যাকাত সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর: স্বর্ণ ও দেনমোহরের টাকার যাকাত, নেসাবের পরিমাণ, নিকটাত্মীয়দের যাকাত দেওয়া, ও কুরবানী সংক্রান্ত সালাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত সমাধান।

Zakat and Charity · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 1381
Questioner: Atika Akhter
Question Asked: 08 Jun 2026, 05:18 PM
Reviewed & Published: 08 Jun 2026, 05:40 PM
Views: 49
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমার বিয়ের বয়স এই বছরের এপ্রিলে ২ বছর হয়েছে। বিয়ের আগে এবং পরে মিলিয়ে আমার প্রায় সাড়ে তিন ভরি স্বর্ণ আছে। এই বছরের মে মাসে আমার স্বামী দেনমোহরের ৫৫ হাজার টাকা আমাকে শোধ করেছেন। মানে প্রায় ১৫ দিন হল টাকা টা আমার কাছে আছে। কিন্তু সঠিক জ্ঞ্যান না থাকার কারণে আমি কোন যাকাত আদায় করিনি। আল্লাহ মাফ করুন। এখন আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে:
১. উক্ত স্বর্ণ থেকে কতটুকু যাকাত আদায় করবো?
২. পুরো দুই বছরের যাকাত একসাথে আদায় করতে হবে কিনা?
৩. হিসাব করে যাকাতের পরিমাণ যদি অনেক বেশি হয়, সেক্ষেত্রে পুরো বছরে সেটা আদায় করা যাবে কিনা, মানে ভেংগে ভেংগে?
৪. আর সেই টাকা আমার খালা বা নিকটাত্মীয় দের দেয়া যাবে কিনা? যারা আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল?
৫. আমার কাছে দেন মোহরের যে টাকা আছে সেটার যাকাত লাগবে কিনা?
৬. সেই টাকা যদি বিনিয়োগ করি সেটার জন্যে যাকাত এবং কুরবানী করতে হবে কিনা?
অনেক গুলো প্রশ্নের জন্য আফওয়ান।

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته।

আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি: যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদের ওপর এক বছর (চান্দ্রবর্ষ) অতিক্রম করা শর্ত। আপনি উল্লেখ করেছেন, আপনার কাছে সাড়ে তিন ভরি (প্রায় ৪২.৫ গ্রাম) স্বর্ণ এবং সম্প্রতি পাওয়া ৫৫,০০০ টাকা (প্রায় ১৫ দিন হলো) আছে।

১. স্বর্ণের যাকাত:

স্বর্ণের নেসাব হলো ২০ মিসকাল (প্রায় ৮৫ গ্রাম বা সাড়ে ৭ ভরি)। আপনার স্বর্ণের পরিমাণ (সাড়ে ৩ ভরি) নেসাবের নিচে হওয়ায় এর ওপর যাকাত ফরজ নয়

  • ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
    "যে ব্যক্তি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তার ওপর যাকাত ফরজ হয়..." (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১৪০৫)
  • শায়খ ইবনে বায (রহ.) বলেন: "স্বর্ণের নেসাব ২০ মিসকাল (৮৫ গ্রাম) হলে এবং এক বছর পূর্ণ হলে যাকাত দিতে হবে। নেসাবের কম হলে যাকাত নেই।" (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১৪/৯২)

★বিগত ২ বছর আপনার স্বর্ণ নেসাব পরিমাণ না হওয়ায় যাকাত ফরজ নয়।
তবে এখন আপনি নেসাব পরিমান সম্পদের মালিক হয়েছেন। সুতরাং বছর পূর্ণ হলে আপনাকে যাকাত আদায় কর‍তে হবে।

২. গত দুই বছরের যাকাত:

যেহেতু আপনার স্বর্ণ নেসাব পরিমাণ নয়, তাই বিগত দুই বছরের জন্যও কোনো যাকাত বকেয়া হয়নি। আপনার ওপর শুধু বর্তমান সময় থেকে ভবিষ্যতের যাকাত হিসাব করার প্রয়োজন নেই।

৩. যাকাতের পরিমাণ বেশি হলে ভেঙে ভেঙে দেওয়া:

প্রশ্নটি তখনই প্রাসঙ্গিক যদি যাকাত ফরজ হয়। সাধারণত যাকাত একসাথেও দেওয়া যায়, আবার নিজের সুবিধামতো ভেঙেও দেওয়া যায়। তবে যাকাত ফরজ হওয়ার পর বিলম্ব করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়)।

  • শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন: "যাকাত দেরি করা জায়েয নয়, তবে প্রয়োজনে কিস্তিতে দেওয়া যেতে পারে, যদি তা আদায়ের ইচ্ছা থাকে।" (আশ-শারহুল মুমতি‘, ৬/১৮০)

