বেঁচে থেকে লাভ কি বল তকে ছাড়া আর এই কথাটা কি ছোট বা বড় শিরক বা কুফুরি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর প্রদানে প্রথমে বক্তব্যটির অর্থ ও প্রেক্ষাপট নিরূপণ করা জরুরি।
প্রশ্নকারী বক্তব্যটি: "বেঁচে থেকে লাভ কি বল তকে ছাড়া" – বাংলায় এর সম্ভাব্য অর্থ দুটি হতে পারে:
- "বেঁচে থাকার লাভ কী? তাঁকে (আল্লাহকে) স্মরণ করা ছাড়া!" – অর্থাৎ জীবনের উদ্দেশ্য ও লাভ কেবল আল্লাহর জিকির বা ইবাদত।
- অথবা এর অন্য কোনো ভুল উচ্চারণ বা অর্থ হতে পারে (যেমন "তকে" কোনো মানুষ বা মূর্তির নাম)।
প্রথম অর্থটি কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। আল্লাহ বলেন:
"আমি জিন ও মানবকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।" (সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬)
উক্ত বক্তব্য যদি আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়, তবে তা শিরক বা কুফরি নয়; বরং একটি প্রশংসনীয় ও ঈমানদীপ্ত উক্তি।
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে শিরক ও কুফরির সংজ্ঞা:
ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’–এ লিখেছেন:
الْكُفْرُ هُوَ تَكْذِيبُ الرَّسُولِ فِيمَا جَاءَ بِهِ أَوْ جَحْدُ مَعْلُومٍ مِنْ الدِّينِ بِالضَّرُورَةِ أَوْ الِاسْتِخْفَافُ بِشَيْءٍ مِنْ أَمْرِ الدِّينِ
"কুফর হলো রাসূল (সা.)-এর আনীত বিষয়কে মিথ্যা বলা, অথবা দ্বীনের প্রয়োজনীয় কোনো বিষয় অস্বীকার করা, অথবা দ্বীনের কোনো বিষয়কে হালকা (অবজ্ঞা) করা।" (রাদ্দুল মুহতার, ৪/২৩৬)
শিরক হলো আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা বা তাঁর কোনো গুণে অন্যকে অংশীদার করা।
উক্ত বক্তব্যে আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকে জীবন-মৃত্যুর মালিক বা লাভ-ক্ষতির অধিকারী সাব্যস্ত করা হয়নি; বরং ‘তাকে’ বলে আল্লাহকেই বুঝানো হয়েছে। তাই এটি শিরকের পর্যায়ে পড়ে না।
বক্তব্যটির সঠিক ব্যাখ্যা:
যদি কেউ এভাবে বলে: "বেঁচে থেকে লাভ কী? বল ‘তাকে’ ছাড়া" – তাহলে এর অর্থ হতে পারে: "জীবনের কোনো লাভ নেই, যদি না আমি তাঁর (আল্লাহর) নাম নিই।" এটি প্রকৃতপক্ষে তাওহিদের স্বীকৃতি ও আল্লাহমুখী জীবনের গুরুত্ব বোঝায়।
তবে শরয়ি দৃষ্টিতে সতর্কতা অবলম্বন করা ভালো। কারণ এমন কিছু বাক্য আছে যা দেখতে ভালো মনে হলেও ভুল অর্থের দিকে নিয়ে যেতে পারে। যেমন: "লাভ কী বল তাকে ছাড়া" – এখানে ‘বল তাকে’ বলতে যদি কাউকে ‘স্মরণ করা’ অর্থে না নিয়ে বরং কোনো ব্যক্তির নাম উচ্চারণ করাকে জীবনের একমাত্র অর্থ বলে ধরা হয়, তবে তা শিরক হতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রচলিত অর্থে এটি আল্লাহকেই বুঝায়।
সিদ্ধান্ত:
১. উক্ত বক্তব্যটি (যদি ‘তাকে’ দ্বারা আল্লাহ উদ্দেশ্য হয়) ছোট-বড় কোনো শিরক বা কুফর নয়। বরং এটি ঈমান ও তাওহিদের দাবি।
২. তবে শব্দচয়নে সতর্ক থাকা কর্তব্য। কারণ ইসলামে ‘লাফযে কুফর’ (কুফরি শব্দ) থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
৩. বক্তব্যটির উদ্দেশ্য যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকাকে জীবনের লাভ বলে মনে করা হয়, তবে তা শিরকে আকবর (বড় শিরক) হতে পারে।
৪. মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) -এর ফতোয়ায় এসেছে: "আল্লাহর জিকিরকে জীবনের উদ্দেশ্য বলা কুরআনের শিক্ষার অনুরূপ। কিন্তু ভাষা এমন হতে হবে যাতে অন্যদের মনে সন্দেহ না জন্মায়।"
প্রাসঙ্গিক হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (كتاب الإيمان) – ইবনু আবিদীন
- ফতোয়া উসমানি (১/২৩৪-২৩৫) – মুফতি মো. শফি উসমানি
- ইমদাদুল ফতোয়া (২/৪৫) – মাওলানা আশরাফ আলী থানভি
- মাআরিফুল কুরআন (সূরা যারিয়াতের তাফসির) – মুফতি মো. শফি
সুপারিশ:
আল্লাহর জিকির ও ইবাদতকে জীবনের লক্ষ্য বলা অত্যন্ত উত্তম। তবে দ্বিধাগ্রস্ত হলে আরও পরিষ্কার ভাষায় বলুন: "জীবনের আসল লাভ আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্য।" এতে সন্দেহের অবকাশ থাকে না।
আল্লাহই তাওফিক দাতা।