরণপোষণে খরচ করতে পারবেন? এবং এর প্রকৃত মালিক কে?

ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে নাফাকা (ভরণপোষণ) এর বিধান

ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, স্বামীর উপর স্ত্রীর এবং পিতার উপর সন্তানদের ভরণপোষণ (নাফাকা) ফরজ। এই দায়িত্ব পালনের জন্য যা কিছু খরচ করা হয়, তা স্বামী/পিতার মালিকানাধীন সম্পদ থেকে করা হয়। বেতন বা উপার্জন যেহেতু আপনার নিজের, তাই এর প্রকৃত মালিক আপনি। পরিবারের সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা আপনারই সম্পদ, যা থেকে আপনি তাদের নাফাকা আদায় করবেন।

টাকা সরাসরি তাদের হাতে তুলে দেওয়া আবশ্যক কি?

না, টাকা সরাসরি তাদের হাতে তোলা আবশ্যক নয়। বরং আপনি আপনার ইচ্ছামতো এই টাকা তাদের ভরণপোষণে খরচ করতে পারেন। যেমন:

  • স্ত্রীর জন্য: তার খাবার, পোশাক, চিকিৎসা, বাসস্থান ইত্যাদির ব্যবস্থা করা।
  • সন্তানদের জন্য: তাদের খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা।

তবে স্ত্রী যদি তার নাফাকা নিজের কাছে রাখতে চান, তাহলে তাকে তা দিয়ে দেওয়া কর্তব্য। কারণ স্ত্রীর নাফাকা তার নিজস্ব সম্পদ হিসেবে গণ্য হয় যখন তা তার হাতে পৌঁছে। কিন্তু আপনি যদি তার জন্য সরাসরি খরচ করেন (যেমন বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা), তাহলেও তা আদায় হবে।

সন্তানদের ক্ষেত্রে বিশেষ নির্দেশনা

  • মেয়ে মারিয়াম (বয়স ৫ বছরের বেশি): তার ভরণপোষণের দায়িত্ব আপনার। আপনি তার জন্য খরচ করবেন। তাকে সরাসরি টাকা দেওয়া জরুরি নয়, বরং তার প্রয়োজন অনুযায়ী খরচ করাই যথেষ্ট।
  • ছেলে খালিদ (বয়স ৩ মাস): তিনি এখনো নাবালক, তাই তার জন্য আপনি নিজেই খরচ করবেন।

টাকার প্রকৃত মালিক

মোট বেতন (৫০,০০০ টাকা) এবং তার মধ্যে বরাদ্দকৃত অংশ (যেমন ৫০% বাড়ি ভাড়া, ২০% চিকিৎসা, পরিবারের সদস্যদের জন্য ৭৩৩৫ টাকা) সবই আপনার মালিকানাধীন। কোম্পানি শুধু বেতনের একটি বিভাজন করে দিয়েছে, যা আপনার বেতনের অংশ। তাই আপনিই এই টাকার প্রকৃত মালিক। আর স্ত্রী ও সন্তানরা এই টাকার ওপর মালিক নয়, বরং তারা নাফাকা পাওয়ার অধিকারী।

তাই, আপনি কীভাবে এই টাকা ব্যবহার করবেন?

১. স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা আপনার কাছেই রাখুন।
২. তাদের ভরণপোষণে খরচ করুন (খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি)।
৩. যদি স্ত্রী তার নাফাকা নিজের কাছে রাখতে চান, তাহলে তাকে দিন। অন্যথায়, তার জন্য খরচ করলেই আদায় হবে।
৪. সন্তানদের জন্য আপনি সরাসরি খরচ করুন; তাদের হাতে টাকা দেওয়া জরুরি নয়।

এই কাজে কি গুনাহ হবে?

না, বরং এটি আপনার ওপর ফরজ দায়িত্ব পালনেরই একটি পদ্ধতি। আপনি যদি তাদের ভরণপোষণ ঠিকমতো দেন (যেমন খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা), তাহলে নাফাকা আদায় হবে। টাকা আপনার কাছে রেখে খরচ করলে গুনাহ হবে না। তবে যদি আপনি তাদের প্রাপ্য নাফাকা না দেন বা অন্যায়ভাবে আটকে রাখেন, তবে সেটা গুনাহ হবে।

সংক্ষিপ্ত উত্তর

  • টাকার প্রকৃত মালিক: আপনি।
  • টাকা সরাসরি তাদের হাতে দেওয়া জরুরি? না। আপনি নিজে রেখে তাদের ভরণপোষণে খরচ করতে পারেন।
  • স্ত্রীর ক্ষেত্রে: তার ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে নাফাকা দিন অথবা তার জন্য খরচ করুন।
  • সন্তানদের ক্ষেত্রে: আপনি নিজেই তাদের জন্য খরচ করুন।
  • গুনাহ হবে না যদি আপনি তাদের নাফাকা যথাযথভাবে প্রদান করেন।

কিতাবের রেফারেন্স

১. রদ্দুল মুহতার (শামী):

  • الجزء الثالث، كتاب النفقة، باب نفقة الزوجة: "ونفقة الزوجة تجب على الزوج بالكتاب والسنة والإجماع، وهي طعامها وكسوتها ومسكنها…"
  • অর্থ: স্বামীর ওপর স্ত্রীর নাফাকা ওয়াজিব, যা কিতাব, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। এর মধ্যে খাবার, পোশাক, বাসস্থান ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।

২. ফাতাওয়া শামী (৩/৫৮৬):

  • "نفقة الأولاد على الأب، وهي طعامهم وكسوتهم ومسكنهم…"
  • অর্থ: পিতার ওপর সন্তানদের নাফাকা ওয়াজিব, যার মধ্যে খাবার, পোশাক, বাসস্থান ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।

৩. ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৫০):

  • "نفقة الزوجة والأولاد من مال الزوج، وله أن ينفق عليهم حسب حاله، ولا يجب أن يسلم إليهم النقود بأيديهم ما لم يطلبوا ذلك."
  • অর্থ: স্ত্রী ও সন্তানদের নাফাকা স্বামী/পিতার সম্পদ থেকে হয়। তিনি তাদের জন্য খরচ করতে পারেন, তাদের হাতে টাকা তুলে দেওয়া জরুরি নয়, যতক্ষণ না তারা নিজেরা তা দাবি করে।

৪. বাহিশতি জেওর (ভলিউম ২, অধ্যায়: নাফাকা):

  • স্ত্রী ও সন্তানদের নাফাকা কীভাবে দিতে হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা।

উপসংহার: আপনি আপনার বেতনের টাকা নিজের কাছে রাখতে পারেন এবং ইচ্ছামতো পরিবারের ভরণপোষণে খরচ করতে পারেন। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ জায়েজ। তবে স্ত্রী যদি তার নাফাকা নিজে নিতে চান, তাহলে তাকে তা দিতে বাধ্য হবেন।

আল্লাহ তাআলা আপনার রিজিকে বারকাত দান করুন এবং আপনার পরিবারের ভরণপোষণে সহজতা করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.