৪. খালা বা নিকটাত্মীয়কে যাকাত দেওয়া:

হ্যাঁ, খালা (মায়ের বোন) বা অস্বচ্ছল নিকটাত্মীয়দের যাকাত দেওয়া জায়েয, তবে শর্ত হলো তারা যাকাত গ্রহণের উপযোগী হবেন (অর্থাৎ নেসাবের মালিক নন)।

  • রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "গরিব আত্মীয়কে দান করা সাদাকা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা উভয়ই।" (তিরমিযী, হাদীস: ৬৫৮; সহীহ ইবনে হিব্বান)
  • শায়খ ইবনে বায (রহ.) বলেন: "যাকাত দেওয়া জায়েয নিকটাত্মীয়দের, যেমন চাচা, ফুফু, খালা, মামা, যদি তারা গরিব হয় এবং ভরণপোষণ আপনার ওপর ফরজ না হয়।" (মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ১৪/৪১৫)

৫. দেনমোহরের টাকার যাকাত:

দেনমোহরের টাকা আপনার সম্পদে পরিণত হয়েছে। তবে যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য এক বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত। যেহেতু টাকা পেয়েছেন মাত্র ১৫ দিন আগে, তাই এখনো যাকাত ফরজ হয়নি। টাকার ওপর যাকাত ফরজ হবে যদি এটি আপনার কাছে এক বছর থাকে এবং নেসাব পরিমাণ (বর্তমান স্বর্ণমূল্যে প্রায় ৮৫ গ্রাম সোনার মূল্য) পূর্ণ হয়।
নেসাবের পরিমাণ: বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণের মূল্য (প্রায় ২.৫ লক্ষ টাকা বা তার বেশি) হলে নেসাব পূর্ণ হবে। আপনার ৫৫,০০০ টাকা এই পরিমাণের কম হওয়ায় যাকাত ফরজ নয়।

৬. টাকা বিনিয়োগ করলে যাকাত ও কুরবানী:

  • যাকাত: বিনিয়োগকৃত টাকাও যদি নেসাব পরিমাণ হয় এবং এক বছর পূর্ণ হয়, তাহলে তার যাকাত দিতে হবে।
  • কুরবানী: কুরবানী শুধু সম্পদের ওপর নয়, বরং ঈদুল আযহায় সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য ওয়াজিব। টাকা বিনিয়োগ করলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে না, বরং আপনার নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে (যাকাতের নেসাব সমপরিমাণ) কুরবানী ওয়াজিব।
    • শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন: "কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া শর্ত নয়, বরং কুরবানীর দিন ও তার পরবর্তী দিনগুলোতে খরচ করার মতো সামর্থ্য থাকলেই ওয়াজিব।" (আশ-শারহুল মুমতি‘, ৭/৪৫২)

সারসংক্ষেপ:

  1. বিগত ২ বছর আপনার স্বর্ণ নেসাব পরিমাণ না হওয়ায় যাকাত ফরজ নয়।
    তবে এখন আপনি নেসাব পরিমান সম্পদের মালিক হয়েছেন। সুতরাং বছর পূর্ণ হলে আপনাকে যাকাত আদায় কর‍তে হবে।

  2. বিগত দুই বছরের কোনো যাকাত বকেয়া নেই।

  3. যাকাত ফরজ হলে ভেঙে দেওয়া জায়েয, তবে বিলম্ব না করাই উত্তম।

  4. অস্বচ্ছল খালা বা নিকটাত্মীয়কে যাকাত দেওয়া জায়েয, তবে পিতা-মাতা ও সন্তান-সন্ততিদের নয়।

  5. দেনমোহরের টাকা এখনও এক বছর পূর্ণ হয়নি, তাই যাকাত ফরজ নয়।

  6. টাকা বিনিয়োগ করলে যাকাতের নিয়ম একই (নেসাব ও এক বছর পূর্ণ হওয়া সাপেক্ষে)। কুরবানী সামর্থ্য অনুযায়ী ফরজ, শুধু টাকা থাকার কারণে নয়।

আল্লাহ আপনার জ্ঞান ও আমলকে কবুল করুন।

রেফারেন্স:

  • কুরআন: সূরা আত-তাওবা (৯:৬০) – যাকাতের খাত
  • সহীহ বুখারী (হাদীস: ১৪০৫) – নেসাব সংক্রান্ত
  • ফাতাওয়া ইবনে বায (১৪/৯২, ৪১৫)
  • ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন (আশ-শারহুল মুমতি‘, ৬/১৮০, ৭/৪৫২)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.